দিনে গৃহপরিচারিকা, রাতে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান

দীপিকা মাহত্রে মুম্বাইয়ের আর দশ জন সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের মতই জীবন কাটান। সংসারে স্বামী আছে, তিন মেয়ে আছে। ভোর চারটা বাজে তাঁকে ঘুম থেকে উঠতে হয়। মুম্বাইয়ের লোকাল ট্রেন যে ধরতে হবে। পাঁচটি বাসায় তিনি রান্না করেন, সহজ বাংলায় যাকে বলে গৃহপরিচারিকা। কখনো কখনো ইমিটেশনের গহনাও বিক্রি করেন ট্রেনে।

নালা সোপারা থেকে মালাদ – রোজ প্রায় দু’ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি কাজে যান। বাড়ি ফিরে নিজের সংসারের কাজ করেন। না, জীবনটা এতটাও ‘বোরিং’ না তাঁর। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেই তিনি ঢুকে যান আপন দুনিয়ায়। তিনি হলেন একজন স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান।

কি করে এই কাজে নাম লেখালেন? ৪৩ বছর বয়সী দীপিকা বলেন, ‘আমি খেয়াল করেছি, স্ট্যান্ড কমেডিয়ানরা তাদের গৃহপরিচারিকাদের গল্প বলেন। তাহলে এই গৃহপরিচারিকাদের হয়েও তো কারো কিছু বলা দরকার। তাই আমি বলছি।’

তবে, দীপিকার স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান হয়ে ওঠার পেছনে একটা গল্প আছে। তাঁর মুখেই শুনি চলুন, ‘সঙ্গীতা ম্যাডাম (সঙ্গীতা দাস, এই ভদ্রমহিলার বাসায় কাজ করেন দীপিকা) একবার একটা ট্যালেন্ট শোয়ের আয়োজন করলেন। নাম ছিল ‘বাই লোগ’। ঘরোয়া একটা আয়োজন। কিন্তু, আমাদের জন্য এটাই বা কে করে বলুন! তবুও একটা মঞ্চ তো পেলাম। মজা করার জন্যই আয়োজন করা হয়েছিল। আমি ভাবলাম আমি স্টেজে উঠে জোকস বলবো। সেখান থেকে শুরু।’

সেই সময় দীপিকাকে খুঁজে পান র‌্যাচেল লোপেজ। লোপেজ খ্যাতনামা ভারতীয় দৈনিক পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমসের হয়ে কাজ করেন। তাঁর পাশে আরো এসে দাঁড়ান অদিতি মিত্তাল। তিনি দীপিকাকে আরো বড় মঞ্চে কাজ করার সুযোগ এনে দেন।

কমেডির দুনিয়ায় অদিতি বেশ প্রতিষ্ঠিত। সঙ্গীতা দাসের বাসায় তিনি দীপিকার সাথে পরিচয় হয়। তিনি কাজ করার প্রস্তাব দেন। দীপিকাও সেই সুযোগ লুফে নেন। নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে এই দু’জন মিলে এখন ব্যাড গার্ল নামের একটা শোও করেন। এর সুবাদে এখন দীপিকাকে অনেকেই চেনে।

দীপিকার জীবনে তাই এখন আনন্দ আছে। আছে কিছু আক্ষেপও। তিনি বলেন, ‘সঙ্গীতা ম্যাডামের মত মানুষগুলো সব সময় আমার ভাল চেয়েছেন। তবে, সবাই এমন নন। এমনও জায়গায় আমি কাজ করি, যারা আমাকে চাকরের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে নারাজ। তাঁরা আমাকে চেয়ারেও বসতে দেয় না, মাটিতে বসতে বলে। আমার পানিও খেতে হয় আলাদা গ্লাসে। সেসব নিয়েই আমি মঞ্চে কথা বলি। ওখানেই তো সব বলা যায়। কথা বলতে গিয়ে আমি নিজেকে বিশেষ কিছু মনে করি। কারণ, আমি যা বলি মানুষ তা মন দিয়ে শোনে। আমার সব কিছুই আলাদা, বাথরুম, খাবার প্লেট। কিন্তু, আমার বানানো রুটিই দিনের পর দিন মানুষগুলো খেয়ে যাচ্ছে! নাকি!’

তাঁর জোকসগুলো যেন তাঁর কর্মজীবনের কথাই বলে। তাতে থাকে আবেগ, থাকে রম্য, থাকে রসবোধ। দর্শকসারিতে বসা মানুষগুলোও পছন্দ করে এই দীপিকাকে। অচিরেই হয়তো কমেডির আরো বড় দুনিয়াতেও দেখা মিলবে দীপিকার। প্রতিভা যখন আছে, স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়!


– বিয়িং ইন্ডিয়ান ও দ্য বেটার ইন্ডিয়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।