‘আমি এক অবিবাহিত মায়ের জারজ সন্তান’

আগে থেকেই অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে রাখা হয়েছিল। বিকেলবেলার মধ্যেই তাই মহেশ ভাটের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম, অপেক্ষা করতে থাকলাম। তিনি আসলেন তিন মিনিট দেরীতে। ক্ষমা চাইলেন। তিনি বরাবরই ছিমছাম, শুভ্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় একটা পোট্রেটের পাশে বসে যখন কথা বলছিলেন, তখন বারবার আমার চোখের সামনে বাবার মুখটা ভেসে উঠেছিল। সত্যিই, মহেশ ভাট মানেই একজন ‘ফাদার ফিগার’!

তবে, মহেশ ভাট বিস্মিত করে বললেন, ‘বাবা কি জিনিস সেটা আমি জানি না। আমার কখনোই সত্যিকারের কোনো বাবা ছিল না। বাবা বিষয়ে আমার কোনো স্মৃতি নেই। তাই বাবার ভূমিকা আমি জানি না, আমি এক অবিবাহিত মায়ের জারজ সন্তান। তিনি হলেন শিরিন মোহাম্মদ আলী।’

তাহলে মহেশ ভাটের নামটা এমন হল কেন? কৌতুহল জাগলো। ভাট বলেন, ‘আমি প্রায়ই মা’র কাছে আমার নামের অর্থ জানতে চাইতাম। মা বলতেন, তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করে বলবো। তিনি তোমার নাম দিয়েছেন। এরপর তিনি যখন আসলেন, তখন আমার নামের অর্থ জানা গেল। মহেশ হল ‘মহা ঈশ্বর’। দেবতাদেরও দেবতা। যে দেবতা তার সন্তানের মস্তক ছেদ করেছেন, তাঁকে আমার পছন্দ ছিল না। আমি চাইতাম আমার নামকরণ হোক গনেশের নাম অবলম্বনে। বিছানায়, বালিশের নিচে আমি ছোট্ট একটা গনেশের মূর্তি নিয়ে ঘুমাতে যেতাম। ঠিক গনেশের বাবার মতই, আমার কাছে আমার বাবা ছিলেন অপরিচিত একজন। আমার জীবনে তিনি অনুপস্থিত।’

মায়ের সাথে মহেশ ভাট
  • অনুপস্থিত বাবা ও সন্তান

১৯৮২ সালের ‘আর্থ’ কিংবা ১৯৯৮ সালের ‘জখম’ – প্রায়ই মহেশ ভাটের সিনেমাগুলোতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এই সিনেমার চরিত্রগুলো ভাটের কর্মময় জীবনের সেরা সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। সেই তিনি আজীবন একজন ‘অনুপস্থিত বাবা’র আক্ষেপে পুড়েছেন।

বললেন, ‘মা যা স্বপ্ন দেখতেন তা আমি কখনোই পূরণ করতে পারিনি। চেষ্টা করেছি, পারিনি। আমি কখনো স্কুলে ভাল ছিলাম না, ভাল কোনো চাকরি পাইনি। যেকোনো কাজ পেলে আমি হুলস্থুল করতাম, কাজের কাজ কিছুই হত। লোকে যা চাইতো তা কখনোই করতে পারতাম না। অটোবায়োগ্রাফিকাল কাজ করার সাথে সাথে যেন নিজেকে ফিরে পেলাম। বুঝলাম, আসলে এটাই আমি করতে চাইতাম। নিজের জীবন নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমি খুব লজ্জিত ছিলাম। সকল কাজের জন্য নিজের প্রেরণা খুঁজতাম ওই ‘অনুপস্থিত বাবা’র কাছ থেকে।’

এই অনুপস্থিত বাবাটি হলেন নানাভাই ভাট। ভাট পরিবারে তিনিই সিনেমা নির্মানের দিকপাল। হ্যা ‘ভাট’ নামটা মহেশ ভাটের কারণেই বলিউডে স্থায়ী হয়েছে, তবে এই স্বপ্নের বীজটা তাঁর বাবাই প্রথম বুনেছিলেন।

ভাটের মা-বাবা: শিরিন ও নানাভাই ভাট

ভাট বলেন, ‘বাবার মারা যাওয়ার আগেই তাঁর সাথে শান্তি এনে ফেলেছিলাম। তবে, সব সময় একটা অভাব ছিল। যদিও, বড় হওয়ার সাথে সাথে একটু একটু করে আমার সহ্যশক্তি বেড়ে গিয়েছিল।’

আপনার ছেলে রাহুলের প্রতিও কি আপনার মনোভাবটা একই ছিল না? প্রশ্নটা শুনে ভাট থমকে গেলেন, ভড়কে গেলেন কি না জানি না। একটু সময় নিয়ে থেমে বললেন, ‘হৃদয়ে একটা জখম তো ছিলই। যখন আমি আরেক নারীর জন্য সংসার ছাড়ি তখন তো ওর বয়স মাত্র তিন। আমি আমার দায়িত্ব পালনে খামখেয়ালি করেছি, অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে, বাবা-ছেলের সম্পর্কটা ভেঙে গেলেও কিছু একটা থাকে। এটা পুরোপুরি কখনো ম্লান হয় না। সানি (রাহুল ভাট) নিশ্চয়ই একটা সময় ভেবেছে যে, আমি ওর পাশে ছিলাম না। তবে, ধীরে ধীরে আমরা সম্পর্কগুলোকে আবার গড়েছি। আমি ওকে বলেছি, আমার প্রতি ওর যে রাগ সেটাই যেন ওর জীবনের লক্ষ্য পূরণের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। যেমনটা আমার হয়েছে। ও তাই করেছে। ও এখন রীতিমত ফিটনেস গুরু। সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ওর শীষ্য। তবে, কখনোই কোনো কাজের জন্য ও আমার নাম ব্যবহার করেনি। এমনকি আমার দোষ কাজ লাগিয়ে কোনো বাড়তি সুবিধাও নেয়নি। ও নিজেকে নিজেই গড়েছে। সেজন্য আমি গর্ব করতেই পারি।’

‘ও কি বলে, ও কি আপনাকে নিয়ে একই রকম গর্ব করে?’ – এক গাল হেসে মহেশ ভাট শুধু বললেন, ‘সানির আত্মসম্মান খুব তীব্র।’ বোঝা গেল, তিনি আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছেন!

আমির খান ও মেয়ে পূজা ভাটের সাথে
  • আদরের কন্যা

প্রথম স্ত্রীকে ছাড়ার সাথে সাথে শুধু ছেলে নয়, মেয়েকেও ছেড়ে এসেছিলেন মহেশ ভাট। তবে, পূজা ভাটকে সবসময়ই নিজের ‘আদরের কন্যা’ দৃষ্টিতেই দেখেন মহেশ ভাট।  তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু দিক থেকে পূজা আমাকে খুব পছন্দ করতো। কোনো এক কারণে, অন্য যেকোনো সন্তানের চেয়ে আমি ওর প্রতিই বেশি দুর্বল ছিলাম। তবে, এই সম্পর্কেও টানাপোড়েন ছিল। কারণ, ওর মায়ের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল না তখন। তবে, ও আমাকে বোঝে। কারণ, একটা সময় ও নিজের বাবাকে দেখেছে অনেক প্রতিভা থাকার পরও কেমন করে দিনের পর দিন মুম্বাইয়ের রাস্তায় কাজের জন্য ছুটেছে।’

কিন্তু, সত্যিকারের বাবাকে পেয়েছে কেবল দ্বিতীয় ঘরে ভাটের বড় মেয়ে শাহীন। সোনি রাজদানের ঘরে তাঁর জন্ম। ভাট বলেন, ‘মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ও আমার মা হয়ে উঠেছিল। আমার মা কোনো শর্ত ছাড়াই আমাকে ভালবাসতো, শাহীন কোনো শর্ত ছাড়াই আমাকে বুঝতো। অনেক জটিল ইস্যুও ও বুঝতো। অনেক কঠিন কোনো সমস্যার সমাধানও ওর কাছে চাইলে খুব সরল একটা সমাধান দিতে পারতো।’

‘আপনি তাকে কি দিয়েছেন?’ ভাটের সাফ জবাব, ‘আশা। আমি জীবনে এত উত্থান, পতন দেখেছি যে এটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেটাই আমি ওর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি। ও এখন যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে জানে। বিষয়টা আমাকে খুব আনন্দ দেয়।’

এবার আমি সবচেয়ে জরুরী প্রশ্নটা মহেশ ভাটকে করলাম, ‘ভারতের বর্তমান সময়ে অন্যতম সেরা তারকা, মানে আলিয়া ভাটের বাবা হওয়ার অনুভূতি কেমন?’

মহেশ ভাট বললেন, ‘আমি তো স্টার-বাবা হওয়ার অনুভূতি আগেও পেয়েছি, যখন পূজা সিনেমায় এলো। তবে, আলিয়া’র সাফল্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। আর সব কিছুই করেছে নিজের যোগ্যতায়। নিজেই নিজেকে গড়েছে। ওর কারণেই ‘মহেশ ভাট’ নামের ব্র্যান্ডটির আলো আরেকটু বেড়েছে।

যদিও, আলিয়া ভাট একটা সময় স্বাভাবিক হতে পারতেন না মহেশ ভাটের সাথে। মহেশ ভাট বলেন, ‘যখন আলিয়া আমাকে বলতো, আমার সাথে দেখা করতে আসতে ওর দু’দিন সময় লাগবে, তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম সমস্যাটা কোথায়। আমার সাথে ও সহজ হতে পারতো না। তবে, এখন ও বলে, আমি নাকি আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়েছি। তাই, এখন আগের থেকে ও আমার চেয়ে অনেক স্বাভাবিক ও সহজ আচরণ করে।’

  • বাবার সংজ্ঞায়ন

‘আমি যাত্রা করেছিলাম খুব ভীত একজন বাবা হিসেবে। কারণ, আমি জানতামই না বাবা কাকে বলে, কারণটা তো আগেই বললাম, আমার সেই অর্থে কোনো বাবাই ছিল না। তবে, নিজের মত করে, আমি আমার সন্তানদের চাওয়া-পাওয়ার দিকটা বোঝার চেষ্টা করতাম। এই যেমন, আজ আমি বুঝে গেছি সাদা জামা পরলে তোমার সাথে ছবি ভাল আসবে। তাই, অনীহা থাকার পরও সাদা পরেছি। আমি মনে করি, বাবা হওয়ার সবচেয়ে ভাল উপায় হল, বাচ্চাদেরকে তাঁদের মত হতে দেয়া। আর তারা বাবাকে যেমন দেখতে চায় তেমনটা হওয়া। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি, মানসিক ভাবে তেমন কিছু হতে।’, বলে শেষ করলেন মহেশ ভাট!

– হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে, গণমাধ্যমটির হয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাওসার মুনির।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।