মহারাজা জয় সিং, রোলস রয়েস ও একটি মধুর প্রতিশোধ

রোলস রয়েস, চার চাকার গাড়ির দুনিয়ায় বিলাসী এক নাম। আভিজাত্য, অহং, রাজসিকতার প্রতীক হিসেবে বাজারে টিকে আছে শতবর্ষের বেশি সময় ধরে। আবেদনে, ধারেভারে গাড়ি প্রেমীদের কাছে আবেদন দিন দিন বেড়েই চলেছে। কোম্পানিও খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে নিত্যনতুন মডেল বের করছে। কিন্তু আজ হতে ঠিক ১০০ বছর আগে রোলস রয়েসের যে দশা হয়েছিল তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ!

১৯২০ সাল। লন্ডনের রাস্তায় একা হাঁটছিলেন ভারতের আলওয়ারের (রাজস্থানের একটি রাজ্য) মহারাজা। তিনি হলেন জয় সিং। সাদাসিধে বেশভূষায় আপন মনে চলতে চলতে হঠাৎ থামেন। চোখ পড়ে রোলস রয়েসের শো রুমে। গাড়ির প্রেমে পড়ে যান। দেরি না করে দাম জানতে ঢুকে পড়েন শো রুমে।

তাঁকে দেখে ভ্রু কুঁচকান শো রুমের এক বিক্রয়কর্মী। অবাক হবারই কথা। অতি সাধারণ এক লোক, এক দেখাতেই যেকেউ বলে দিতে পারবে এ কোন দরিদ্র ভারতীয়! রোলস রয়েসের বিপনন কেন্দ্রে এসে এমন একজনের দাম জানতে চাওয়া নাক উঁচু ব্রিটিশদের কাছে বিদঘুটেই বটে!

সেলসম্যান রীতিমত প্রহসন করে তাড়িয়ে দেন রাজা জয় সিংকে! রাজা মানুষ। এর মতো অসংখ্য দাস পালেন তিনি, আর তাকেই কি না অপমান? আত্মসম্মান আঘাত হানতে সময় লাগেনি। কিন্তু এর মাশুল যে এভাবে দিতে হবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি, ভাবার কথাও ছিল না!

তিনি হোটেলে ফিরে গেলেন। তার লোকজনকে নির্দেশ দিলেন শো রুমে যাবার। গিয়ে জানিয়ে আসতে, আলওয়ারের মহারাজ আসছে সেখানে রোলস রয়েস কিনতে। রাজা যান, তাকে লাল গালিচায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একটি দুটি নন, একেবারে ছয়টি গাড়ি একবারে কিনে নেন! বিস্ময়ের আরো বাকি – ছয়টি গাড়ির মূল্যই নগদ প্রদান করেন। এমনকি ভারতে পাঠানো বাবদ যে খরচ হবে হিসেব করে তাও দিয়ে আসেন কোম্পানিকে। ভাবছেন, এতে মাশুল দেওয়ার কী আছে, তাই তো?

গাড়ি কিনেছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা নিজে চালাবার জন্যে নয়! দেশে যখন গাড়ি এসে পৌঁছায়, পৌরসভার কর্তাদের হুকুম দেন সবকটি গাড়ি যেন শহরের ময়লা উঠানো এবং আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। ঠিকই পড়ছেন! রোলস রয়েস ব্যবহৃত হয়েছিল ময়লার গাড়ি হিসেবে।

একটা রোলস রয়েসের মালিক হতে পারলেই তার গায়ে যেখানে তুলির আঁচড় পড়তে না দেওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি সেখানে হাফডজন গাড়ি রোজ বোঝাই হচ্ছে ময়লা আর উচ্ছিষ্টে! রাজার দম্ভ বলে কথা। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে জানাজানি হতে সময় লাগেনি খুব।

এর পরপরই বদলে যেতে থাকে গাড়িটির ভাগ্যর চিত্র। যারা আগে গর্ব করে বলত, আমি রোলস রয়েলস চালাই সেই তারাই বন্ধ করে তাতে চড়া। ময়লার গাড়িতে তো আর চড়া যায় না! কমতে থাকে গাড়ির বিক্রি, নামতে থাকে শেয়ার, সাফল্যের গ্রাফ তরতরিয়ে নামতেই থাকে ক্রমাগত।

অবশেষে নিজেদের ভুল বুঝতে পারে কোম্পানি। টেলিগ্রাম পাঠায় রাজা জয় সিংয়ের কাছে। ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি রাজাকে উপহার হিসেবে আরো ছয়টি নতুন মডেলের রোলস রয়েলস দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন তারা। রাজা রাজি হোন। বন্ধ হয় ময়লা আনা নেওয়ার কাজে রোলস রয়েলসের অপব্যবহার। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে বিলাসবহুল গাড়ি বানানো প্রতিষ্ঠানটি। উল্টো দিকে ছোটা গাড়ির চাকাও অল্পদিনেই ফেরে পুরনো ট্র্যাকে!

‘ডোন্ট জাজ অ্যা বুক বাই ইটস কাভার’ – প্রবাদটির সত্যতা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পায় রোলস রয়েস। আর একটু হলেই যে হাতে হারিকেন ধরিয়ে দিচ্ছিলেন রাজামশাই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।