মহালয়া: একটি ড্রামাটিক মায়াজাল

একবার আকাশবানী রেডিওর নাটকের রিহার্সেল হচ্ছিলো। ঐ সময় বীরেন বাবুর সাথে কথা বলতে আসেন তাঁরই কর্মক্ষেত্রের এক অনুজ। কিভাবে কথা শুরু করবেন ঠিক ঠাওর করতে না পেরে শুরু করলেন।

– শুনছিলাম সামনের বছর থেকে মহালয়ার মহিষাসুর মর্দিনীর সম্প্রচার নাকি বন্ধ হচ্ছে?

এর উত্তরে বীরেন বাবু বললেন – ওহ!

– সেকি! আকাশবানীর কেউ আপনাকে জানায়নি?

– মহৎ কাজ কি ঠাক পিটিয়ে করা সম্ভব? তাই হয়তো খবর এসে পৌঁছায়নি। নতুন অনুষ্ঠান হচ্ছে?

-ডিটেইলস পাইনি তবে শুনছিলাম নতুন করে রেকর্ডিং হবে, নতুন সুর হবে, নতুন কন্ঠস্বর।

-নবীনরা তো আসবেই না হলে আমাদের মতো বুড়োদের কাঁদিয়ে বাঁচাবে কে? এটাই তো অভিপ্রেত।

– বীরেন দা, আপনাকে দেখে রবীন্দ্রনাথের ‘সনাতন গোস্বামী’ মনে পড়ে যাচ্ছে। আপনারই মতো যেনো হতে পারি বীরেন দা। চাওয়া-পাওয়ার ভীরে যেনো না পড়ে যাই।

– ওলড ফুলস উইল টক অল কাইন্ডস অব ননসেন্স!

উপরের অংশটুকু ‘মহালয়া’ সিনেমার একটা সিকোয়েন্সের সংলাপ। মহালয়া সিনেমাটি পুরোটাই ইতিহাস নির্ভর সিনেমা, তবে সে কথায় পরে যাচ্ছি। শুরুতেই সংলাপ তুলে ধরার কারণ, এই সিনেমা সংলাপের এক মায়াজাল সৃষ্টি করেছে যা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না।

শুধুমাত্র সংলাপ দিয়ে বাঙালির তৎকালীন ইতিহাস, ধর্মীয় ভাব, সংস্কৃতি, রাজনীতি, পালাবদলের যে আবহ তৈরি করা যায় তা এই সিনেমা প্রমান করেছে। ১০৫ মিনিটের সিনেমায় প্রত্যেকটা সংলাপই যেনো একেকটা ইতিহাস যা বাঙালির এক অমোঘ আমেজে তৈরি করা হয়েছে।

সিনেমার গল্পে ফিরে যাওয়ার আগে একটু ইতিহাস দেখে আসি চলুন।

সালটা ১৯৩১, ভারতবর্ষ তখন পরাধীন, মহালয়ার পুন্যলগ্নে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে (আকাশবানী) প্রথমবার সম্প্রচারিত হল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। পরবর্তী ৪৫-টি বছর মহালয়ার সকালে বাঙালিকে একজোট করলো এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সুত্রধরের ভুমিকায় থাকলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। চিত্রনাট্য লিখলেন বানী কুমার।

অনুষ্ঠানের গানগুলিতে সুর দিলেন প্রবাদপ্রতিম পঙ্কজ মল্লিক। সঙ্গীত পরিবেশনার দায়িত্বে ছিলেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, শিপ্রা বসুর মত স্বর্ণযুগের শিল্পীরা।

প্রথম ৩৫ বছর রেডিওতে লাইভ পাঠ হলেও ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ডিং করা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচার করা শুরু করে অল ইন্ডিয়া রেডিও। তালটা কাটল ১৯৭৬ সালের মহালয়ার দিন সকালে। সেই বছর অল ইন্ডিয়া রেডিও সিদ্ধান্ত নিল মহালয়ার সকালের অনুষ্ঠানটি নতুনভাবে সাজাবে তারা। সেইমত স্তোত্রপাঠের দায়িত্ব পেলেন মহানায়ক উত্তম কুমার।

কিন্তু অনুষ্ঠানের পর আসলেই কি বাঙালি তাঁদের নায়ক উত্তম কুমারকে গ্রহণ করেছিলো? এতো কাল ধরে চলে আসা ঐতিহ্য কে কি বাঙালী এক লহমায় ভুলে গিয়েছিলো। কেমন করেছিলো তা একটু উত্তম কুমারের সংলাপেই শুনি।

– সকাল থেকে অজস্র ফোন, শুভেচ্ছা। বাড়িতে যারা রয়েছে তাঁরাও হুল্লোড় করছে কিন্তু কনসার্ন অন্য জায়গায়। এটা তো সিনেমা নয়, মহালয়া। আগমনীর মেজাজ ছড়িয়ে পড়ার কথা। বীরেন দা’র কণ্ঠে যখন রেডিওটা গমগম করে উঠতো তখন মনে হতো পুজো এসে গেছে। দু’দিন ছুটি নেই। শ্যুটিং থেকে বেড়িয়ে এসে ঐ মণ্ডপের কোনায় গিয়ে বসি। কিন্তু আজ শুধু উত্তম কুমারের কথা শুনছি। মনের মধ্যে ঐ পুজোর ব্যাপারটা নাড়া দিচ্ছে না। স্পটলাইটের কথা তো ছিলো না, ছিলো পুজোর। পুজোর গন্ধ, মেজাজ, পুজোর সকাল। মানুষের ভালোবাসা তো থাকবেই তবে পুজো এলো কি?

উত্তম কুমার ঠিকই বুঝেছিলেন। শ্রোতারা তাঁকে গ্রহন করল না। সেদিন অল ইন্ডিয়া রেডিও উপলব্ধি করল, যে বাঙালি মহানায়ককে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, সে অন্য কাউকে কখনও গ্রহন করবে না। অতএব অল ইন্ডিয়া রেডিও তাঁর পুরনো অনুষ্ঠান যা বীরেন বাবুর ছিলো তাই নিয়ে ফিরে এল। কাশফুলের গন্ধ মেখে, আধো ঘুমচোখে বাঙালি আবার শুনল মহামায়ার আগমনীর গান

– জাগো দুর্গা। জাগো দশপ্রহরণধারিণী। অভয়াশক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো।

বাঙালির চিরাচরিত এই অনুষ্ঠান ও ইতিহাসকে সম্বল করে সিনেমা নির্মান করেছে এন আইডিয়াস ক্রিয়েশনস এন্ড প্রোডাকশনস। ছবির নাম ‘মহালয়া’। সিনেমার কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় সৌমিক সেন। যার সাথে চিত্রনাট্য ও সংলাপে ছিলেন তন্ময় মুখার্জী। ছবিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল এর কাহিনি তুলে ধরা। বাঙালির জানা গল্প তাঁরই কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন সৌমিক সেন।

সেক্ষেত্রে তথ্যবহুল করে জ্ঞানের যোগান দিতে গিয়ে ছবিটিকে ডকুমেন্টরি ফিল্মের মতো করে বানানো হয়নি। আবার ‘মাস অডিয়েন্সের’ কাছে পৌছ দিতে ড্রামাটিক এলিমেন্টের ব্যবহার করে চিত্ত বিনোদনেরও প্রয়াস রয়েছে। মহালয়া সম্পর্কিত ঘটনার সাথে ১৯৭৫ সাল নাগাদ ভারতবর্ষে চলা ইমারজেন্সি পিরিয়ডেরও উল্লেখ রয়েছে।

এবার আসা যাক চিত্রনাট্য ও পরিচালনার কথায়। চিত্রনাট্য তৈরির ক্ষেত্রে অডিয়েন্স সাইকোলজি নজরে রেখেছেন ছবির নির্মাতারা। তাই ছবির প্রয়োজন অনুযায়ী কাহিনীর বর্তমান ও অতীতের কন্ট্রাস্টটি তুলে ধরাতে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। সেক্ষেত্রে কালার গ্রেডেশন ডিপার্টমেন্টকে বাহবা দিতে হয়। একটা পিরিয়ডিক সিনেমা অনুযায়ী মানানসই একটা ভিন্টেজ লুকস দিয়েছেন ছবির দৃশ্যগুলিকে।

ছবিটি নির্মাণের ক্ষেত্রে যে প্রচুর পরিমান গবেষণা রয়েছে তার জন্য একবার হলেও অন্তত চাক্ষুষ করা দরকার ‘মহালয়া’ সিনেমাটিকে। ছবিতে সমান্তরাল ভাবে স্ক্রিনস্পেস শেয়ার করেছেন শুভাশীষ মুখার্জী ও যীশু সেনগুপ্ত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদার্ত কণ্ঠ ও ব্যাক্তিজীবনের দৃশ্যায়নে শুভাশীষ মুখার্জীর সাবলীল ভঙ্গিমা প্রশংসনীয়। অন্যদিকে লার্জার দ্যান লাইফ মহানায়কের চরিত্র চিত্রায়নে যীশুর চেষ্টাটি বেশ ভালই। উত্তম কুমারের ভাব-ভঙ্গিমা, কথা বলার ধরণগুলি বেশ ভালো অনুকরন করেছেন যীশু সেনগুপ্ত। ছবির সঙ্গীত দেবজ্যোতি মিশ্রের। প্রয়োজন অনুযায়ী সঙ্গীতের আশানুরূপ ব্যাবহার হয়েছে।

আগেই বলেছিলাম সংলাপ প্রান প্রতিষ্ঠা করেছে এই ছবিতে। সো কলড ইন্টেলেকচুয়াল শব্দ নিয়ে খেলা ও তার ব্যাবহারে বাক্যবাগীশের ন্যায় একে অপরকে খোঁচা দেওয়া আবার একই সঙ্গে প্রশংসা করার দিকগুলি চোখে পড়ছে। তবে এই সিনেমার ব্যাক্তিগত ভাবে প্রিয় একটা সংলাপ দিয়েই শেষ করবো।

– তুমি তো হৃদয়ের মানুষ গো। সেখানেই তো অ্যাট্যাক। আধমরা দের দোষ ধরতে নেই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।