এলআরবি’র বাচ্চু লিগ্যাসি ও একজন বালামের আগমন

একদা ঢাকা শহর চষে বেড়াতাম এলআরবির কনসার্ট শুনতে, দেখতে। আইউব বাচ্চু ও তাঁর দলের সদস্যরা অনন্য মুখরতা নিয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজাত! সে কী উচ্ছল প্রাণাবেগ! আইভানেজ গিটারের উত্তাল টুংটাং, প্রত্যেক শ্রোতার কণ্ঠে ‘সেই তুমি..’, প্রতিটি গানের শেষে দর্শকদের সাথে বাচ্চু ভাইয়ের ইন্টারেকশন আর উপসংহারে সেই বিখ্যাত জাতীয় সংগীত গিটারের অনিন্দ্য মূর্ছনাতেই।

শুনতে কী যে ভালো লাগত। বারবার শুনতাম, একই রকম, তবু ভালো লাগত। কখনও সখনও চোখ বেয়ে জল গড়াতো গিটারের সাথে ‘আমার সোনার বাংলা’র মনোহর সুর শুনে!

আইউব বাচ্চু নেই। গতবছর তাঁকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। এবারের এলআরবি’র ‘বাচ্চুবিহীন’ ২৮তম জন্মদিনে ভোকাল, কম্পোজার এবং গিটারিস্ট হিসেবে এলআরবিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিলেন বালাম। তারপর থেকে এলআরবি ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। কেউ তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছে, কেউবা সমালোচনা করছে। অধিকাংশই নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে বালামের অন্তর্ভুক্তিতে। আমি বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। এবং এই বিষয়ে আমি কিছু পয়েন্ট যোগ করে দিচ্ছি।

প্রথমত, এই প্রজন্মের অধিকাংশ বালাম বলতে বালামের একক ক্যারিয়ারই বুঝে থাকে। এবং সেই বিবেচনায় বালামকে জাজ করাটা ঠিক হবে না। আদতে বালাম যে হেভিমেটাল রক মাতানো ওয়ারফেজ থেকে উঠে আসা, ওয়ারফেজের প্রথম অ্যালবামের হিট গান ‘কৈশোর’ যে ১৯৯১ সালে তার সুর ও কম্পোজিশনে করা, তা এই প্রজন্ম হয়তোবা জানে না।

বালাম যে ভোকাল গিটারিস্ট হিসেবে ওয়ারফেজের কাণ্ডারী ছিলেন টানা দশ বছর, তাঁর যে অসংখ্য হিট ব্যান্ডগান রয়েছে, তাও অনেকেই জানে না। জানলে কনফিউশন কিছুটা কমতো বলে মনে হয়। সম্প্রতি এই প্রসঙ্গে বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হয়। তাঁরা এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়।

দ্বিতীয়ত, এলআরবি’র একজন ভোকাল, কম্পোজার, মিউজিশিয়ানের প্রয়োজন ছিল। কেবল একজন গায়ক দরকার ছিল না। বালাম শুধু ভয়েস দেন না, সুর করেন, দারুণ গিটার বাজান, ব্যান্ড চালাতে জানেন, পারেন স্টেজ মাতাতেও। বালাম মিউজিক তৈরি করতেও পারেন।

আমি বালামের ভক্ত না হয়েও একজন পোড় খাওয়া বাংলা গানের শ্রোতা হিসেবে বলছি, এই মুহুর্তে বালাম ছাড়া এলআরবিতে পারফর্ম করার মতো আর কেউ নেই। আর তিনি যেহেতু বহু ব্যান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন, তাই বৈচিত্র্য আনতে হয় কীভাবে, তার তা ভালোভাবেই জানা আছে বলে আমি মনে করি।

তৃতীয়ত, প্রতিটি ব্যান্ডের নতুন ভোকাল নেবার ক্ষেত্রে সেই ব্যান্ডের অন্ধ সমর্থকেরা প্রথমে মেনে নিতে চায় না প্রবৃত্তিগত কারণেই। আমি এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখি। কিন্তু পরবর্তীতে, বিষয়টা মেনে নেয় তারা সময়ের স্রোতের আবর্তে। ওয়ারফেজ, শিরোনামহীন, সোলস, ব্ল্যাক, ফিডব্যাক ইত্যাদি অনেক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

অস্বীকার করার জো নেই যে, বাচ্চু ভাইয়ের অনবদ্য সুর-কন্ঠ-লিরিক বালামের মাঝে পাওয়া যাবে না। তাকে অনেক অনেক মিস করা হবে। বাট দ্য শো মাস্ট গো অন!

এটাই যে ধারা, এটাই যে রীতি। প্রথম প্রথম এলআরবি ভক্তদের কাছে বালামের ভয়েজ খাপছাড়া লাগলেও পরে ঠিক হয়ে যাবে বলে আমার মনে হয়। আমার শৈশব কৈশোর এলআরবি, বাচ্চু, জেমস, আজম খান, অন্যান্য ব্যান্ডের মোড়কে কেটেছে। তবু আমি পরিবর্তন মেনে নিতে পারি। শিরোনামহীন যেমন আবার আগের মতো হয়ে যাবে, আশা করি।

এলআরবিও হবে বোধকরি। ওয়ারফেজ থেকে যখন সঞ্জয় বের হয়ে গিয়েছিলে, অনেকেই তা মানতে পারেনি। বালাম দশ বছর ছিলেন, ওয়ারফেজ আগের জায়গাতেই ছিল। বালাম যাবার পরে মিজান আসলেন এবং চলেও গেলেন। এখনো মিজান ছাড়া ওয়ারফেজকে অনেকেই কল্পনা করতে পারে না। কিন্তু ওয়ারফেজ তার আপন গতিতেই চলছে এবং চলবে। সোলসের ক্ষেত্রেও এই কথা খাটে। এটাই সময়ের নিয়ম। এটাই কালের পরিক্রমা।

বাচ্চু ভাইয়ের অতি পরিচিত, পুরাতন, হৃদয়ে দাগ কাটা এলআরবি-কে আমরা হয়তো আর কখনও ফিরে পাব না, তবে বালামের নেতৃত্বে নতুন বিচিত্র ভিন্ন এক এলআরবি’র জন্ম হোক, এটাই চাইবো! বালামের যাত্রা শুভ হোক। এলআরবি-তে স্বাগতম।

এলআরবির নতুন লাইন আপ

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।