অজয়-কাজল: একটি অতিমানবীয় পরিণয়

নব্বই দশকের জনপ্রিয় সিনেমা ‘পেয়ার তো হোনা হি থা’য় দেখা মিলেছিল শেখর আর সানজানার রসায়ন। সিনেমায় দেখা গিয়েছিল যাত্রাপথে হঠাৎ বন্ধুত্ব, ভালোলাগা সবশেষে নানা ঘটনা পেরিয়ে সফল পরিণয়। সিনেমার মত বাস্তব জীবনেও এই জুটির সফল পরিনয় ঘটেছিল। বলিউডের রুপালি পর্দার তারকাদের মাঝে বাস্তব জীবনেও জুটি বেঁধে নিজেদের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন অজয়-কাজল দম্পতি।

নিন্দুকেরা বলেন, প্রথম জীবনে অজয়ের নাকি কোনো নারীর সাথেই থিতু হতে পারতেন না। অনেকের সাথেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে গুজব আছে। এর মধ্যে রাভিনা ট্যান্ডন কিংবা কারিশমা কাপুররাও ছিলেন। কিন্তু কোনো সম্পর্কই লম্বা হয়নি। এমন সময়েই তাঁর জীবনে আসেন কাজল।

দু’জনের পরিচয়ের শুরুটা ১৯৯৫ সালে ‘গুন্ডারাজ’ সিনেমার শ্যুটিংয়ে। সেইখানেই পরিচয়, প্রথম দেখায় বিশেষ কিছু মনে হয়নি। বরং অজয়ের একেবারেই কম কথা বলা, সিগারেট খাওয়া নিয়ে প্রাণোচ্ছল কাজল কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলেন। তবে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল। কাজল তখন একটা সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, সেই সময় অজয়ের কাছ থেকেই পরামর্শ নিতেন। ইশক সিনেমার সেটে যখন আমির-জুহির ঝগড়া চলছিল, তখন অজয়- কাজল ভালোবাসার নতুন সম্পর্কে জড়াচ্ছিলেন।

১৯৯৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি – এই দিনে পুরো বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে বিশেষ দিন হয়ে গিয়েছিল। আজকের দিনেই ভারতের মহারাষ্ট্রীয় কায়দা মেনে বিয়ে করেছিলেন অজয়-কাজল। বিয়েটাও ছিল খুব ‘ইন্টারেস্টিং’। অজয়কে ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ কেউ ‘ক্যামেরা শাই’ বলে থাকেন। বিয়েতেও নিজের এই তকমার প্রতি সুবিচারই করেছিলেন তিনি। বিয়ের জন্য কোনো পেশাদার ফটোগ্রাফার নিয়োগ করতেই তীব্র আপত্তি ছিল তার। তিনি চেয়েছিলেন একটা ঘরোয়া বিয়ে। অজয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠিত বিয়েটা শেষ অবধি একদম ঘরোয়া না হলেও যা ছবি পাওয়া যায়, সেসব পরিচিত লোকজনই তুলেছিলেন।

শুরুতেই কেউই তাঁদের সম্পর্কের কথা বিশ্বাস করেনি। সিনেমাতেও জুটি হিসেবে খুব উল্লেখযোগ্য ছিলেন না, তাই সবচেয়ে অবাক হয়েছিল তাদের বিয়ের কথা শুনে। ‘বিয়ে টিকবে না’ – এই কথাও বলে দিচ্ছিলেন কেউ কেউ। তবে, সেগুলোতে কান না দিয়ে, বিয়ের পর ইউরোপ থেকে দু’মাসের লম্বা হানিমুনও করে আসেন নবদম্পতি।

মজার ব্যাপার হল, তাঁদের প্রেমটা আসলে চারপাশের অন্য দশটা গল্প থেকে একদমই আলাদা। কাজল একবার বলেছিলেন, ‘আমরা বিয়ের আগে প্রায় চার বছরের মত সময় প্রেম করেছি। আমরা ছিলাম খুব ভাল বন্ধু। আমার মনে হয় আমরা দু’জন দু’জনার সাথে খুব কথা বলতাম। এটাই আামাদের সম্পর্কের মূল সূত্র। অজয় একদমই রোমান্টিক নয়। কখনো ভালবাসা দিবসে আমাকে একটা গোলাপও দেয়নি। বিবাহবার্ষিকীর দিনটার কথাও ওকে তিনদিন আগে মনে করিয়ে দিতে হয়। তবে, ওর থাকতে কখনো নিজেকে আমার অনিরাপদ মনে হয়নি। আমি জানি সব সময় ও নিজের শতভাগ দিয়ে আমার পাশে থাকবে।’

আর অজয় বলেন, ‘প্রচলিত প্রেমগুলোর মত আমাদেরটা ‘আই লাভ ইউ’-তে সীমাবদ্ধ নয়। আসলে আমরা কেউ কখনো একজন আরেকজনকে প্রস্তাব করিনি। বিয়ে নিয়েও খুব বেশি আলোচনা করিনি। কারণ, আমরা জানতাম এটাই আমাদের নিয়তি।’

দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র পর সদ্য ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ এর মত তুমুল সাড়া জাগানো সিনেমা উপহার দিয়ে কাজল তখন শীর্ষ নায়িকা। নিজের ক্যারিয়ার তখন আরো ভালোভাবে বিকশিত করার কথা। বিয়ে করা মানেই তো ক্যারিয়ার বিরতি নেয়া। সেই সময় এমন সিদ্ধান্ত আসলেই অবাক হবার মত। তবে এ কথা এখনো অনেকেই বলেন কাজল যদি তখন বিরতি না নিতেন, তাহলে একদিন মহাতারকার খেতাব পেতেন।

অজয় তখন খান বা কাপুরদের মত জনপ্রিয় না হলেও মোটামুটি হিট দিয়ে যাচ্ছেন। দু’জন দুটি ভিন্ন ধারার সিনেমা করতেন, এরা বাস্তব জীবনে জুটি হবে এমন ভাবেন নি কেউ। বিয়ের পর স্বাভাবিক ভাবেই কাজল বিরতি নিয়েছেন। মাঝে মাঝে এসে ‘কাভি খুশি কাভি গাম’, ‘ফানাহ’, ‘মাই নেম ইজ খান’-এর মত ছবি করেছেন।

তবে নিজেকে আরো নন্দিত ও জনপ্রিয়তম করে তুলেছেন অজয় দেবগন। দু’বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। প্রকাশ ঝা, রামগোপাল ভার্মা থেকে রোহিত শেঠির সবার সাথে অভিনয় করে সুপারহিট সব সিনেমা উপহার দিয়েছেন। কাজলের সিনেমার সংখ্যা কম হলেও তাঁর চার-পাঁচটি সিনেমা খুবই দর্শকপ্রিয়, ব্যবসায়িক ভাবে এদিক-সেদিক হলেও অজয়ের সে তুলনায় দর্শকপ্রিয় ছবি কম। অন্যদিকে অজয় বাণিজ্যিকের পাশাপাশি শিল্পমান সমৃদ্ধ ছবি অনেক করেছেন, নিজেকে ভেঙেছেন। কাজল সেটা পারেননি বা করতে চান নি।

সেই সময় এই জুটির বিয়ে হোক অনেক ভক্তই চাননি। বাইরের লোকের কথা আর কি, খোদ কাজলের বাবাই চাননি। কিন্তু কাজলের একাগ্রতায় তিনি হার মানেন। অজয়-কাজল দু’জনই তারকা পরিবারের সন্তান। সব সংসারেই কিছু মান-অভিমান থাকে, সেটাকে পাশ কাটিয়ে তাঁরা দুই সন্তান নিয়ে নিন্দুকের মুখ কুলুপ এঁটে ভালোবেসে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাঁদের সংসারের ভেতরের খবরও যেমন খুব একটা বাইরে আসে না, তেমনি টানাপোড়েনের রমরমা কলামও খুব একটা ছাপা হয় না কোথাও। ২০ বছরের এই ইনিংসে এই ইমেজটা অন্তত সৃষ্টি করতে পেরেছেন এই দু’জন। বিয়ের পর যে সব গণমাধ্যম লিখেছিল, ‘এই সম্পর্ক টিকবে না’, সেই তারাই এখন দু’জনের পারিবারিক ছবি নিয়মিত ছাপিয়ে থাকে।

কোনো গুঞ্জন উঠলেও সেসব নিয়ে তারা ‘থোড়াই কেয়ার’ করেন। কাজল যেমন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি কোনো গুজবে বিশ্বাস করি না। কারণ, এই ইন্ডাস্ট্রিতে কি হয় আর কি হয় না সেটা আমরা জানি। আর কিছু প্রাথমিক বিশ্বাস আর ভরসা না থাকলে তো আসলে বিয়ে টেকানোই মুশকিল। আমি তাই কোনো গালগল্পে কখনো কান দেই না।’

এভাবেই তাঁরা ‘মনিকাঞ্চন যোগ’ হয়ে পার করে দিক সারাটা জীবন। অজয় যেমনটা বলেন, ‘আমাদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তবে, এই পার্থক্যগুলো দিয়েই আমরা দু’জন দু’জনকে পরিপূর্ণ করে তুলি।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।