নক্ষত্রের মাঝে হারিয়ে যাওয়া সুশান্ত

আমি হিন্দী ভাষা একদমই বুঝি না। তাই হিন্দী সিনেমাও সচারাচর দেখা হয় না। হাতে গোনা বলিউডের তারকাখ্যাত কয়েকজন অভিনয় শিল্পীকে চিনি। এর বাইরে বলিউড সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা নেই।

কয়েকদিন আগে সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার ঘটনায় সকলের মাঝে ব্যাপারটা যেভাবে নাড়া দেয় সত্যি বলতে আমার মনে সেভাবে নাড়া দেয়নি। কারণ আমি বলিউড অভিনেতা সুশান্তকে খুব ভালো করে চিনতাম না। শুধু জানতাম ধোনির বায়োগ্রাফি সিনেমায় সে ভালো অভিনয় করেছে। তাই অন্য আট-দশটা আত্মহত্যার মত সুশান্তের আত্মহত্যাটা আমার কাছে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিলো।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিভিশন, ইউটিউব, খবরের কাগজে লাগাতার সুশান্তকে নিয়ে নিউজ দেখে আমার মনে কৌতুহল জন্ম নেয়। সুশান্তকে নিয়ে আমার জানার বিশেষ আগ্রহ তৈরী হয়। তাই গত কয়েকদিন যাবত আমি পুরাতন নিউজে, ভিডিও, আর্কাইভে সুশান্তকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছি। আসলে আমি যত এই লোকটা সম্পর্কে জানতে পেরেছি তত বেশী অবাক হয়েছি।

শুরুতে আমি সুশান্তকে একজন শিল্পী কিংবা সেলিব্রেটি হিসাবে খুঁজতে যাইনি। একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে সুশান্ত কেমন সেটা বুঝতে চেষ্টা করেছি। মানুষ হিসাবে তার আইডিয়োলজি, অপিনিয়ন, পার্সেপশন, থিঙ্কিং ক্যাপাবিলিটি বুঝতে চেষ্টা করেছি।

এসব খুঁজতে গিয়ে যা বুঝলাম সেটা হচ্ছে, সুশান্ত আসলে বাকী দশজন মানুষের মত না। আলাদা বলতে গেলে সে একটু বেশীই স্পেশাল। সুশান্ত প্রচন্ড রকমের স্বপ্নবাদী একজন মানুষ ছিলেন। সবাই আসলে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে কিন্তু বাস্তবে রূপ দিতে পারে না। কিন্তু সুশান্ত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে জানতেন, রিয়েলিটি ব্যাপারটা খুব ভালো করে বুঝতেন। উনার ধ্যান-ধারণা ছিলো, চেষ্টা করলে সবকিছু অর্জন করা সম্ভব। ঠিক সেটাই তিনি প্রমাণ করেছিলেন।

সুশান্ত সবসময় নতুন কিছু জানতে পছন্দ করতেন। নিজেকে কখনোই জ্ঞানী মানুষ ভাবতেন না। জগতের সবকিছু থেকেই যে শেখার একটা ব্যাপার আছে এটা উনাকে দেখলে বুঝা যায়। সুশান্তের রিডিং রুম পৃথিবী বিখ্যাত সব বই দিয়ে ঠাসা। বইয়ের প্রতি সুশান্তের ভালবাসা দেখে সহজে অনুমান করা যায় কতটা জ্ঞানপিপাসু একজন মানুষ ছিলেন।

আমি প্রায়ই একটা ব্যাপার খেয়াল করি, যাদের প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক আছে তাদের হৃদয়টা একটু কোমল প্রকৃতির হয়। সুশান্তের ক্ষেত্রে আমি একই বিষয় লক্ষ্য করেছি। প্রচন্ডরকম প্রকৃতিপ্রেমী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি সবুজ ভালবাসতেন, পাহাড় ভালবাসতেন, সমুদ্র ভালোবাসতেন। প্রত্যেকদিন ভোরবেলা সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে বেলকুনিতে মিষ্টি রোদের আলোয় তার দিন শুরু হতো। মাঝে মাঝে আকাশ ভরা জোছনা দেখে পুরো রাত কেটে যেতো।

পশু-পাখির প্রতি যাদের ভালবাসা কাজ করে তারা মানুষ হিসাবে যেমনই হোক অন্তত খারাপ আত্মার মানুষ না। ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির প্রতি সুশান্তের প্রচন্ড ভালবাসা কাজ করতো। এমনকি এতো ব্যস্ততার মাঝেও তিনি বাসায় একটা কুকুর পালতেন। কুকুরটাকে তিনবেলা খাওয়ানো থেকে শুরু করে সমস্ত যত্ন তিনি নিজেই করতেই। সহজেই অনুমান করা যায় জগতের সকল সৃষ্টির প্রতি সুশান্তের আলাদা ভালবাসা কাজ করতো।

সবচেয়ে বেশী যে জিনিসটা দেখে অবাক হয়েছি সেটা হচ্ছে, সুশান্তের কৌতুহলী মন। রহস্যময় জিনিসের প্রতি তার মনে আলাদা ফ্যাসিনেশন কাজ করে। জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি ছিলো তার বিশেষ আগ্রহ। সৌরজগত সম্পর্কে জানতে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ কিনেছিলেন। যেখানে চোখ রেখেই রাতের আকাশে শনির বলয় দেখতেন, লুব্ধক নক্ষত্রের উজ্জ্বলতায় মোহিত হতেন। সেই সঙ্গে ছাড়াপথ নিয়েও বিস্তর গবেষণা চালাতেন। আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতেন, মহাকাশে যাওয়ার পরিকল্পনায় আবিষ্ট থাকতেন।

মানুষ একবার বিখ্যাত হলে তার পুরোনো কষ্টকর অতীতগুলো প্রকাশ করতে চায় না। সবসময় শুধু নিজের সাফল্যগুলো মানুষের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু সুশান্ত তেমন ছিলেন না। তিনি যে আজকের অবস্থানে কোনো আর্শীবাদপুষ্ট না হয়ে অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে এসেছেন সেটা অকপটে বলতেন। অন্যদের মত হিপোক্রেসি না করে বিনা সংকোচে বলতেন, তিনি নিজের বিপুল টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি, নারীসঙ্গ এসব স্বপ্ন দেখেই অভিনয় জগতে এসেছিলেন।

একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী জরুরী বিনয় প্রকাশ করা। সুশান্ত অসম্ভব বিনয়ী একজন মানুষ ছিলেন। বলিউডে সুশান্তের সবচেয়ে প্রিয় অভিনেতা ছিলেন শাহরুখ খান। উদাহারণ হিসাবে বলছি, একটা রিয়ালিটি শো’তে দেখলাম শাহরুখ খান নিজে সুশান্তের ছবি প্রমোশনের জন্য তাকে ইন্ট্রোডিউস করেন। এরকম সেশনে সাধারণত সিনিয়রদের সাথে স্টারকিডদের হাসি-ঠাট্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু সুশান্ত যে ভাষায় শাহরুখের সাথে কথা বললেন, এক কথায় অতুলনীয়।

সুশান্তের মাঝে আর একটা বিশেষ ব্যাপার খেয়াল করেছি, সে একটু ইন্ট্রোভার্ট টাইপের মানুষ। সাধারণত যারা ইন্ট্রোভার্ট টাইপের তারা তাদের অভিমান কিংবা কষ্টের কথা অন্যের সাথে শেয়ার করতে চায় না। মনের মাঝে চাপা অভিমান জমিয়ে রাখতে চায়। বদ্ধ ঘরে অসহায়ত্বে কেঁদে বুদ হয়ে যায় তবু কাউকে তারা বুঝতে দেয় না। মাঝে মাঝে সুশান্তকে দেখলে আমার এমন ফিল হচ্ছিলো।

আমি অভিনয় তেমন বুঝি না। তাই সুশান্ত কেমন অভিনয় করে সেটা আমার পক্ষে জাজ করা সম্ভব নয়। তাই যারা অভিনয় করে তাদের কাছ থেকেই বুঝতে চেষ্টা করেছি সুশান্ত আসলে কেমন অভিনয় করে?

এইজন্য বেছে নিলাম কফি উইথ করণ জোহার শো। কারণ এই শো-তে করণ জোহার সবসময় চেষ্টা করেছে সুশান্তকে কিভাবে একটু নিচে নামানো যায়। কিন্তু, করণ সবসময় সফল হননি। সুশান্তের উজ্জ্বল ভবিষ্যত সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন গুণী পরিচালক ফারহান আখতার। মহেশ ভাটের ছায়াতলে থাকা ইমরান হাশমি বলেছিলেন, বলিউডে সুশান্ত একদিন গ্রেট স্টার হবে। আমির খানের স্ত্রী-প্রযোজক কিরণ রাও বলেছিলেন, বলিউডে সুশান্ত ফিউচার স্টার হবেন। সুশান্তের মত শূণ্য থেকে উঠে আসা অক্ষয় কুমারের ধারণা, সুশান্ত একদিন বলিউডে অনেক বড় তারকা হবে। এইসব উক্তি থেকে সুশান্তের অভিনয় দক্ষতা সম্পর্কে খুব সহজে উপলব্ধি করা যায়।

সবশেষে আমার আসলে আশ্চর্য লাগে এই ভেবে, সুশান্তের মত পৃথিবীকে ভালবাসা একজন স্বপ্ন দেখা বাস্তববাদী মানুষকে কেন সবশেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সত্যি বলতে মানুষের হাজারটা ইচ্ছা পরিপূর্ণ হলেও মানুষ আসলে জীবনের তৃপ্ততা খুঁজে পায় না। আবার একটা ইচ্ছা অপরিপূর্ণ থাকলে সেটা মানুষকে বিষাদের অনলে গ্রাস করে। কারণ মানুষ স্বপ্নের কাছে হারতে রাজি নয়। হয়তো সুশান্তের বেলায় তেমনই কোনো বিষাদ নীল সুরে আচ্ছাদিত হয়ে তাঁকে গ্রাস করেছে।

নক্ষত্রের মাঝে হারিয়ে যাওয়া সুশান্তের আত্মা ভালো থাকুক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।