দ্য লাস্ট কিস ও বাদামতলী পতিতালয়ের ললিতা

ঢাকার ইতিহাসে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র হল ১৯৫৬ সালের ‘মুখ ও মুখোশ’। তবে, প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র কোনটি? সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে।

১৯২৭-২৮ সালের দিকে  ঢাকার নবাব বংশের কয়েকজন সংস্কৃতিমনা তরুণ ‘সুকুমারী’ নামের একটা চার রিলের সিনেমা নির্মান করেছিলেন। পরিচালক ছিলেন জগন্নাথ কলেজের তখনকার ক্রীড়া শিক্ষক ও বিক্রমপুরের ছেলে অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত।

তখনকার ছবিতে নারীরা কাজ করতেন না। বলা হত, ভদ্রঘরের মেয়েদের জন্য ওসব নয়। তাই পুরুষরাই নারীর চরিত্র করতেন। ‘সুকুমারী’ সিনেমায় নায়ক-নায়িকা তাই ছিলেন খাজা নসরুল্লাহ ও সৈয়দ আবদুস সোবহান। সিনেমাটি ছিল পরীক্ষামূলক একটা উদ্যোগ। তাই, কখনোই বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি এটা পায়নি।

বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃত চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘দ্য লাস্ট কিস’। এই সিনেমা দিয়ে প্রথমবারের মত কোনো বাংলা সিনেমার নারী চরিত্রে একজন নারীকেই দেখা যায়। তিনি হলেন ললিতা। কেউ তাঁকে বলতো লোলিটা। তবে, আসল নাম ছিল বুড়ি। তাঁকে ছবিতে ‘কাস্ট’ করা কঠিন ছিল না। কারণ,  এই নারী এসেছিলেন বাদামতলীর অন্ধকার পতিতালয় থেকে।

তখন ললিতার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ললিতা ছাড়াও চারুবালা, দেববালা বা দেবী নামের আরও দুই যৌনকর্মী এতে অভিনয় করেন। চারুবালাকে আনা হয় কুমারটুলী পতিতালয় থেকে, আর জিন্দাবাজার লেন থেকে আনা হয় দেববালাকে।

এবারো পরিচালনায় ছিলেন অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত। সার্বিক তত্ত্বাবধানে আবারো ঢাকার নবাব পরিবারই ছিল। তাঁদের উদ্যোগে ঢাকায় ‘ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ’ কোম্পানি গঠিত হয়। এই প্রোডাকশন হাউজই সিনেমাটি করেন।

১৯২৭ সালে শ্যুটিং শুরু হয়। নবাববাড়ির খাজা আজমল, খাজা আদিল, খাজা আকমল, খাজা নসরুল্লাহ, খাজা অজয়, খাজা আকিল, খাজা জহিরে, খাজা শাহেদ, শৈলেন রায় বা টোনা বাবু ছবিটিতে অভিনেতা হিসেবে ছিলেন। ১২ রিলের ছবি নির্মানে খরচ হয়েছিল ১৫ হাজার টাকা।

মতিঝিল, দিলকুশা গার্ডেন, শাহবাগ, নীলক্ষেত ও আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ের কাছেই নবাবদের বাগানে ছবিটির চিত্রায়ন হয়। চিত্রগ্রাহক ছিলেন খাজা জহির। সম্পাদনা করেছিলেন অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত এবং খাজা আজমল।

কাজ শেষ করতে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় লাগে।  পোস্ট প্রোডাকশন হয় কলকাতায়। ১৯৩১ সালে তখনকার ঢাকার মুকুল হলে (আজাদ হল) প্রথম ছবিটি দেখানো হয়। প্রিমিয়ার শো উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও  ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। পরে তিনি ঢাবির ভিসির দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

ছবিটির সাবটাইটেল দেওয়া হয়েছিল বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায়। প্রায় এক মাস ধরে চলেছিল সিনেমাটি। এর গল্প কেমন ছিল সে ব্যাপারে এখন আর বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায় না, কারণ কোনো নেগেটিভ আর প্রিন্ট এখন অবশিষ্ট নেই।

এর মধ্যেও যতটুকু বোঝা যায় তার সারমর্ম হল – খাজা আজমল ও খাজা আদেলের পরিবারের মধ্যে সংঘাত নিয়ে ছবির গল্প সাজানো হয়েছে। খাজা আদেলের স্ত্রী হয়েছিলেন চারুবালা, আর শিশু পুত্র খাজা শাহেদ। খাজা আজমলের স্ত্রী হয়েছিলেন ললিতা ও মেয়ে টুনটুন। এই দুই পরিবারের দুই শিশুর মাঝে স্বাভাবিক ভাবেই গড়ে উঠেছিল দারুণ এক সম্পর্ক। কিন্তু নানা ঘটনার প্রবাহে পরিবার দু’টির মধ্যে নেমে আছে বিচ্ছেদ-বিবাদ।

বাবুল ভট্টাচার্যের ‘প্রসঙ্গ: সিনেমা’-বইয়ে সিনেমাটির একটু অংশের বিবরণ আছে – ‘এক রাতে নায়ক আজমল তাঁর স্ত্রী ললিতাকে নিয়ে যাত্রা দেখতে যাবার পথে জমিদার খাঁজা নসরুল্লাহ’র লোকজন দ্বারা প্রহৃত হন। বহু খোঁজাখুঁজির পর ললিতাকে জমিদারের ঘরে পাওয়া যায়। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। নায়ক-নায়িকা ঘটনার অনিবার্য পরিণতিতে মারা যায়।’

শেষ দৃশ্যে সিনেমার দুই শিশু শিল্পী একে ওপরকে চুমু খান। ছবির নাম তাই ‘দ্য লাস্ট কিস’।

ললিতার সিনেমায় কাজ করার ব্যাপারে অবশ্য ঢাকার একটা মহল বেশ ক্ষেপেছিল। বিশেষ করে পত্রপত্রিকায় একজন যৌনকর্মীর অভিনয় করার ব্যাপারে বেশ প্রতিবাদ হয়েছিল। তাঁদের সাথে বাকিদের কাজ করাকেও অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়েছিল সে সময়। কে জানে, এ কারণেই হয়তো আর সিনেমা করেননি ললিতা।

সিনেমা শেষ করে ললিতা ফিরে যান, তার পুরনো কর্মজীবনে। তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না, কি বিরাট একটা ইতিহাস গড়ে ফেলেছেন তিনি। তাঁর জীবদ্দশায় এটা বোঝারও ক্ষমতা ছিল না তাঁর। জীবনের বাকিটা সময় ওখানেই কাটে তাঁর। কেউ ললিতার খোঁজ রাখেনি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।