লকডাউন ও সিনেমা: যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে বিনোদনের দুনিয়া

করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে বদলে যাচ্ছে বিনোদনের সংজ্ঞা। লকডাউনের কারণে সারাবিশ্বেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সিনেমা হল। অবস্থা এখন এমন যে, লকডাউন উঠলেও যে সিনেমা হল বা সিনেপ্লেক্স খোলার সম্ভাবনা রয়েছে তাও হলফ করে বলা যায় না। কারণ, করোনায় সামাজিক দুরত্বের একটি ব্যাপার মেনেই চলবে হবে সবাইকে। এমন অবস্থায় ইতিমধ্যে পিছিয়ে গেছে বহু সিনেমার কাজ এবং আগেই ঘোষিত রিলিজ ডেট। এই পরিস্থিতিতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অন্য পথে এগোচ্ছেন পরিচালক-প্রযোজকরা।

একথা মানতেই হবে যে, বিনোদন দুনিয়ার হালচাল বদলে যাচ্ছে রাতারাতি। করোনা মহামারিতে এই বদলে যাওয়ার রীতিতে লেগেছে নতুন এক হাওয়া। মানুষ সবাই ঘরবন্দী। মানসিক সুস্থতার জন্য টেলিভিশন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তাদের কাছে বিনোদিত হবার মূল জায়গা। এবং এই সুযোগে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো যেন জেগে উঠেছে সজোরে।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দর্শকদের থেকেও সাড়াও মিলছে। ঘরে থাকা মানুষদের চোখ হাতে রাখা মুঠোফোন কিংবা ঘরের স্মার্ট টিভিতে বা বেডসাইড টেবিলে রাখা ল্যাপটপে। ইচ্ছে হলেই যখন তখন সবাই ঢুঁ মেরে আসছেন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন, ডিজনি প্লাস থেকে।

কিছুদিন আগে নেটফ্লিক্সে রিলিজ পাওয়া ‘এক্সট্র্যাকশন’ ঝড়েই বোঝা গেছে মানুষ কী পরিমাণ ঝুঁকছে অনলাইনে কনটেন্ট দেখায়। শুধু তাই না, এই সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর হিসাব–নিকাশ দেখলে বোঝা যায়, ওটিটির দৌরাত্ম্য ভেতরে ভেতরে আসলে কতোখানি এগিয়ে গেছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই বসেই টিভি সিরিজ, সিনেমা সব দেখে নেয়া যায় অনায়াসেই।

গুলাবো সিতাবো

বিশ্বের অন্যতম বড় এবং বিশাল অংকের লেনদেনের ইন্ডাস্ট্রি বলিউডেও সম্প্রতি এই হাওয়া বেশ ভালো ভাবেই লেগেছে বলেই মনে হচ্ছে। লকডাউনেএবার দুটি সিনেমার অনলাইন মুক্তির ঘোষণায় যেন নতুন সিনেমা পরিবেশনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে বলিউডে। শুধু তা–ই নয়, সিনেমা হল মালিক, পরিবেশক, আইনক্স ও মাল্টিপ্লেক্স মালিকেরা নড়েচড়ে বসলেন। এই অনলাইন রিলিজ নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা বিতর্কও। তবে বলিউড যে আস্তে আস্তে করে কিছুটা হলেও ঝুঁকছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দিকে, সেটা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

সম্প্রতি অ্যামাজন প্রাইম থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সুজিত সরকার পরিচালিত ‘গুলাবো সিতাবো’ সিনেমাটি আগামী ১২ জুন বিশ্ব উদ্বোধনী প্রদর্শনী হবে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে। অমিতাভ বচ্চন এবং আয়ুষ্মান খুরানা অভিনীত এই ভিন্নধারার কমেডি সিনেমা ২০০টি দেশজুড়ে প্রিমিয়ার হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।যদিও অমিতাভ বচ্চন ও আয়ুষ্মান খুরানার মতো দুই তারকা অভিনেতার ছবি সিনেমা হলে মুক্তি পাবে না এই খবরে অবশ্য হতাশ বলিউড চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

অমিতাভ বচ্চন জানান,‘গুলাবো সিতাবো’ হলো এক টুকরো জীবন। সুজিত যখন প্রথমবার আমাকে এই ছবির কথা জানিয়েছিলেন তখন থেকেই আমি আমার চরিত্রটি নিয়ে বেশ আগ্রহী ছিলাম। এই পারিবারিক বিনোদনমূলক ছবিটির ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে এবং আমরা সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে দর্শকের সামনে আনতে পেরে খুশি।’

এদিকে পরিচালক সুজিত সরকারের ‘ভিকি ডোনার’ দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয়েছিলো আয়ুস্মান খুরানার। প্রায় আট বছর পর আবারও সুজিতের সঙ্গে জুটি বাঁধলেন ‘গুলাবো সিতাবো’র জন্যে। আয়ুষ্মানের মন্তব্য, ‘এই সিনেমা আমার জন্য খুব স্পেশাল। ভিকি ডোনারের পর আমার মেন্টর সুজিত সরকারের সঙ্গে এটি দ্বিতীয় সিনেমা। আমি আজ যে জায়গায় তা পরিচালক সুজিত সরকারের কারণেই। আমি খুব খুশি যে তিনি আমাকে তার দর্শন বা ফিলোসফির একটি অংশে স্থান দিয়েছেন এই চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দিয়ে।

এদিকে বৃহস্পতিবার গুলাবো সিতাবো ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আমাজন প্রাইমে মুক্তি পাচ্ছে ঘোষনা দেবার পরেই আরেকটি বায়োপিক ‘শকুন্তলা দেবী’ও অ্যামাজনে মুক্তি পাচ্ছে, এমন ঘোষণা এসেছে। ভারতীয় নারী গণিতবিদ ও মানব কম্পিউটারখ্যাত শকুন্তলা দেবীকে নিয়ে জীবনীভিত্তিক সিনেমাতে শকুন্তলা দেবীর চরিত্রে দেখা যাবে বলিউডের অন্যতম দক্ষ এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিদ্যা বালানকে।

বিদ্যা বালান অভিনীত শকুন্তলা দেবী মুক্তি পেতে চলেছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আামাজন প্রাইমে। গণিতে বিস্ময়কর ক্ষমতার জন্য পরিচিত প্রয়াত শকুন্তলা দেবী-র বায়োপিক এই সিনেমা। সেকেন্ডের মধ্যে জটিল অঙ্কের সমীকরণ মূহুর্তে সমাধান করে ফেলার কারণেই তাঁকে ‘মানব কম্পিউটার’ আখ্যা দেওয়া হয়।

শকুন্তলা দেবী সিনেমায় কাজ করা প্রসঙ্গে বিদ্যা বালান বলেন, ‘মানব কম্পিউটার শকুন্তলা দেবীর চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। তিনি সত্যিই এমন একজন ছিলেন যিনি নিজের স্বতন্ত্রতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, দৃঢ় নারীবাদী কন্ঠ ছিলেন এবং সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর জন্য অনেককে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তবে যা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করে তা হল সচরাচর কোনও মজাদার ব্যক্তি অঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয় এমনটা দেখা যায় না, কিন্তু তিনি এই ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমাণ করেছেন শকুন্তলা দেবী।’ সিনেমায় আরো আছেন আছেন যিশু সেনগুপ্ত, সানিয়া মালহোত্রা ও অমিত সাধ।

এই দুটি নয় আরও কিছু সিনেমা এই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে রিলেজের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বেশ জোরেশোরেই। অক্ষয় কুমার ও কিয়ার আদভানির ‘লক্ষ্মী বোম্ব’, রাজকুমার রাও, অভিষেক বচ্চনের ‘লুডো’, জাহ্নবী কাপুর অভিনীত বায়োপিক ‘গুঞ্জন সাক্সেনা: দ্য কারগিল গার্ল’ এই কাতারে আছে। সিনেমা হলে মুক্তি না দিয়ে সরাসরি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মুক্তি দেওয়ায় বিতর্ক উঠছে বলিউডে। নাখোশ হচ্ছেন পরিবেশক, সিনেমা হল ও মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে আইনক্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সিনেমা হল মালিকদের মধ্যে একটা নিজস্ব ব্যবসায়িক সম্পর্কও থাকে। যেখানে উভয় পক্ষই লাভবান হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটাই হয়ে এসেছে। আর আজ যখন একে ওপরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার সময় তখন অপর পক্ষ সেই সম্পর্ক থেকে সরে গেলেন। ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটা আদতে ভালো কিছু নয়।’

তবে কাজ শেষ হয়ে যাওয়া সিনেমা নিয়ে দিনের পর দিন এভাবে বসে থেকে লস গুনতেও রাজি না নির্মাতারা। তাই এই সময়ে ওটটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা দেখে এরকম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন বা হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অনেক নির্মাতা। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব সিনেমার সাফল্য বা ব্যর্থতাই আগামীদিনে বলিউড ইন্ডাস্ট্রির দিক বদলায় কিনা তা সময়ই বলে দিবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।