ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন!

ডেভ ইভান্স, ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি শহরের এক লিভারপুল সমর্থক। নিউজিল্যান্ডের এক হাসপাতালে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তিনি, আর প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন কেবল একটি রাত বেঁচে থাকার! স্রেফ একটা ম্যাচ দেখার জন্য লড়ছিলেন।

সামান্য একটা ফুটবল ম্যাচ!

অথচ এরকম কথা ছিল না। সব কিছু ঠিক থাকলে তাঁর এখন থাকার কথা ছিল মাদ্রিদের ওয়ান্দা মেট্রোপলিটানো স্টেডিয়ামের কাছেই কোনও এক হোটেলে। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের খেলায় লিভারপুল এক এক করে গ্রুপ স্টেজ থেকে ফাইনালে উঠেছে, আর ডেভ ও তাঁর স্ত্রী লিজ একটু একটু করে টাকা জমিয়েছেন। উদ্দেশ্য একটাই। মাদ্রিদের ফাইনালে মাঠে বসে টটেনহ্যাম হটস্পার্সের বিরুদ্ধে প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটানো। সেই মতো বুক করা হয়ে গিয়েছিল মাদ্রিদের এক হোটেলও। কিন্তু জীবন হয়তো অন্যরকম কিছু ভেবেছিল।

কভেন্ট্রি থেকে কয়েক মাস আগে ডেভ ও লিজ চলে আসেন নিউজিল্যান্ডে। আগের চেয়ে সহজ ভাবে, আরও একটু ভাল ভাবে জীবনকে উপভোগের আশায়। স্বাস্থ্যপরীক্ষায় ধরা পড়েনি কিছুই। তারপর হঠাৎই পেটের অসহ্য যন্ত্রণা! পরীক্ষায় ধরা পড়ল মারণ ক্যানসার, শেষ স্টেজ। সব আশা শেষ! তাড়াতাড়ি হোটেলের বুকিং ক্যানসেল করতে হল। জমানো টাকায় শুরু হল চিকিৎসা। তিন সপ্তাহ আগে ডাক্তাররা জানিয়ে দিলেন, আর দু’সপ্তাহ বেঁচে থাকবেন ডেভ।

সেই সময়সীমা কাটিয়ে বসে রয়েছেন ডেভ। মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখছেন চোয়াল চেপে! যেন একটা প্রচন্ড উঁচু পাহাড়ের শেষ কিনারে একটা পাথরকে কোনওক্রমে আঁকড়ে ধরে রেখে প্রায় শূন্যে ঝুলছে একজন মানুষ, নীচে প্রবল বেগে বয়ে চলেছে জলধারা। হাত ফসকে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে প্রতি মুহূর্তেই।

এটা জানা কথা যে হাত পিছলে যাবেই, মৃত্যু আসবেই। কিন্তু পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দিনের শেষ সূর্য যখন নিভে যাবে ঠিক তার আগে আকাশে, জলে, প্রকৃতির প্রতিটা অঙ্গ এক অপূর্ব অদ্ভুত রঙে ভরে উঠবে। সেই দৃশ্য না দেখে নিষ্কৃতি নেই! আর একটু বেঁচে থাকতেই হবে, আর একটু শ্বাস বাঁচিয়ে রাখতেই হবে… আর একটু!

নিজের প্রিয় দলের খেলা ডেভকে তো দেখতেই হবে! খবর গিয়ে পৌঁছেছে লিভারপুলের বর্তমান ও প্রাক্তন খেলোয়াড়, কোচ সবার কাছে। প্রত্যেকে ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন ডেভের বেঁচে থাকার জন্য প্রার্থনা তাঁরা করছেন, তাঁর এই অদম্য জীবনীশক্তিকে তাঁরা কুর্নিশ জানিয়েছেন।

লিভারপুলের বর্তমান ম্যানেজার যুর্গেন ক্লপ বলেছেন, ‘ডেভ আমাদের মধ্যে আপনি রয়েছেন…আমরাও রয়েছি আপনার পাশেই। আপনি একজন অসাধারণ জীবনযোদ্ধা। প্রতিনিয়ত নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার সেই অবিশ্বাস্য যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের ফুটবলাররা এই মরসুমে কীভাবে সুন্দর একটা যাত্রা করেছে তার কোনও তুলনাই হয় না। কারণ, ফুটবলের থেকেও জীবন অনেক বড়। কিন্তু গত কয়েক মরসুম ধরে আমরা কিছু মানুষের মধ্যে আশা জাগিয়ে তুলতে পেরেছি, মানুষকে আনন্দ দিতে পেরেছি কিছুটা। সেই সমস্ত কিছু আমরা ভাগ করে নিয়েছি একসাথেই। কালকেও সেটাই চেষ্টা করব।’

ক্লপের কথাই হয়তো সত্যি। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জীবনের চেয়ে বড়, জীবনের চেয়ে প্রিয় আর হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু ডেভ ইভান্স কি তা মানবেন? নাকি তাঁর মনে এখনও ধ্বনিত হচ্ছে আজ থেকে কয়েক দশক আগে লিভারপুলের আর এক কিংবদন্তি বিল শ্যাঙ্কলির সেই মহার্ঘ্য ‘অতিশয়োক্তি’- ‘Some people believe football is a matter of life and death, I am very disappointed with that attitude. I can assure you it is much, much more important than that?!’

বিশ্বজুড়ে চলছিল প্রার্থনা। সবাই  যেন বলছিলেন, ‘বেঁচে থাকুন ডেভ ইভান্স! আর তো কয়েকটা ঘন্টা। বেঁচে থাক সঙ্গী লিজ-এর প্রতিরোধ…’

মাদ্রিদ, লিভারপুল, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সেনেগাল, মিশর, ক্যামেরুন, ভারত, নেদারল্যান্ডস, কেনিয়া, ব্রাজিল কিংবা বাংলাদেশ … বিশ্বের নানা প্রান্তের একাধিক মানুষ যখন আপনাদের সঙ্গে জেগে ছিল, স্বপ্ন দেখছিল, চিৎকার করে উঠছিল, স্টেডিয়ামে যখন ‘ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন’ গাওয়া হচ্ছিল, ডেভ ইভান্স, আপনি সেই গানে প্রবল ভাবেই ছিলেন।

আর এই কয়েকটা ঘন্টায় তো লিভারপুল সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের অন্যতম সেরা সাফল্য নিয়েই বাড়ি ফিরলো। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিতে লেখা হয়ে গেল ডেভ ইভান্সের নাম।

ডেভ ইভান্স, ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।