লাইভ ফ্রম ঢাকা: একটি আন্তর্জাতিক মানের ছবি

একটা খোড়া লোক। শেয়ারবাজারে দরপতন। প্রেমিকার সাথে অসুস্থ সম্পর্ক। ড্রাগ এ্যাডিক্টেড ভাই। পাওনাদার… ‘আমি আর নিতে পারতেছি না, আমি তো একটা মানুষ!’

নিতে না পারলেও নিতে হবে। তেতে ওঠা এই শহর না দিয়ে ছাড়বে? ১২ মিলিয়ন মানুষ একে অপরের সাথে লেগে আছে রাত-দিন, শহর কি আসতে বলেছিলো আপনাদের? ভালো লাগে না, বমি আসে, হাসিমুখ নেই, সুন্দর স্পর্শ নেই, বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন? দূষিত বাতাস বুকে ঢুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে? পালান! বরফের দেশে চলে যান। রাশিয়া? হলো না। মালয়েশিয়া? তাই সই! প্রেমিকাটা বমি করে মরে যাক, ড্রাগ অ্যাডিক্ট ভাইটা খুপড়ি ঘরে মুখে কষ জমে পড়ে আছে। এখনই তো যাবার সময়! কিন্তু এই শহরের প্রতিহিংসা থেকে বাঁচা কি অত সহজ?

হ্যালো, ঢাকা থেকে লাইভ বলছি…

লাইভ ফ্রম ঢাকা একটি বিষণ্ণ, গুমোট, এবং অনেকটাই বিমূর্ত চলচ্চিত্র। সাদাকালো এই সিনেমাটিতে সাদা কম, কালো বেশি। চরিত্র কম, দৃশ্যকল্প বেশি। মূল চরিত্র সাজ্জাদ গাড়ি চালিয়ে এখানে ওখানে যায়, একে ওকে ফোন করে, একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটে, তবে প্রতিবারই কিছু না কিছু নতুন চরিত্র যুক্ত হয়। এই যেমন শেয়ার মার্কেটে দরপতনের খবর চলছে টিভিতে, রেডিওতে বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মারপিটের খবর, গাড়ির হর্ন, ট্রেনের হুইসেল, লঞ্চের ভেঁপু, সবসময় আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, এই শহরে প্রাণ নেই, এই শহর জাদুর শহর না।

সিনেমাটির বাজেট শুনেছি মাত্র ১০ লাখ টাকা ছিলো। ভালো সিনেমা বানাতে চাইলে যে বাজেট সমস্যা না, দরকার ভালো চিত্রনাট্য এবং সিনেমা সেন্স, লাইভ ফ্রম ঢাকা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ্যাটমোসফিয়ারিক ইন্ডি ফিল্ম যেমন হয়, যে ধারা চলছে, এটা তার বাইরের কিছু না। তবে এ্যাটমোসফিয়ার তৈরি করতে তো দক্ষতা লাগে, ফিল্ম সেন্স লাগে, সেটা পরিচালকের আছে। কম সাদা এবং বেশি কালোর গথিকতা, এবং চলমান ইন্ডাসট্রিয়াল সাউন্ড এই ছবির আবহ তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে, আর বিশেষ কিছু দৃশ্য দিয়েছে বাড়তি উৎকর্ষ।

যেমন- সাজ্জাদের বাসার জানালা দিয়ে হঠাৎ তুষারপাত হতে দেখা; সে তখন রাশিয়া যাবার স্বপ্নে বিভোর ছিলো। সেখানে বরফ পড়ে। ঢাকার মত প্রেসার কুকার না!

আরেকটি- বাসায় খাবার খেতে খেতে হঠাৎ টেবিলে এক অদ্ভুত মেয়ের দেখা মেলে। যে বিচিত্রভাবে তাকিয়ে থাকে সাজ্জাদের দিকে। একটু পরে তার হাত দেখা যায়, শেকল পরানো। সাজ্জাদ চেপে ধরে আছে অত্যন্ত জিঘাংসায়। এই মেয়েটা রেহানা (সাজ্জাদের প্রেমিকা) না। হয়তো বা সাজ্জাদের প্রাক্তন, যার কাছে সাজ্জাদ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, অথবা সে অবিশ্বস্ত ছিলো সাজ্জাদের প্রতি। হয়তো বা এখান থেকেই সাজ্জাদের মনোবিকলনের শুরু। রেহানাকে কারো সাথে হেসে কথা বলতে দেখলে সে সইতে পারে না, ফোনে কার কার সাথে কথা বলছে তাতেও ভীষণ নজরদারী।

সিনেমায় সীমাবদ্ধতা ছিলো বাজেটের, তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু কৌশলী হতে হয়েছে পরিচালককে। নিউজ ব্লুপারস, রাস্তার শব্দ, যানবহনের হর্ন দিয়ে তিনি গল্প বলিয়েছেন, গল্প বলিয়েছেন গান দিয়েও! আজম খানের ‘হয়তো বা এই দিন, থাকবে না চিরদিন’ কী সুন্দর মিলে যায় গল্পের সাথে! পাওনাদার দু’বার সাজ্জাদের বাসায় আসে, দুবারই আজান হচ্ছিলো। এর মানে কী? সরল অর্থ- আজানের সময় পাওনাদার আসে। গভীর অর্থ- সাজ্জাদের দুঃসময়ে স্রষ্টার কিছুই এসে যায় না।

শেষের দিকে কিছু জিনিস একটু বেশি পুনরাবৃত্তিক এবং ক্লিশে লাগছিলো, তবে একদম শেষটা স্তব্ধ করে দেয়ার মত। পরিচালক কোন কম্প্রোমাইজ করেন নি দর্শকের সাথে, নিজের সাথে, সিনেমার সাথে। যা দেখতে গিয়েছিলাম, তাই দেখেছি। তৃপ্ত হয়েছি। এটা টেলিফিল্মের মত সিনেমা না, বাংলাদেশি স্ট্যান্ডার্ডে ভালো সিনেমাও না। এটা একটা ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ডের সিনেমা, যা আমরা টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করে দেখে আইএমডিবিতে রেটিং দেই।

দুর্বল দিক বলা যায় সাজ্জাদের ভাই মাইকেলের অভিনয় এবং সংলাপ প্রক্ষেপন। একজন বেপরোয়া মাদকাসক্ত যুবকের জায়গায় তাকে খুব বেশি সতেজ লেগেছে, সংলাপ অনেক জায়গাতেই অস্পষ্ট। এটা অবশ্য সাজ্জাদের বেশ কিছু সংলাপেও পাওয়া গেছে।

তবে সবচেয়ে বড় অতৃপ্তি হলো ট্রেইলারের সেই সংলাপ, ‘এই বালের শহরে সবকিছুই উলটাপালটা! ১২ মিলিয়ন মানুষ সারাক্ষণ একে অপরের সাথে কুত্তার মত ঘেউ ঘেউ করে। এত মানুষের ঘাম, রক্ত, আর গুয়ের গন্ধে আমার বমি আসে।’ না থাকা।

পরিচালক কেন বাদ দিলেন এটি? নাকি সেন্সর বোর্ডের মাতবরি?

লাইভ ফ্রম ঢাকা দেখতে দেখতে মনে পড়ছিলো Requiem For A Dream-এর ভাগ্যাহত চরিত্রগুলির কথা, মনে পড়ছিলো Eraserhead-এর আবহ, তবে সবশেষে সিনেমাটি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নামক একজন প্রতিভাবান পরিচালকেরই, যিনি সিনেমা তৈরি করতে জানেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।