লিটন ও তাঁর মোনালিসার ছবি আঁকা ব্যাট

লিটন দাসের আগে সর্বশেষ কার ব্যাটিংশৈলী দেখে এমন মুগ্ধ হয়েছি? – এই প্রশ্ন করে নিজের মনকেই বিরাট একটা দ্বন্দ্বে ফেলে দিলাম। হতে পারে সেই ব্যাটসম্যানটি ব্রায়ান লারা। নাহ, সম্ভবত মার্ক ওয়াহ!

তবে, আমার চেয়েও বেশি মুগ্ধ সম্ভবত হয়েছেন একজন ক্যারিবিয়ান। তিনি হলেন ইয়ান বিশপ। ধারাভাষ্যকক্ষে তাই তিনি বলে উঠলেন, ‘আজ লিটন তাঁর ব্যাট দিয়ে মোনালিসার ছবি আঁকছেন।’

সচরাচর লিটন দাস পাঁচ নম্বরে ব্যাট করেন না। তিনি পুরোদস্তর একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান, আরো একটু এগিয়ে বললে তিনি ওপেনার। ক্যারিয়ারের একমাত্র যে ওয়ানডে সেঞ্চুরি সেটাও সেই ওপেনিংয়ে ব্যাট করেও।

তাই, বিশ্বকাপের মত মহা চাপের জায়গায় প্রথমবারের মত যিনি খেলতে নেমেছেন তাঁর জন্য ভিন্ন পজিশনে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ নয়।  তার ওপর তিনি যখন ক্রিজে আসেন তখন ১৩৩ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে বসেছে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য তখনও দরকার ১৮৯ রান।

এমন অবস্থায় সাকিব আল হাসানের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যাট করারটা জরুরী ছিল লিটনের জন্য। লিটন শুধু তালটাই মেলালেন না, ব্যাটিংটাকেই আরো সুরেলা করে তুললেন যেন। ৬৯ বলে করেছেন ৯৪ রান। আট চার ও চার ছক্কার এই ইনিংসটাকে আসলে স্ট্রাইকরেট বা চার ছক্কা দিয়ে বোঝানো যাবে না। এটা তার চেয়েও অনেক বড় কিছু।

এমন নান্দনিক ইনিংস বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসেই বিরল। টাইমিং, প্লেসমেন্ট, ফুটওয়ার্ক, পাওয়ার হিটিং, কবজির মোচড় – কী ছিল না তাতে! ক্রিকেট বিধাতা এদিন যেন সর্বোচ্চ ক্ষমতাটাই দিয়ে রেখেছিলেন লিটনের ব্যাটে। এজন্যই তো তিনি এমন মোনালিসা এঁকে ফেললেন টন্টনের বাইশ গজে!

২৯ ওয়ানডের ক্যারিয়ারে এই নিয়ে চতুর্থবারের মত পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের ইনিংস খেললেন লিটন। এর শুরুটা হয়েছে এশিয়া কাপের ফাইনাল থেকে, মানে শুরুর ‘শেকিনেস’ কাটিয়ে লিটন এখন ছন্দটা ধরতে পেরেছেন। এই সময় তার ধারাবাহিক ভাবে সুযোগ পাওয়াটা খুবই জরুরী।

অথচ, লিটন সর্বশেষ একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন আয়ারল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে, আইরিশদের বিপক্ষে গ্রুপ পর্যায়ের শেষ ম্যাচে। ৭৬ রান করেছিলেন তাতে। এরও আগে তিনি শেষ খেলেছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে।

বিশ্বকাপ বিরাট একটা ব্যাপার। এখানে ভাল করতে হলে ‘ইমপ্যাক্ট’ ক্রিকেটার দরকার। এতদিন পাঁচে ব্যাট করা মোহাম্মদ মিঠুনের যোগ্যতার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি – লিটন আর তার মধ্যে পার্থক্যটা আকাশ আর পাতালের। মিঠুন একটা ভেঙে যাওয়া টপ অর্ডারকে হয়তো জোড়া তালি দিয়ে ইনিংসটাকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবেন, কিন্তু এমন বিরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বের করে জয় এনে দিতে পারবেন না।

লিটন বড় ম্যাচের ব্যাটসম্যান, বড় আসরের ব্যাটসম্যান। তাঁকে কেন একাদশে রাখাটা জরুরী সেটা তিনি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত সুযোগ পেয়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এবার বাকি কাজটাও, মানে পারফরম্যান্সে যেন কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে – সেই কাজটাও লিটনকেই করতে হবে।

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।