লাইম লাইটে চিরনায়িকা ঋতু

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

বেতার সঞ্চালিকা নাট্যাভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী ফিরিয়ে দিলেন সুপারহিট পরিচালক প্রভাত রায়কে। প্রভাত রায় বুঝে পেলেন নাহ কাকে দিয়ে করাবেন বন্দনা পুত্রবধূ তিতলির চরিত্র। ‘সাদা পায়রা’ টিভি সিরিজে তখন অভিনয় করেছে শতাব্দী রায়ের কার্বন কপি লেডি ব্রেবোর্নে পাঠরতা এক কন্যা।

তাঁকেই প্রভাত রায় বেছে নিলেন তিতলির চরিত্রে। শতাব্দীর মতোই চালচলন নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে এলেন তিনি। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। অনেকেই বলল এ কে শতাব্দী নাকি? তার আগে হয়ে গেছিল ‘আনন্দলোক’-এ কিছু ফটোশ্যুট তাই কিছুজন জানত এ মেয়ের নাম ঋতুপর্ণা। ফ্যান্টা বলে অপর্ণা সেনের পুত্রবধূ তিতলির রোলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন ঋতুপর্ণা। এখন এত বছর পর ভাবলে মনে হয়।

মননশীল অভিনেত্রী গার্গী রায়চৌধুরী পারতেন কি তিতলির রোল? গার্গী তো ঋতুর মতো ছটফটে জলি কোনোকালেই ছিলেন বরং খুব শাড়িমনা মেয়ে। যার একদম বিপরীতমেরু তিতলি।

তিতলি মন থেকে মনে এসে গেল নায়ক ভাস্কর ব্যানার্জ্জীর বিপরীতে। কিন্তু তখন ইন্ডাস্ট্রিতে বিরাজ করছেন সর্বাধিক চাহিদার হায়েস্ট প্যাড নায়িকা দেবশ্রী রায়। সঙ্গে ওদিকে শতাব্দী, দুই ইন্দ্রাণী… দত্ত, হালদাররাও। এসছেন ইন্ডাস্ট্রিতে মিস কলকাতা রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কিন্তু শতাব্দীর কার্বন কপি তকমা ভেঙে নতুন করে নিজেকে গড়তে শুরু করলেন ঋতুপর্ণা। মিঠুন-দেবশ্রী ঐতিহাসিক জুটি ভেঙে ‘ভাগ্যদেবতা’ দেখা দিলেন মিঠুন-ঋতুপর্ণা জুটি হয়ে। প্রসেনজিত-দেবশ্রী জুটির শূন্যস্থানে এসে গেল প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি।

সেসময় দেবশ্রী রায় পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারে সেরা নায়িকার পুরস্কার চারিদিকে চুমকি জ্বলজ্বল করছে। আরো কঠিন হল লড়াই আরেক চুমকি ঋতুপর্ণার লড়াই। কিন্তু এ মেয়ে তো দমতে জানেনা। যে শক্তি ঋতুকে দিলেন আরেক ঋতু , ঋতুপর্ণ ঘোষ। লোকে তখন গুলিয়ে ফেলত ঋতুপর্ণ পর্ণা কোনটা ছেলে না মেয়েটা?

সে সময় দূরদর্শনে কোন শব্দ বলা হবে খুব মেপে ভাবতেন সঞ্চালিকা চৈতালী-শাশ্বতী-ছন্দা সেনরা, ঐ একটাই চ্যানেল তাতেই সব ধারাবাহিক, মেগা, সংবাদ। সেখানে কিছু শব্দ ব্যবহার করা রীতিমতো কঠিন ব্যাপার ছিল। এখনকার নিউজ চ্যানেলের মতো সবটাই খোলা বইয়ের পাতা ছিলনা।

তাই ধর্ষণ এর কোনো খবর কেউ আলোচনাই করতনা। না দেখাত এত এসব খবর টিভিতে। বলাটাই ছিল পাপের ব্যাপার সমাজে। সেখানে সত্যি ঘটনা অবলম্বনে সুচিত্রা ভট্টাচার্যর ‘দহন’ নিয়ে ছবি করে বিস্ফোরন ঘটালেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।

ঐ ঝলমলে নায়িকা ঋতুকেই চোখের তোলায় কালি, গালে কালসিটে, ঠোঁট কাটা, বলাৎকারে গিলতে গলায় ব্যাথা এমন এক ভয়ংকর অবস্থার ধর্ষিতার চরিত্রে বাঙালি সমাজে নিয়ে এলেন নতুন রূপে রোমিতা ঋতুপর্ণাকে পোস্টার হলে পড়তেই আইকনিক হয়ে গেল। দেবশ্রীর পরের জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গেলেন সেরা অভিনেত্রী রোমিতা হয়ে ঋতুপর্ণা।

এরপর আর ঋতুকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রসেনজিতের সঙ্গে জুটি, ওদিকে রাজা সেন, অপর্ণা সেন সবার সঙ্গে সেরা কাজ ‘আত্মীয় স্বজন’ হয়ে ‘পারমিতার একদিন’। পড়ন্ত বাংলা ছবিতে ‘আলো’ জ্বালিয়ে ‘মুক্তধারা’য় স্নাত হয়ে আজ ঋতুপর্ণা বসুন্ধরা। ‘আহা রে’ ঋতু!

অনেক গুলো বছর কেটে গেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এক নারীর ক্ষমতা দেখিয়েছেন ঋতুপর্ণা। খুব কম নায়িকার মধ্যে ঋতু একজন যিনি বিবাহের পরও প্রথমা নায়িকা রয়ে গেছেন। যা বিরলতম বিরল। উত্তম কুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবীদের উত্তরাধিকার হয়ে শিল্পী সংসদের সভাপতি আজ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। কিন্তু ঋতুর বড় গুণ সে কোনদিন পুরনোদের ভোলেনা। যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন প্রতি ধাপে।

যেমন নৃত্যশিল্পী ধীমান শংকর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ বন্ধুত্ব ঋতুপর্ণার ছবি দেখতে গিয়ে ঋতুর প্রোডাকশান হাউসে। ধীমানদাকে দেখেই ঋতু বললেন ‘এ কি ধীমানদা এত রোগা হয়ে গেছো কেন ? ছোট্ট টাচ কিন্তু আন্তরিক।’

ধীমাণদা ঋতুর সঙ্গে ইটিভি বাংলায় ‘চন্ডালিকা’, ‘শ্যামা’র কোরিওগ্রাফি করেছিলেন। নিজের প্রোডাকশানের ছবি হলেই পুরনো বন্ধুদের দেখতে ডেকে নেন ঋতু। এমনকি নিজের কারমেল স্কুলের দিদিমণিদেরও।

শেষ করি প্রভাত রায়ের একটি কথা দিয়ে – ‘আমি অনেক নবাগতাদের নায়িকা করে ছবি করেছি যারা পরে বিশাল নাম করে। কিন্তু তাঁরা আর আমায় মনে রাখেনি। শুভশ্রী গাঙ্গুলীকে ছবিতে চান্স আমিই প্রথম দিই। জিতের বোনের বড় রোল পিতৃভূমি-তে। কিন্তু সে আজ কোথাও আমার নামটা উচ্চারন অবধি করেনা। কিন্তু ঋতু সবার চেয়ে আলাদা কোথাও আজও বড় পুরস্কার পেলে বলে প্রথম চান্সটা কিন্তু প্রভাতদা দিয়েছিলেন তিতলিকে।তাই আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে। এটাই ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।