অপুর সংসার, লিলি ও দেশ পত্রিকার এক বিজ্ঞাপন

‘দেশ’ পত্রিকার ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপ ফেসবুকে খুব ঘুরছে। সবাই বলছেন এই বিজ্ঞাপন থেকে শর্মিলা ঠাকুরকে ‘অপুর সংসার’-এ অপর্ণা চরিত্রে নির্বাচন করা হয়। ঘটনাটা মিথ্য নয়, আসলে সেটা আংশিক ঠিক। সত্যজিৎ রায় তার আগেই আরো এক উঠতি নায়িকাকে অপর্ণা চরিত্রটি করতে মনোনীত করেন।

তিনি আর কেউ নন। লিলি ফুল। লিলি চক্রবর্তী।

লিলি ‘অপুর সংসার’-এর আগেই কয়েকটি ছবি করে ফেলেছেন তখন। কারণ লিলির প্রথম ছবি ‘ভানু পেল লটারি’। সেই ছবিতেই কমল মিত্র ও জহর রায়ের মতো প্রখ্যাত অভিনেতাদের সঙ্গে সাবলীল অভিনয় করে লিলি অনেকের চোখে পড়েছেন।

ছোট রোল হলেও সাবলীল। সেসময় সুচিত্রা সেন অভিনীত অসিত সেনের কালজয়ী ছবি ‘দীপ জ্বেলে যাই’ তেও কাজ করছেন লিলি। ছোটো রোল হলেও শক্ত অভিনয়। থাকতেন উল্টোডাঙার বাড়িতে।

সেদিন গেছে হারিয়ে

চোখে পড়েন সত্যজিৎ রায়েরও। সত্যজিতের প্রোডাকশন কন্ট্রোলার ভানুবাবু একদিন সকালে লিলিদের উল্টোডাঙার বাড়ি এসে হাজির। এসে বললেন ‘মানিকদা (সত্যজিৎ রায়) তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।’

লিলি তো অবাক। হাতে চাঁদ পাবার মতো। সেসময়ই সত্যজিৎ রায় দেশ পত্রিকায় এই নায়িকা চাই বিজ্ঞাপনটিও দিয়েছেন। সেখান থেকে অনেকজনকে বাছাই চলছে।

আচানক ছবিতে

লিলি বাবার সঙ্গে দেখা করতে যান সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে এক বুক আশা নিয়ে। নায়িকার রোল তাও আবার সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে। আলাপিত হবার পর কিছু কথা বললেন সত্যজিৎ এবং লিলিকে অপুর অপর্ণা মতো করে সাজিয়ে দিলেন সত্যজিৎ জায়া বিজয়া রায়। অনেক অনেক ফটো সেশন করলেন সত্যজিৎ।

তারপর চলে আসার সময় সত্যজিৎ রায় লিলিকে বলেছিলেন, ‘তোমায় আমার খুব পছন্দ হয়েছে। অপুর সংসার করছি। তবে আরেকটি মেয়েকেও ঠিক করেছি, তাঁর বাবা যদি রাজি হয়ে যান তাহলে কিন্তু তোমায় নিতে পারব না।’

 

লিলি দিন গুনছিলেন যদি ভাগ্যের শিকে ছেড়ে। কিন্তু পরে শুনলেন অপর্ণার চরিত্রটি রিঙ্কু ঠাকুর ওরফে শর্মিলা ঠাকুর করছে। শর্মিলার বাবা রাজী হলেও এই সিনেমায় নামার জন্য (হ্যাঁ নামা তখনকার লোকে নামাই ভাবত) কিশোরী রিঙ্কুকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করে স্কুল কতৃপক্ষ।পরে অন্য স্কুলে ভর্তি হন। শর্মিলা ঠাকুরকেও কম খেসারৎ দিতে হয়নি। শেষ অবধি এই বিজ্ঞাপন থেকে শর্মিলা নির্বাচিত হন। লিলি বাদ যান।

কিন্তু এরপর লিলিও থেমে থাকেননি। ‘বিপাশা’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে কাজ করেন। অন্যদিকে উত্তমকুমার লিলির খুব কাছের হয়ে যান ‘দেয়া নেয়া’ করে। ন্যাচারাল অভিনয় কি করে করতে হয় কথা বলার মাধ্যমে উত্তমকুমার লিলিকে শেখান। ‘দোলে দ্যোদুল’ গানে উত্তম-তরুণ কুমারের সঙ্গে সাবলীল অভিনয় করে লিলি তখন সবার মুখে মুখে। ‘জয়া’ ছবিতে বেশ বড় চরিত্র পান।

‘ভানু গোয়েন্দা জহর আসিসট্যান্ট’ ছবিতে নায়িকা হন লিলি। এরপর বলিউডে হৃষিকেশ মুখার্জ্জীর ছবিতেও লিলি ডাক পান। এর মাঝে করে ফেলেন তরুন মজুমদারের ‘ফুলেশ্বরী’। অনুপ কুমারের স্ত্রীর ভূমিকায়।

হৃষিকেশ বাবুর ‘আলাপ’ ছবিতে যখন কাজ করছেন লিলি তখন আবার সত্যজিৎ পত্র পান, ‘আপনার অভিনয় তনুবাবুর ‘ফুলেশ্বরী’ ছবিতে দেখে খুব ভালো লেগেছে আপনাকে আমার পরবর্তী ছবি ‘জনঅরন্য’-তে বৌদির রোলে কাস্ট করব ভাবছি।’

একাল বনাম সেকাল

লিলি আবার সুযোগ পান সত্যজিতের ছবিতে। হৃষিকেশ মুখার্জ্জীও রায়ের ছবিতে কাজ করার অনুমতি দেন। লিলি করেন ‘জনঅরন্য’।

এরপরেও সত্যজিৎ চলচ্চিত্র ‘শাখা প্রশাখা’য় বড় চরিত্র পান লিলি। কিন্তু লিলি চক্রবর্তী যদি ‘অপুর সংসার’-র অপর্ণা হয়ে সত্যজিতের চিত্রগ্রাফিতে ধরা থাকতেন, তাহলে কি জীবনটা অন্য রকম হত তাঁর?

উত্তমের সাথে

লিলি’র সেই নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। জীবনে যে মহান মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছেন সত্যজিৎ থেকে হৃষিকেশ গুলজার, উত্তম-সুচিত্রা থেকে অমিতাভ জয়া রেখা। অসিত সেন থেকে ঋতুপর্ণ, বাংলা থেকে বলিউড। তাতেই খুশি তিনি।

সেদিন অপর্ণার চরিত্র না পেলে কি হবে, ২০১৬ সালে পোস্তোতে বিপরীতে কিন্তু সেই সৌমিত্রকেই পেয়েছেন লিলি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।