ডায়েরিতে জীবনের গল্প

অর্ণবের ডায়েরি ঠিক প্রথাগত উপন্যাস নয়। এই বই একান্তই ব্যক্তি অর্ণবের জীবনের ঘটনাসমষ্টি। ডায়েরিতে যেমন মানুষ নিজের জীবনের বিশেষ স্মৃতিগুলো লিখে রাখে ঠিক তেমনিভাবে এই উপন্যাসে মূল চরিত্র অর্ণবের জীবনের বিশেষ বিশেষ স্মৃতিগুলো উঠে এসেছে।

মাঝে মাঝে লিখতে গিয়ে লেখক চরিত্রের আড়ালে নিজের জীবনের গল্পই লিখে ফেলেন। অর্ণবের ডায়েরি ঠিক এমনই একটি উপন্যাস। বইয়ের পেছনের ফ্ল্যাপে লেখক সালেহ মুজাহিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী দেয়া আছে। অর্ণবের সাথে ব্যক্তি লেখকের এত মিল যে পাঠকের মনে হতে পারে তিনি লেখক সালেহ মুজাহিদের জীবনের গল্পই পড়ছেন।

অর্ণবের জীবন খুবই সাধারণ। আমাদের চারপাশে বয়ে চলা আর দশটা ছেলের জীবনের সাথে অর্নবের খুব একটা অমিল নেই। কিন্ত লেখক অসম্ভব মমতা নিয়ে কলমের আঁচড়ে অনন্যসাধারন ভঙ্গিমায় অর্ণবের জীবনকে অন্যমাত্রা দিয়েছেন। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় অর্ণবের গল্প আমাদের সামনে বাস্তব হয়ে ওঠে।

ছোটবেলায় অর্নব আর দশটা ছেলের মতই বেড়াতে ভালোবাসত। সাইকেল চালিয়ে ঘুরতে,স্কুল পালাতে ভালোবাসত। স্কুলের রেজাল্ট খারাপ হলে বাসায় বাবার হাতে মারও খেত। আবার এই মারের হাত থেকে বাঁচার জন্যে ভুয়া রেজাল্ট কার্ডে টিচারের স্বাক্ষর নকল করে বাবাকে দেখিয়েছিল। ভুয়া প্রগ্রেস রিপোর্টের অত ভালো রেজাল্ট দেখে বাবা বিশ্বাসই করতে পারেননি তার ছেলে এত ভালো রেজাল্ট করেছে। খোঁজ নিয়ে আসল ঘটনা জানার পর অর্ণবের কপালে দ্বিগুণ মার জুটেছিল।

ভাবছেন এ আর এমনকি! সব ছেলেই কৈশোরে না বুঝে টুকটাক এসব করে থাকে। তা ঠিক। সব ছেলেই করে কিন্ত ক্লাস টেনের টেস্ট পরীক্ষায় ছয় সাবজেক্টে ফেল করার পর কটা ছেলেই বা চারটা লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশন পায়! অর্ণব কিন্ত পেয়েছিল।টেস্টে ফেল করার পর সবার সামনে অপমানিত হওয়া অর্ণব পরের চারমাস চোয়ালবদ্ধ জেদ নিয়ে পড়াশুনো করে। এই জেদ থেকেই বোঝা যায় সামনের জীবনে সে কিরকম জেদ নিয়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটবে।

অর্ণবের জীবনে দুটো প্রেম আসে। একটি হলো চৈতালি নামের এক অপরূপা। দ্বিতীয় প্রেমটি হল সমাজতন্ত্র। সমরেশ মজুমদারের বই পড়ে কমিউনিজমের নেশা ঢোকে অর্ণবের ভেতর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর পরিচয় ঘটে মার্কসবাদের অ আ ক খ এর সাথে। দেশে তখন চলছে স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র আন্দোলন। বিপ্লবের নেশায় বুঁদ অর্ণবও পথনাটককে হাতিয়ার করে যোগ দেয় এই আন্দোলনে।

সমমনা বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল অর্ণবের। কেউ ধনাঢ্য আবার কেউ বা দরিদ্র। অর্ণব বিভিন্ন শ্রেনীর বাস্তব শিক্ষা পায় এদের দেখে। এর মাঝেই অর্ণবের জীবনে ছিল চৈতালি। তবে চৈতালির সাথে সম্পর্কও টিকে থাকে না। উত্তাল সময়ের স্রোতে চৈতালি হারিয়ে যায় অর্ণবের জীবন থেকে।

বইয়ের শেষের দিকে রয়েছে মধ্যবয়স পার করা অর্ণবের গল্প। এই সময়ের অর্ণবকে দেখে আমি চমকে উঠেছি। পাঠকও নিশ্চিতভাবেই চমকে উঠবেন। প্রায় প্রতি অধ্যায়েই গল্পের গতি বাড়িয়েছে ছোট ছোট কবিতা। এতগুলো কবিতা পাঠককে উপন্যাসের মধ্যে একটি ভিন্ন স্বাদ দেবে।

লেখক সালেহ মুজাহিদ মূলত কবি। অর্ণবের ডায়েরি তাঁর প্রথম উপন্যাস।এটা প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলাতেই প্রিয়মুখ প্রকাশনী থেকে।বইটির মুদ্রিত মূল্য ১৬০ টাকা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।