বন্দরের কেরানি থেকে বাঙালির মহানায়ক

একবার মুম্বাইয়ের এক পরিচালক জানতে চেয়েছিলেন কেন তাঁর পারিশ্রমিক এত বেশি। সোজা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন এক মেয়েদের স্কুলের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে সবে সিগারেট ধরিয়েছেন, অমনি হু হু করে ভিড়। আর কিছু বলতে হয়নি। পরিচালকের যা বোঝার বুঝে গিয়েছিলেন।

এমনই ছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় যাকে আমরা মহানায়ক উত্তম কুমার নামে চিনি । ছোটবেলায় দাদু ডাকতেন তাঁকে এই ‘উত্তম’ নামে । এই মহানয়ক হওয়ার আগে নায়ক হওয়া বা তারও আগে অভিনয় করার সুযোগ? একদিন তার জন্য বন্ধ ছিলো সব। স্টুডিও পাড়ায় নিয়মিত যেতেন কিন্তু সেভাবে কেউ কাজ দিতেন না । ছিলেন কিছুটা কৃশকায় তাই দেখে অনেকেই বলতেন ‘এ কলির ভীম কে কোথা থেকে পেলেন? পায়ে পাথর না বেঁধে রাখলে তো ঝড় এলেই ঊড়ে যাবে।’ ভাবতে পারেন উত্তম কুমার কেউ এইসব শুনতে হতো ?

যদিও এইসব কথা শুনে উত্তমের মাথা থেকে অভিনয়ের ভুত নামা তো দুরের কথা আরো বেশি করে চেপে গিয়েছিলো । এরই মধ্যে একদিন গেলেন ভারত লক্ষী স্টুডিওতে । সেখানে ভোলানাথ নামের এক প্রয়োজক একটি হিন্দি ছবি প্রযোজনা করতেছিলেন, খুব সম্ভবত সিনেমার নাম ছিলো ‘মায়াডোর’। সেখানে গেলে দারোয়ান তাকে ঢুকতে দিবেই না।

পরে অনেক অনুনয় বিনয়ের পর দারোয়ানের মন গলে কোন রকমে প্রযোজকের সামনে গেলেন তাকে একটা অভিনয়ের সুযোগ দিতেই হবে । প্রযোজক অনেক দেখে শুনে ছোট্ট একটা চরিত্র সপেন তার হাতে কিন্তু সহশিল্পীর মাধ্যমে চলচিত্র অঙ্গনে পা রাখা উত্তম কুমার অভিনীত সে সিনেমা আর মুক্তি পায় নি। এক সময় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নেয়া উত্তম জীবনের শুরুতে পার্শ্বচরিত্রের দৈনিক পেতেন ১ টাকা ৪ আনা আর প্রথম মুক্তি প্রাপ্ত সিনেমা ‘দৃষ্টিদান’ এর জন্য ১৯৪৮ সালে পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন গুনে গুনে ২৭ টাকা!

বাঙালীর আজীবনের মহানায়ক সত্যজিৎ-এর নায়ক সিনেমা তে অভিনয় করার আগে খোদ পরিচালক শংকিত ছিলেন আদৌ উত্তম পারবে কি পারবে না ? নায়ক সিনেমার এমন এক চরিত্র যেখানে তার নিজের জীবনের সাথে মিলে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে, তৎকালীন ‘গ্ল্যামার বয়’ ইমেজের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এমনকি এই সিনেমায় মেকাপ ব্যাবহার করা হবে না যখন মাত্রই উত্তম চিকেন পক্সের আক্রমন থেকে সেরে উঠেছেন কিন্তু দাগ রয়ে গিয়েছিলো- এমতাবস্থায় চরিত্রটি পড়া মাত্রই তিনি রাজি হয়ে যান।

নায়ক সিনেমায় উত্তম এবং শর্মিলার প্রথম ইন্টার‍্যাকশনের দৃশ্য- শর্মিলা ঠাকুর অটোগ্রাফ চাইতে এলেন উত্তম কুমারের কাছে। উত্তম কুমার পকেট থেকে ফাউন্টেন পেন বের করে অটোগ্রাফ দিলেন ঠিকই কিন্তু কাগজে কিছুই লেখা উঠলো না, কারন তার ফাউন্টেন পেন এর কালি শুকিয়ে গিয়েছিলো। সত্যজিৎ রায় ‘কাট’ বলার জন্য যেই মুখ খুলতে যাবেন, সেই মুহূর্তে উত্তম কুমার খুব ক্যাজুয়ালি কলমের নিবটা সামনের গ্লাসে রাখা পানিতে খানিকটা চুবিয়ে নিয়ে অটোগ্রাফ দিয়ে দিলেন এবং দৃশ্যটা কমপ্লিট করে ফেললেন।

আনস্ক্রিপটেড এই ডিটেইলিং এর সময় সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বেশ স্বভাবসুলভভাবেই নিজের ডায়লগ থ্রো করে যাচ্ছিলেন, যেরকমটি কেবলমাত্র একজন আক্ষরিক অর্থে ‘নায়ক’ -এর পক্ষেই করা সম্ভব। উত্তম, সিনেমার সবচাইতে তুচ্ছ শটটিকেও এতোটা আত্মবিশ্বাসের সাথে সম্পন্ন করতে পারতেন যা আর কেউ পারতো না ।

একটা সময় ইংরেজী উচ্চারণ ঠিক ছিলো না । বাংলার ‘স’ আর ইংরেজীর ‘S’ এর উচ্চারনে গোলমাল করে ফেলতেন । এই জন্য বন্ধুরা বিশেষ করে প্রিয় বন্ধু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়শই খ্যাপাতো ‘উত্তম বাশে চড়ে বাসদ্রোণীতে যাবি?’। কিন্তু একটা সময় নিজেই শিক্ষক রেখে সব ঠিক করে ফেলেছিলেন।

উত্তম কুমার কে নিয়ে কথা বলতেছি আর সাথে সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় কিংবা প্রথম ভালোবাসা গৌরী দেবী কে নিয়ে কথা হবে না তা কি করে হয় ?

১৯৪৮ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন একই পাড়ার মেয়ে ও বান্ধবী গৌরী দেবীকে। তিনি তখনও চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হননি। তখন আলিপুর ডকে চাকরি করতেন তিনি । গৌরীর সাথে তাঁর ভালোবাসার বিয়ে। বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা। গৌরীর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছে শুনে আবেগের বশে পালিয়ে বিয়ে করেন তাঁকে।

অরুণ (উত্তম কুমার) অভিনয় করুক এটা খুব একটা পছন্দ করতেন না গৌরী দেবী। কিন্তু উত্তমকে তিনি ঠেকাবেন কি করে! অভিনয়ের নেশা ছিল তার রক্তে । খ্যাতি নাম যশ টাকা পয়সা পেলেও দাম্পত্য জীবনে সুখি ছিলেন না তিনি। গৌরী দেবী তাঁর শিল্পী সত্তাকে সেভাবে বুঝতেন না। গৌরী ছিলেন নিতান্তই সাদামাটা আটপৌরে। ঘর সংসারের বাইরে অন্য কিছু তিনি বুঝতেন না বা বুঝতে চাইতেনও না। তাই দুজনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব দিন দিন বাড়তে থাকে । উত্তমকুমার একটি স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, কোনো নতুন ছবির চুক্তিপত্রে সই হলে সে কথা যখন তিনি ঘরে ফিরে বলতেন তখন চরিত্র বা গল্প সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করার আগে প্রথমেই তার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কত দেবে?’

এভাবেই একদিন সব মুছে যায়, উত্তমের জীবনে আসে সুপ্রিয়া দেবী । উত্তম সুপ্রিয়া কে হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতে নিষেধ করেছিলেন। সেই নিষেধ মেনেই তিনি হিন্দি ছবির জগৎ ত্যাগ করেন সুপ্রিয়া। উত্তম ছিলেন খুব রোমান্টিক। আবার কখনও কখনও বেশ ঈর্ষাকাতর। বাড়িতে প্রযোজক ও পরিচালকদের বেশি আসা-যাওয়া এবং সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে আড্ডা একেবারেই পছন্দ করতেন না তিনি।

তবে সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। উত্তমের চারপাশে নারী সহকর্মী, ভক্ত আর উঠতি নায়িকাদের কমতি ছিল না। কেউ কেউ মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হতেও চাইতেন। ঈর্ষা বোধ করতেন না সুপ্রিয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘উত্তমের জীবনে তিনিই একমাত্র বিবেচ্য, এদের প্রতি কোনই আগ্রহ নেই উত্তমের।’ সুচিত্রা সেনকেও ঈর্ষা করেননি তিনি। তাঁর ভালবাসার জোর এতটাই ছিল! পর্দায় সুচিত্রা-উত্তমের রোমান্টিক দৃশ্য দেখে ওটাকে তিনি নিছক অভিনয়ই ভাবতেন, অন্য কিছু নয়। মহানায়ককে নিত্য নতুন রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতেন তিনি। আর মহানায়ক ভালোবাসতেন সেসব খেতে। সুপ্রিয়ার হাতের রান্না ছিল তাঁর দারুণ প্রিয়।

উত্তম-সুচিত্রা কে নিয়েও সিনেমা পাড়ায় অনেক কথা হতো তবুও সুচিত্রা সব সময় ‘উত্তম আমার খুবই ভালো বন্ধু বলে গিয়েছেন’ আর শেষ দিকে এসে তিনি সাবিত্রী চ্যাটার্জীর সাথে অভিনয় করেন । সাবিত্রী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সাবিত্রী খুবই শক্তিশালী অভিনেত্রী।’

শিকারের নেশা ছিলো তাঁর মধ্যে । ১৯৭৫ সাল, তখন শক্তি সামন্তের ‘অমানুষ’ সিনেমার কাজ চলছে, ‘কি আশায় বাঁধি খেলা ঘর বেদনার বালুচরে’ এই গানটির শ্যুটিং-এর জন্য কলকাতা থেকে লঞ্চ নিয়ে সুন্দরবন এলাকায় রওনা হলো সিনেমার পুরো টিম। গানের শ্যুটিং হচ্ছে, সন্ধ্যাও নেমে আসছে। কিন্তু কাজ শেষ করতে করতে হঠাৎই বনের মধ্যে ঘন সন্ধ্যা নেমে এল লঞ্চের ভেতর, উত্তম কুমার, শর্মিলী ঠাকুর, উৎপল দত্তসহ আরও কয়েক জন। পরিচালক বলেন, এই লঞ্চ ঘোরাও ক্যাম্পের দিকে চলো। অন্ধকারে বনের ভেতর ছোট ছোট নদী, চালক ঠিক দিক খুঁজে পাচ্ছিল না। কিছু দূর চলার পর মনে হচ্ছিল আরও গভীর বনের ভেতর তাঁরা ঢুকে পরছে।

শর্মিলী ঠাকুর ভীষণ ভয়ে অস্থির। লঞ্চের ওপর শক্তি সামন্ত। কিছু দূর যাওয়ার পর। একটা আলো দেখতে পান। চালকে বলেন, আলোর কাছে লঞ্চ নিয়ে চল। কাছে গিয়ে দেখে একটা ছোট্ট দোকান। লঞ্চ থেকে নেমে শক্তি সামন্ত বলেন, আপনাদের এখানে কোন শুকনো খাবার হবে। আমরা শহর থেকে এসেছি খাবার শেষ। দোকানদার এক ধামা মুড়ি নিয়ে লঞ্চের ভেতর আসে- এসে দেখে ভেতরে উত্তমবাবু! তাকে দেখে মুড়ির ধামা রেখে প্রমাণ করেন। তারপর বলেন, আপনারা একটু অপেক্ষা করেন আমি আসছি। এই বলে লোকটা চেলে যায় কিছুক্ষণ পর দেখা গেল। নদীর পাড়ে শত শত মানুয়ের হাতে হারিকেন। তারা চিৎকার করে বলছে, আমরা মহানায়কে দেখতে চাই! শেষে উত্তম কুমার লঞ্চ থেকে বেড় হয়ে সবার সঙ্গে দেখা করেন। এই ছিল বাঙালির মহানায়ক।

উত্তম-সুচিত্রা

উত্তম কুমারের খুব ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষ ছাড়া কেউই প্রায় জানতেন না শুটিং চলার ফাঁকে ফাঁকে উত্তম কুমার লিখছিলেন তার আত্মজীবনী। একজন মহান অভিনেতা তার আত্মজীবনী লিখবেন এটা অবাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু পিলে চমকানোর মতো ঘটনা ছিলো অন্য। তার মৃত্যুর দিনেই উধাও হয়ে যায় তার আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিটি। তার মৃত্যুর বহু পরে খুঁজে পাওয়া যায় সেটি। পরে প্রকাশ করা হয় বই আকারে। বইয়ের নাম ‘আমার আমি’।

এই বইয়ে রয়েছে অনেক না জানা ঘটনা, আছে বন্দরের কেরানি অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের উত্তম কুমার হয়ে ওঠার গল্প। আছে তার সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, সম্পর্ক, পরিবার এসব নিয়ে অনেক কথা। খুব বেশিভাবে এ বইজুড়ে রয়েছে এক অভিনেতার একাকীত্বের কথাও। আত্মজীবনীতে মহানায়ক উত্তম লিখেছিলেন, ‘আমার হৃদয় জানে’- এই আলো এই ঔজ্জ্বল্য কিছুই একদিন থাকবে না। এই আলো একদিন নিভে যেতে পারে, আমাকে ছুড়ে ফেলতে পারে গভীর অন্ধকারে।’

সত্তরের দশকের শেষের কথা। খ্যাতির মধ্য গগনে তখন উত্তমকুমার। এক দিন হঠাৎ কথা প্রসঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বললেন, ‘ধুর আর ভাল লাগছে না!’

শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন সৌমিত্র। তাঁকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন ‘বুড়োর রোলগুলো করতে হবে না? কোত্থেকে হবে, এখন থেকেই ভাল না লাগলে? আপনি আর আমি বুড়ো না হলে ইন্ডাস্ট্রিতে ভাল বুড়ো পাওয়া যাবে না!’ শুনে হাসতে শুরু করেন উত্তম। না! উত্তমের আর বুড়ো হয়ে ওঠা হয়নি।

মা খালা দের ম্যাটিনী শো কিং, আপামর বাঙালির আবেগ, প্রেম বা বাস্তবতার মাধ্যমে একটা প্রজন্ম কে অভিনয়, সৌন্দর্য আর ব্যাক্তিত্ব দিয়ে বুঁদ করে রাখা মহানায়ক বুড়ো হতে না পারলেও, আজো তাঁর চীরযৌবনের চেহারাটা বেঁচে আছে বাঙালির হৃদয়ে।

নায়কের সেটে উত্তমকে শট বুঝিয়ে দিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।