মামুট্টি: মনোমুগ্ধকর এক মালায়ালাম সম্রাট

মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে তাঁকে যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি আলাদা করা যায় না তাঁর পরিবারকেও। পরিবারের সবচেয়ে ‘সিনিয়র’ মানুষটি হলেন মামুট্টি। তিনি মালায়ালাম চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিজের স্থানটা এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছেন, যে তাকে আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।

নক্ষত্রখচিত এক ক্যারিয়ার তাঁর। প্রায় ৫০ বছর ছুঁইছুঁই লম্বা ক্যারিয়ারে এমন অসংখ্য ছবি তিনি করেছেন, এমন অনেক চরিত্র তিনি করেছেন যা দেখে দর্শকরা তাজ্জব বনে গেছেন। আর এই করে তিনি জিতে নিয়েছেন কোটি ভক্তের হৃদয়। হয়ে উঠেছেন মলিউডের প্রবাদ পুরুষ, ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম একজন কিংবদন্তি। বলা যায়, তাঁর কাছে মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ঋণের কোনো শেষ নেই। তিনিই মলিউডের হৃদয়, তিনিই আত্মা!

মামুট্টি ১৯৫১ সালের সাত সেপ্টেম্বর ভারতের কেরালায় অবস্থিত আলাপফুজা জেলার একটি মধ্যবিত্ত মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ‍পুরো নামটা বেশ বড় – মুহাম্মদ কুট্টি পানিপারামবিল ইসমাঈল। বাবা ইসলাঈল ছিলেন কৃষক। আর মা বাড়ির দেখাশোনা করতেন। মামুুট্টি দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ছিলেন সবার পড়।

কোট্টায়ামে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি যান ইরনাকুলামে। সেখানেই তিনি আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। এমনকি দু’বছর তিনি ওকালতিও করেন।

৭০ দশকের শুরুতে তিনি নাম লেখান মলিউডে। ১৯৭১ সালে ‘অনুভাবানজাল পালিচাকাল’ ছবির মাধ্যেম চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। আর বাকিটা তো ইতিহাস!

অভিনেতা হিসেবে মামুট্টিকে অমিতাভ বচ্চন, কমল হাসান কিংবা রজনীকান্তদের সমকক্ষ বলে বিবেচনা করা হয়।  এটা স্রেফ মুখের কথা নয়। অমিতাভের বলিউড ক্যারিয়ার ৫০ বছরের, শিশুশিল্পীর জীবন বাদ দিলে কমল হাসানের ৪৯ বছরের। সেখানে এরপরই আছেন ম্যামুট্টি। তিনি ৪৮ বছর ধরে আছেন ইন্ডাস্ট্রিতে।

এই ৭০ ছুঁইছুই বয়সেও তিনি দিব্যি প্রধান চরিত্রগুলো বাগিয়ে নেন। বছরের একগাদা ছবি করেন। তিনি একাধারে মালায়ালাম, তামিল, তেলেগু, কান্নাড়া, হিন্দি ও ইংরেজি – এই ছয়টি ভাষার চলচ্চিত্রেই অভিনয় করেছেন। ২০১৯ সালেও তাকে পাঁচটি ছবিতে কাজ করতে দেখা গেছে।

পুরস্কার গ্রহণের দিক থেকেও অমিতাভ ও কমল হাসানের পরেই আসবে তাঁর নাম। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৩ টি ফিল্মফেয়ার, ১১ টি কেরালা চলচ্চিত্র সমালোচক পুরস্কার, সাতটি কেরালা রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার – মালায়ালাম সম্রাটের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে এগুলো পালকের মত শোভা পাচ্ছে।

ভারতীয় সিনেমায় অবদানের জন্য ভারত সরকার ১৯৯৮ সালে তাকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করে। এর বাদে ইউনিভার্সিটি অব কালিকূট এবং ইউনিভার্সিটি অব কেরালা ২০১০ সালে পৃথক পৃথকভাবে মামুট্টিকে ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট) উপাধি প্রদান করে।

ব্যক্তিগত জীবনটাও মামুট্টির বেশ পরিচ্ছন্ন। সুলফাতকে বিয়ে করেন ১৯৭৯ সালে। মামুট্টির বয়স তখন মোটে ২৮ ছুয়েছে। অন্যান্য তারকারা যখন ক্যারিয়ারে বেশি মনোযোগী হন, তখন বিয়ে করে সংসার ধর্মে মন দিয়েছেন মামুট্টি। কারণ, তিনি বৈবাহিক সম্পর্ককে ক্যারিয়ারের বাঁধা নয়, বরং সম্পদ মনে করতেন।

কখনোই দু’জনের মধ্যকার কোনো টানাপোড়েনের খবর পাওয়া যায়নি। বরং, সুলফাত বরাবরই মামুট্টির পাশে ছিলেন ছায়ার মত। মামুট্টির জীবনকে তিনি নতুন আরেকটা মাত্রায় নিয়ে যান তিনি। মামুট্টি একবার বলেছিলেন, ‘আমার একজনই বান্ধবী। আর সে হল আমার স্ত্রী।’

১৯৮২ সালে এই দম্পতি প্রথমবারের মত বাবা-মা হন। জন্ম হয় তাদের মেয়ে সুমির। এর কয়েক বছর পর আসেন দুলকার সালমান। বাবার নামের প্রতি সুবিচার করে সালমান শুধু চলচ্চিত্রেই আসেননি, নিজেকে সময়ের সেরাদের একজন হিসেবে প্রমাণ করে ফেলেছেন ক্যারিয়ারের অল্প কয়েকটা বছরেই। এই পরিবারে অবশ্য এই দু’জন বাদেও আরো কয়েকজন অভিনেতা আছেন। মামুট্টির ভাই পানিপারামবিল ইসমাঈল ও ভাতিজা মকবুলও অভিনয়ের জগতে আছেন।

মামুট্টিতে পর্দায় যতই প্রতাপশালী মনে হোক না কেন, তিনি স্বল্পভাষৗ, লাজুক ও সর্বোপরি একজন নিপাট ভদ্রলোক। জনপরিসরে খুব বেশি কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন না। বরং কাছের ও আপনজনদের সাথেই সময় কাটাতে বেশি পছন্দ তাঁর। কারণ, এই কাছের মানুষগুলোই মামুট্টির এক্স-ফ্যাক্টর, আরো সামনে এগিয়ে যাওয়ার চালিকাশক্তি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।