ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে

ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে–

দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।

একাত্তরের জননী খ্যাত বীরাঙ্গনা লেখিকা রমা চৌধুরী মারা গেছেন। গেল ৩ সেপ্টেম্বর (২০১৭) ভোর রাত সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর দোসরদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন রমা চৌধুরী। নিজের সম্ভ্রম ও সন্তান হারানোর তীব্রযন্ত্রণা আর সীমাহীন দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে কেটেছে তার সংগ্রামী জীবন।

অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত রাস্তায় ফেরি করে নিজের লেখা বই বিক্রি করে জিবীকা নির্বাহ করতেন তিনি। ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান। মা মোতিময়ী চৌধুরী শত বাধা পেরিয়ে তাঁকে পড়াশোনা জন্যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যান। মায়ের অনুপ্রেরণায় ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের তিনিই প্রথম নারী, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ রমা চৌধুরীর সামনে মূর্তিমান আতংক হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় তাঁর স্বামী তাঁকে ছেড়ে দেশান্তরী হয়ে যান। সাগর আর টগর দুই সন্তানকে নিয়ে রমা চৌধুরী পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায় থাকা শুরু করেন। ১৩ মে সকাল বেলা, পোপাদিয়ায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা রমা চৌধুরীর বাড়িতে আক্রমণ চালায়। এই ক্ষত তিনি এখনো ভুলতে পারেননি। সেদিন পাকিস্তানি এক সৈনিক তাঁর সম্ভ্রম কেড়ে নেন। তাঁর উপর চালান শারীরিক নির্যাতন। ওই বিভীষিকার বর্ণনা রয়েছে তাঁর ‘একাত্তরের জননী’ বইয়ে।

সেখানে লিখেছেন, ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হলো পাক সেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও। তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’ সম্ভ্রম হারানোর পর রমা চৌধুরী পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেছিলেন।

হানাদাররা তাঁকে না পেয়ে গানপাউডার দিয়ে ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায় সম্পদ সবকিছুই পুড়িয়ে দেয়। ঘরবাড়ি সহায় সম্বলহীন বাকি আটটি মাস তিনি দুইপুত্র সাগর, টগর আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পাড় করেছেন। পোড়া ভিটায় কোনোরকমভাবে পলিথিন আর খড়কুটো মাথায় আর গায়ে দিয়ে রাত কাটিয়েছেন। এইভাবে বহু কষ্টে যুদ্ধের দিনগুলো পাড় করেন।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তাঁর ছেলে সাগর ছিল সাড়ে পাঁচ বছরের। দুরন্ত সাগর মিছিলের পেছনে পেছনে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে ছুটে বেড়াত। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে একসময় সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায়। সাগরের মৃত্যুর ১ মাস ২৮ দিনের মাথায় ৩ বছরের ‍টগরও মারা যায়। দুই সন্তানের দেহ মাটিতে আছে বলে রমা চৌধুরী জুতা পড়া বন্ধ করে দেন।

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। সম্মানীর বিনিময়ে তাঁকে পত্রিকার ৫০টি কপি দেয়া হত। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবনজীবিকা। পরে তিনি নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন।

তাঁর সমস্ত বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন ছায়াসঙ্গী হিসেবে সবসময়ই তাঁর পাশে থেকেছেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে বর্তমানে তিনি নিজের ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ভৃত্য’, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘নীল বেদনার খাম’, ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

রমা চৌধুরী নিজেই নিজের বই ফেরি করে বিক্রি করতেন। এ দিয়েই তিনি থাকা খাওয়ার সংস্থান করতেন। একই সঙ্গে পরিচালনা করছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে একটি অনাথ আশ্রম। প্রচণ্ড কষ্টের জীবন কাটলেও তাঁর দু’চোখে স্বপ্ন সুখ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।

দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খুলতে চেয়েছিলেন রমা চৌধুরী। অনাথরা সেখানে থাকবে। মনুষ্য দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তারা কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন প্রতিনিয়ত।

কৃতজ্ঞতা: গেরিলা ৭১ ও তুষার টুসকি

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।