পুরনো দিনের নূতন

এই নারীকে প্রথম দেখায় খুব কম মানুষই চিনবেন, এটা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। অথচ তিনি শুধু বলিউড না ভারতের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে স্বীকৃত! অবাক লাগছে?

আরো অবাক হতে হয় যখন জানতে পারি একসময়ে সেরা অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে সর্বাধিক পাঁচটি ফিল্মফেয়ার জয়ী অভিনেত্রী তিনিই ছিলেন। বহুবছর সেই রেকর্ড তাঁর ছিল,পরে তাঁকে যিনি ছুঁয়েছেন তিনি আর কেউ নন, তাঁর আপন ভাগ্নী কাজল, যাকে চিনেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল। সব ক্যাটাগরি ধরলেও একসময়ে সর্বাধিক আটটি ফিল্মফেয়ার জয়ী অভিনেত্রীও তিনিই ছিলেন।

এবং এখানেও তাঁকে একসময়ে ছুঁয়েছেন আরেক কিংবদন্তী জয়া ভাঁদুড়ি বচ্চন। অর্থাৎ তাঁর বিখ্যাত ভাগ্নী কাজল কিংবা জয়া তাঁর রেকর্ডগুলোতে ভাগ বসিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আজো তাঁকে ছাড়াতে পারেননি। তিনি কতটা আন্ডাররেটেড, কতটা বিস্মৃত আমাদের কাছে, তার আরো কিছু উদাহরণ দেই।

তাঁর ছোটবোন তানুজা মুখার্জী একসময়ে বলিউডের অনেকবড় তারকা হওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে ও হারিয়ে গেছেন। শেষপর্যন্ত আর যেকোন ব্যর্থ লিডের মত সাপোর্টিং রোল করেই ক্যারিয়ার লম্বা করেছেন। সেই বোনকে ও মানুষ বেশ ভালোভাবেই চিনে, অথচ তাঁকে চিনেনা!

তাঁর ছেলে মনিষ ব্যাল একজন সফল সহ-অভিনেতা, টিভি, ফিল্ম দুই মিডিয়াতেই। বিশেষ করে সালমান খান আর সুরাজ বারজাতিয়া – এই দুজনের খুব প্রিয় এই মানুষটি। তাঁদের সিনেমা মানেই একসময়ে এই ছেলের উপস্থিতি ছিল ধ্রুব সত্যের মত।

এমন সব চরিত্র করে পুরো ক্যারিয়ার কাটিয়ে দেওয়া মানুষটাকেও আমরা কমবেশী চিনি, কিন্তু তাঁর বিখ্যাত মা সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখিনা। তাঁর বিখ্যাত ভাগ্নীর স্বামীও একজন বিখ্যাত মানুষ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী, বলিউডের অন্যতম টপ স্টারদের একজন অজয় দেবগন।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, তাঁর নামের একজন অভিনেত্রী আমাদের দেশেও আছেন, একসময়ে যিনি রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুকদের সাথে নায়িকা, খলনায়িকার অভিনয় করেছেন। এখন স্বাভাবিক কারণেই মায়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন।

তাঁর সমসাময়িক নার্গিস, মধুবালা, সুচিত্রা সেন, বৈজয়ন্তী মালা, মিনা কুমারী, ওয়াহিদা রহমানদের আমরা চিনি। মুগ্ধ হই তাঁদের সৌন্দর্য আর প্রতিভার বিস্ফুরণে, অথচ তাঁকেই চিনতে গুগল করতে হয়! যদিও বাকিদের তুলনায় তিনি যে শুধু বেশি ফিল্মফেয়ারই জিতেছেন তা নয়, তাঁর ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তিও সবচেয়ে বেশি।

তাঁকে প্রথম দেখেছি বিটিভিতে, ‘কর্ম’ সিনেমায়। ১৯৮৬’র ক্লাসিক মুভিটা বিটিভিতে দেখানোর কারণ সেইসময়ে সার্ক সম্মেলনে এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে সদস্য দেশগুলোর একটা করে বিখ্যাত ফিল্ম সকল দেশ তাদের সরকারি চ্যানেলে দেখাবে। সেই শর্ত মোতাবেক বিটিভিতে কর্মসহ উর্দু, নেপালি, সিংহলিজ ভাষার মুভি দেখানো হয়েছিল পরপর।

অনেক আগের কথা, তাই সালটা মনে করতে পারছিনা তবে ১৯৯৭-৯৮ হবে,কারণ টিভিতে যখন বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছিল বারবার তখন আমি এবং আমার বয়সী অনেকেই মির্জা গালিবের কারণে কর্ম দেখতে আকৃষ্ট হয়েছিলাম! দিলীপ কুমার, শ্রীদেবী, অনিল কাপুর বা জ্যাকিশ্রফকে তখন মোটামুটি চিনতাম, কিন্তু আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল মির্জা গালিব!

মির্জা গালিব রহস্যের সমাধান করি। তিনি কে সেটাতো আমরা মোটামুটি সবাইই জানি, তাঁর জীবনীর উপর ১৯৮৮ সালে একটা টিভি সিরিজ নির্মিত হয়েছিল, সেটা বাংলায় ডাবিং করে সেসময়ে বিটিভিতে দেখানো হচ্ছিল। আর গালিবের চরিত্রে ছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ, যেহেতু নাসিরের নাম জানতাম না তাই তাঁকে মির্জা গালিব বলেই সম্বোধন করতাম!

যাই হোক, কর্ম-তে ঐ বিখ্যাত অভিনেত্রী কে দেখে কোন ভাবান্তর হয়নি, কারণ একেতো আমি তাঁকে চিনতাম না, দ্বিতীয়ত তখন আমি নিজেই শিশু। এরপর বহুবছর কেটে গেছে,বলিউডে আসক্ত হয়েছি, কিন্তু ওই নারীকে নিয়ে মাথা ঘামাইনি।

বহুবছর পর ২০০৭ এ জি সিনেমায় তাঁকে দেখলাম স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে, ‘সওদাগর’ মুভিতে। পুরো মুভি দেখার পর বাধ্য হলাম এই নারী সম্পর্কে আগ্রহী হতে, বিস্মিত হলাম এটা ভেবে যে তিনি দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেছেন, আবার অমিতাভের বিপরীতে ও অভিনয় করেছেন!

আমার মনে হয়না, বলিউডের আর কোন কিংবদন্তী এতটা আন্ডাররেটেড তাঁর মত,তবে মানুষের স্মৃতি থেকে ক্রমাগত মুছে গেছেন এমন কিংবদন্তীর সংখ্যা কম নয়, তাঁদের নিয়ে হয়তো আরেকদিন লেখা যাবে। নামটা না বলে দিলেও চলে! কারণ পুরো লেখায় অগণিত ক্লু দিয়েছি যা থেকে খুব সহজেই তাঁর নামটা বের করে ফেলা যায়।

তবুও বলি, তিনি হলেন ৭০টিরও বেশি সিনেমা করা কিংবদন্তিতুল্য অভিনেত্রী নূতন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।