জাঁদরেল পুলিশ অফিসার কিংবা একজন ‘আন্ডাররেটেড’ কিংবদন্তি

রাজকুমার। নামটি শুনলে যেকোন বলিউডপ্রেমীর মানসপটে যাঁর ছবি প্রথম ভেসে উঠে তিনি তর্কযোগ্যভাবে বর্তমানে ভারতের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা, রাজকুমার হিরাণী। তাঁর পরে আরো একজনের কথা অনেকেরই মাথায় আসে, তিনিও নির্মাতা, যদিও হিরাণীর মাপের নন,তারপরও একজন কিংবদন্তী নির্মাতা নি:সন্দেহে,তিনি রাজকুমার সন্তোষী।

বর্তমান প্রজন্মের একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান অভিনেতা রাজকুমার রাওয়ের কথাও কেউ কেউ বলবে। কিন্তু যাঁর কথা বলছি তিনি এঁদের কেউ নন, তিনি বহুআগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া, বিস্মৃত হয়ে যাওয়া এক কিংবদন্তী। যদিও রাজকুমার তাঁর ফিল্মি নাম, পারিবারিক নাম কূলভূষণ পণ্ডিত।

একজন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার থেকে একজন জাঁদরেল অভিনেতায় রূপান্তর হওয়াটাই একটা মিরাকল। তিনি কি ভুল সময়ে জন্মেছিলেন? খোলা চোখে মনে হবে, হ্যাঁ। দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর আর দেব আনন্দের সমসাময়িক হিসেবে জন্মানোটা একটা অভিশাপের মতই।

বৃহত্তর ভারতে দৃষ্টি প্রসারিত করলে উত্তম কুমার, এনটিআর, এমজিআর, শিবাজী গণেশন, জেমিনি গণেশনদের মত মহারথীদের দেখা পাওয়া যায় যাঁরা সেসময়ে বাংলা আর সাউথ ইন্ডাস্ট্রিগুলো নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। কিন্তু রাজকুমার সাহেব যদি অন্য কোন দুর্বল জেনারেশনেও (মিঠুন পরবর্তী ৮০’র দশক, ঋত্বিকের ০০ দশক) জন্ম নিতেন তাহলে?

তাহলেও তিনি যতটুকু সফল হয়েছেন ততটুকুই সফল হতেন, যতটা ব্যর্থ হয়েছেন ততটুকু ব্যর্থতারই মুখোমুখি হতেন,এমনটাই মনে করেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা! কারণ তাঁর খোশমেজাজ, অনেকটা রাজাবাদশা, জমিদারদের মত খুবই শৌখিন মেজাজি আর খামখেয়ালি ছিলেন তিনি।

বলিউডে তাঁর থেকে বেশি মুডি আর জেদী ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মূলত একারণেই একক নায়ক হিসেবে তাঁর সফলতা একেবারেই নগণ্য। তাঁর বেশিরভাগ সফল ফিল্মই মাল্টি স্টারকাস্টেড। কিন্তু এতটাই প্রতিভাবান ছিলেন যে, প্রায় প্রতিটা তারকাবহুল ফিল্মেই নিজেকে আলাদা করে প্রমাণ করতেন।

দিলীপ কুমার ও অমিতাভ বচ্চনের সাথে

সর্বকালের সেরা কিছু ভারতীয় ফিল্ম তাঁকে ছাড়া অপূর্ণ। ‘ওয়াক্ত’, যশ চোপড়ার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট, যেখানে শশী কাপুর,সুনীল দত্ত,বালরাজ সাহনীদের মত শক্তিমান অভিনেতারা থাকা সত্ত্বেও রাজ নিজের স্বাতন্ত্র্য ঠিকই বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

‘মাদার ইন্ডিয়া’ নার্গিস আর সুনীল দত্তের অনবদ্য পারফর্ম্যান্সের কারণেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকলেও সেখানে রাজের ছোট্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ রোল ছিল। মিনা কুমারীর শেষ ফিল্ম ‘পাকিজা’,যেটাকে অনেকেই তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন সেখানে মীনার নায়ক হিসেবে ছিলেন কুমার।

সুভাষ ঘাইয়ের ক্যারিয়ারে অনেক অসাধারণ ফিল্ম থাকলেও, পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার তাঁর ভাগ্যে একবারই জুটেছিল, ১৯৯১-এর ব্লকবাস্টার ‘সওদাগর’। যার এতবড় সাফল্যের মূল কারিগর দুই কুমার, দিলীপ আর রাজ। তাঁর আরেকটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল, সাপোর্টিং রোল করেও তিনি নায়কের থেকে সব আলো নিজের দিকে কেড়ে নিতে পারতেন।

দিলীপ কুমার যেটা খুব ভালোভাবেই টের পেয়েছিলেন ‘পয়গাম’-এ, রাজেশ খান্না টের পেয়েছিলেন ‘কুদরাত’-এ। তাঁর অসম্ভব ব্যক্তিত্ব আর জেদের কারণে অনেক বড় বড় কিংবদন্তী মহারথী অভিনেতা, পরিচালকেরা তাঁর সামনে কুঁকড়ে যেতেন, তাঁর সাথে কাজ করতে ভয় পেতেন।

কারণ তাঁদের ভয় ছিল যত ছোট্ট রোলই দেওয়া হোকনা কেন রাজকুমার ঠিকই সবাইকে ম্লান করে দেবেন। বলা হয়ে থাকে ঠিক এ ভয়েই অমিতাভ বচ্চন অসংখ্যবার সুযোগ পেয়েও তাঁর সাথে কাজ করতে রাজি হননি। মজার ব্যাপার হল, ‘জাঞ্জির’ যেটা অমিতাভের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট, সেটা প্রথমে রাজকে অফার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ‘না’ করে দিয়েছিলেন। তাঁর জাঁদরেল ব্যক্তিত্ব আর খেয়ালি মেজাজের কারণে রাজ কাপুর, দিলীপ আর বিবেক আনন্দের সাথে তাঁর সম্পর্ক কখনোই মসৃণ ছিলনা।

একটা জায়গায় তাঁকে একবাক্যে ‘সর্বকালের সেরা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেন চলচ্চিত্র বোদ্ধা আর সমালোচকরা। সেটা হল ডায়লগবাজি। তাঁকে ডায়লগবাজির শাহেনশাহ হিসেবে মেনে নিতে কার্পণ্য করেননি তাঁর সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও। হিন্দি আর উর্দুর অপূর্ব মিশেলে তিনি মুগ্ধ করে দিতেন সবাইকে।

হিট ফ্লপ যাইই হোক তাঁর ডায়লগবাজির কারণেই তাঁর ফিল্মগুলো বারবার দেখা যায়। বয়সে ছোটবড় সবাইকেই তিনি ‘জানি’ বলে সম্বোধন করতেন, পরে সেটাই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়, এই একটা দুঅক্ষরের শব্দকে তিনি করে তুলেছেন কিংবদন্তী।

জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত ‘জানি’ তাঁর মত করেই চলেছেন, ক্যারিয়ারের অসংখ্য সুযোগ হাতছাড়া করেও তাঁর কোন আফসোস ছিলনা। কিন্তু আমরা যারা তাঁর কোন কাজ দেখিনি তাদের আফসোস হবে তাঁর অসাধারণ কাজগুলো দেখলে, কারণ তখন বুঝতে পারবো কি মিস করেছি এতদিন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।