লাইফ ইজ বিউটিফুল: জীবন সুন্দর, নির্মমও বটে

‘জন্ম মানে মৃত্যুর প্রতি অমোঘ যাত্রা, জন্মদিন মানে একটি সিঁড়ি অতিক্রম’ – রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র পঙ্কতিটুকু কমবেশি সবারই জানা। তেমনি ইতালিয়ান সিনেমা ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ও কমবেশি সবার দেখা। জীবন সুন্দর, নির্মমও বটে। নির্মমতাকে পাশ কাটিয়ে সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করতে হয়। সেই সুযোগটুকুও যদি না থাকে কল্পনায় একটা জগৎ সৃষ্টি করে হলেও ভালো থাকতে হয়।

১৯৩৯, ইতালির কোন এক রাস্তায় দুই আরোহী বন্ধুকে নিয়ে ছুটে চলছে একটি জীপ। গাড়ির চালক বন্ধুটি একজন কবি, আপন মনে আউড়ে যাচ্ছেন কবিতা। কবিতার শেষলাইনে গাড়ি ব্রেক ফেল হবার কথা বলতেই কাকতালীয়ভাবে সত্যিই ওদের গাড়িও ব্রেক ফেল করে! কখনো কখনো কাকতালের ফাঁকতালে জীবনের গল্পের নতুন অধ্যায় তৈরি হয়।

যেমনটা তৈরি হয়েছে গাড়ির অপর বন্ধু ‘গুইদো’ (রবার্তো বেনিনী)র জীবনে। রাস্তার ধারের এক বাড়ির সামনে দেখা হয় ‘ডোরা’ (নিকোলেত্তা ব্রাসচি)র সঙ্গে। গুইদোর মজার আচরণে মুগ্ধ হয় ডোরা আর ডোরার রূপে গুইদো। সেখান থেকে গাড়ির ব্রেক ঠিক করে কবি বন্ধুসমেত গুইদো আশ্রয় নেয় চাচার বহু পুরনো হোটেলে, নেয় ওয়েটারের কাজ।

গুইদো ছিল বেশ মজার এবং বিচক্ষণ এক ব্যক্তিত্ব। যেন রঙিন পর্দার সবাক চার্লি চ্যাপলিন। সর্বক্ষণ হাসিঠাট্টায় মেতে থাকতে পছন্দ করতো। তার বুদ্ধির পরিচয় মেলে যখন সরকারি এক ডাক্তার তাদের হোটেলে রাত্রিযাপনে এসে ধাঁধার খেলায় মেতে থাকতেন ওর সাথে। ওদিকে ডোরার সঙ্গে নিয়মিতই দেখা হতো, যার সবকটাই কাকতাল!

ডোরাকে পেতে নানান কাণ্ড করতে থাকে গুইদো, যা ভীষণ হাসাবে।এভাবেই দু’জনার মন দেয়া নেয়া। এতটাই যে সম্ভ্রান্ত এক খ্রিস্টান পরিবারের মেয়ে হয়েও নিজের বিয়ের রাতে সামান্য ইহুদি ওয়েটারের সঙ্গে পালিয়ে সংসার পাতে সে! জন্ম নেয় ভালবাসার ফসল, ছেলে ‘জশুয়া’ (জর্জ ক্যান্তারিনি)।

১৯৪৫, ওয়েটার থাকাকালীনই বইয়ের দোকান দেবার যে ইচ্ছে জাগে গুইদোর তা আলোর মুখ দেখে। স্বামী-স্ত্রী দুইয়ের রোজকারে ভালোই কাটছিল দিনকাল, দেখতে দেখতে এসে যায় একমাত্র সন্তানের পঞ্চম জন্মদিন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেদিনই নাৎসি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে তারা। গুইদো, জসুয়া, গুইদোর চাচা সবাই। নিজের মাকে আনতে বাইরে যাওয়া ডোরা ফিরে যখন ঘরের ছন্নছাড়া দশা দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না কিছুই। সেও স্বেচ্ছায় বন্দী হয়ে স্বামী সন্তানের সঙ্গে পাড়ি দেয় অজানা গন্তব্যের পানে!

নাৎসি ক্যাম্পে এসে গুইদো বুঝতে পারে দাসত্ব করে সে বেঁচে থাকতে পারলেও তার অবুঝ শিশুকে ওরা বাঁচতে দেবে না। কেননা, বুড়ো এবং বাচ্চাদের দিয়ে যেহেতু কাজ করানো যায় না সেহেতু বাঁচিয়ে রাখার কোন মানে নেই। গুইদোর চাচাও তাই মৃতের মিছিলে বিলীন হয়ে যায়। ক্যাম্প থেকে পালানোও অসম্ভব। শুরু হয় অভিনব এক লড়াই। সন্তানকে বাঁচানোর। গুইদো কি করে বাঁচায় তার আদরের সন্তানকে?

গল্পের শুরু মূলত সেখান থেকেই। ত্যাগের গল্প, দায়িত্বের গল্প, উপস্থিত বুদ্ধির গল্প। উপস্থিত বুদ্ধি শব্দগুচ্ছকে নতুন করে উপলব্ধি করবেন আপনি। প্রতি মূহুর্তে উৎকন্ঠা ঘিরে ধরবে আপনাকে। এই বুঝি এই হলো, এই বুঝি সেই! সৈন্যদলের সামনে ধরা বুঝি খেয়েই গেল বাচ্চাটা। প্রিয়তমা স্ত্রী অভিন্ন ক্যাম্পে থাকলেও দেখা হবার জো নেই। তবু, থেমে নেই ভালবাসা প্রেরণ! নারীদের দলের সঙ্গে নারী সেজে প্রিয়তমাকে দেখতে চাওয়ার চেষ্টার শেষ পরিণতি কি মধুর হয়? শেষটা যেমন চোখে জল আনবে তেমনি একচিলতে হাসিতে অলক্ষ্যেই উচ্চারিত হবে ‘লাইফ ইজ রিয়েলি বিউটিফুল!’

২০ মিলিয়ন বাজেটের মুভিটি আয় করে ২২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সিনেমাটি অস্কারে তিনটি পুরস্কারসহ মোট সাতটি নমিনেশন পায়। এর পরিচালক রবার্তো বেনিনী ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় পরিচালক যিনি নিজের সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অস্কার পান।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।