বাক্সে বাক্সে বন্দী বাসা

আগে অফিসে যার কাছে যত চাবি থাকতো সে তত পাওয়ারফুল ছিলো। অমুক ড্রয়ারের চাবি, তমুক আলমারির চাবি ইত্যাদি। এসব গায়েব হয়ে গেছে বলা যায়। কাগজের ফাইলপত্তরও খুব কমই ব্যবহৃত হয়। এখন হলো পাসওয়ার্ড, এক্সেস এইসব। অমুক সফটওয়্যার, তমুক ডাটাবেজ, এই প্যানেল সেই- প্যানেল ইত্যাদি। দুই বছর আগেও কাগজপত্র রাখার জন্যে দুইটা বড় ফোল্ডার ছিলো আমার ডেস্কে।

বহুদিন পর্যন্ত সেখানে নানা জিনিসপত্র রেখে দিয়েছি অযথাই। একটা কিছু না থাকলে ডেস্ক কেমন দেখায়! এখন ডেস্কে গেজেট ছাড়া কিছু নাই। কিছু তার-টার তাও লাগে, কদিন পর দেখা যাবে সেগুলোও নাই। কোন মোবাইল যেন দেখলাম তাদের অফিসকে পেপারলেস ঘোষণা করেছে। কাগজের আর কোনো দরকার তাদের নাই। কদিন পর ওয়ারলেস অফিসও দেখা যাবে শিওর!

এই যে সবকিছু গায়েব হয়ে যাচ্ছে, কাগজ, কলম, তালা, চাবি,তার, সবকিছু ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে, এর শেষ কোথায়? এখন কিছু কিনতে বাজারে যেতে হয় না, অনলাইনে পেয়ে যাবেন সব। পকেট থেকে কষ্ট করে টাকাও বের করতে হয় না, টাকার লেনদেনও ভার্চুয়াল। অতি ক্ষমতাধর বিভিন্ন চৌকো বাক্সে সব বন্দি হয়ে যাচ্ছে।

সবকিছুই ডিজিটালাইজড হচ্ছে, এটা ভালো। শ্রম এবং সময় কমছে। কিন্তু মানুষের মূল্যও কি কমছে না? আগে যে কাজ করতে চারজন লাগতো, তা এখন একজনে করে। সামনে মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দিবে, বেকারত্বের হার বাড়বে।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কি যন্ত্রই পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ করবে একসময়? এ নিয়ে নানারকম জল্পনা-কল্পনা আছে, সায়েন্স ফিকশন লেখক, সিনেমা পরিচালকদের তো এটা খুবই পছন্দের বিষয়! তবে আমার কাছে মনে হয়, এটা একটা সংকট তৈরি করলেও শেষপর্যন্ত মানুষই জয়ী হবে। কারণ, মানুষের জন্যে যন্ত্র, যন্ত্রের জন্যে মানুষ না।

সামনে অনেক ধরণের কাজে মানুষ লাগবে না; যেগুলো গঁৎবাধা কাজ, যেগুলোতে ক্রিয়েটিভিটি নেই, ক্রিটিকাল থিংকিং নেই। কিন্তু একজন কপিরাইটারের কাজ কে করবে? কিংবা মার্কেটিং বিশেষজ্ঞের কাজ? আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলেজিন্সের দৌড় কতটুকু? হ্যাঁ, খুব স্মার্ট এবং এফিসিয়েন্ট চিন্তা করতে পারবে যন্ত্র, কিন্তু আনস্মার্ট, অযৌক্তিক চিন্তা করতে পারবে কি?

যন্ত্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর লজিকাল এ্যালগরিদম। পৃথিবীতে অনেক অনেক শুভ কাজ হয়েছে অযৌক্তিক চিন্তা, পাগলামী আর আবেগ থেকে। যন্ত্রের পক্ষে সেটা কোনদিনই অর্জন করা সম্ভব না। তারপরেও অবশ্য তার আগ্রাসন চলবে। এতে অনেক মানুষ কাজহারা হবে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু মানুষের মধ্যে একটা আদিম প্রবৃত্তি আছে টিকে থাকার, তাই মানুষই টিকে যাবে।

যন্ত্রের ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই, পরিবার টানার চাপ নেই, সন্তানের প্রতি দায়বদ্ধতা নেই, সবচেয়ে বড় কথা, তাদের মৃত্যুভয় নেই, জীবন জন্ম দেয়ার ক্ষমতা নাই। তারা কিসের প্রেরণায় এগিয়ে যাবে? যন্ত্রের কাছে মানুষই ঈশ্বর। হ্যাঁ, আলাদাভাবে তারা অদক্ষ এবং দুর্বল মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবান হতে পারে, তবে সমগ্র মানবজাতিকে একটা আলাদা অস্তিত্ব হিসেবে ধরলে তারা অতি ক্ষুদ্র।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের কপোট্রনিক সুখ দুঃখ বইয়ে একটা অসাধারণ গল্প ছিলো। একটি শহরে বা রাষ্ট্রে রোবটরা একসময় সব ক্ষমতার অধিকারী হয়। তারা মানুষের কাছ থেকে কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। সবকিছু খুব ভালোভাবে চলতে থাকে। তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছিলো অসাধারণ পর্যায়ের, মানুষের মতই। ধাঁই ধাঁই করে সবকিছুর উন্নতি হতে থাকে। কিন্তু বছর খানেকের মধ্যেই সব মুখ থুবড়ে পড়ে। কারণ হিসেবে জাফর ইকবাল দেখিয়েছেন, তাদের মধ্যে ক্ষুধার অনুভূতি নেই।

তারা কাজ করবে, উন্নতি করবে, কিন্তু কাজ না করলে কী হবে? কিছুই হবে না! দিব্যি বেঁচে থাকবে! না খেয়ে থাকার ভয় তো আর নেই! তাহলে কী হবে কাজ করে? এখানেই পার্থক্য, এখানেই মিল! পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটি থেকে শুরু করে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি, সবাইকেই খাদ্যগ্রহণ করতে হয়, ঘুমোতে হয়। সবচেয়ে সফল মানুষটিও নিশ্চিন্ত নয়। পেটের ক্ষুধা মিটে গেলে জৌলুসের ক্ষুধা, বিলাসের ক্ষুধা, ওপরে ওঠার ক্ষুধা, ক্ষুধার তো শেষ নেই!

‘গলিত স্থবির ব্যাঙ আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে আরেকটি প্রভাতের ইশারায়’

এক্ষেত্রে আমরাও এই গলিত স্থবির ব্যাঙয়ের চেয়ে আলাদা কিছু না। একটা মুহূর্ত বেশি বাঁচার জন্যে মানুষ কি না করতে পারে! এখন আমি বুঝতে পারি এইসব জরা, শোক, ব্যাধি, মৃত্যু, মানুষের জন্যে কতবড় চালিকাশক্তি! যন্ত্রমানবকে এই ক্রাইসিস কে দেব?

আদিম গুহামানব থেকে শুরু করে আধুনিক ভার্চুয়াল সেলিব্রেটি, মানুষ কিন্তু খুব বেশি বদলায় নি আসলে! বেসিক ইনস্টিংক্ট কখনও বদলায় নি, বদলাবেও না। আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত মানবজাতি একের পর এক ক্রাইসিস মোকাবেলা করে এসেছে, নতুন ক্রাইসিস তৈরি করেছে, যন্ত্রসভ্যতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এসব এই যাপনেরই একটা অংশ, এর থেকে বেশি কিছু না!

শেষ পর্যন্ত পৃথিবীটা জীবন্ত যা কিছু তাদেরই শুধু। আপনার, আমার, একটা প্রজাপতির, একটা ডালিম গাছের, সোনালি মাছের; যন্ত্রের না।

লেখকের ব্যক্তিগত ব্লগ

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।