লাইফ ইন আ মেট্রো: জীবনের অংক বোঝা বড্ড কঠিন

সুখ কি টাকায় মেলে?

সুখ কি শরীরের ভাঁজে ভাঁজে?

প্রমোশনে কতটা আত্নতৃপ্তি আছে যখন তাতে শ্রমের চেয়ে বেশি অন্যকিছু মিশে থাকে?

যত যাই হোক, বিয়ে একটা বন্ধন। ভালোবাসা না হোক, অন্তত বিশ্বাসের।

দিনশেষে আমরা সবাই একা। নই কি?

প্রশ্ন অনেক। প্রতিটি প্রশ্নের আলাদা উত্তর। জীবন মানে একটা ভ্রমণ, উত্তর খোঁজার। ভ্রমণ পথে কেউ কেউ মনের মতো উত্তর খুঁজে পায়, কেউ কেউ খুঁজতে থাকে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবন ছুটে আপনতালে। সুযোগ আসে। বৈধ, অবৈধ। আদান প্রদানের এই দুনিয়ায় নিঃস্বার্থভাবে সুযোগ কেউই দেয় না। মূল্য দিতে হয়। কারো নৈতিকতার, কারো শরীর বিলিয়ে, কারো প্রেম বিসর্জন দিয়ে।

প্রেম আর ভালবাসায় তফাতের রাস্তাটা বিশাল। সেই রাস্তায় খেই হারানো পথিকের যেমন অভাব নেই, শেষবেলায় নিজেকে সামলে নিয়ে প্রত্যাবর্তনের নজিরও আছে। জীবন মানে সিনেমাও। ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’, ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডি এই সিনেমা জীবনেরই গল্প বলে গেছে। উপরের কথাগুলির মিল পাবেন সিনেমার প্রতি সেকেন্ডে।

আট বছরের বৈবাহিক জীবনে স্বামী, একমাত্র কন্যা, আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়ির ভোগবিলাসেও শিখার (শিল্পা শেঠি) দম বন্ধ হয়ে আসে। কর্পোরেট ব্যবসায়ী স্বামী রঞ্জিতের (কে কে মেনন) যে এতটুকু সময় হয় না স্ত্রীকে দেবার মতো। নাচের চমৎকার ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে স্বামী সন্তানকে নিয়ে বাঁচতে চাওয়া শিখার কাছে এখন সবই তেতো।

বাস ধরতে গিয়ে একদিন পরিচয় আকাশের সঙ্গে। কে জানতো, আকাশও একই নৌকার মাঝি। স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ির পর বেঁচে আছেন থিয়েটার নিয়ে। শিল্প বোঝেন দুজনই, দুজন দুজনকে বুঝতে তাই সময় লাগেনি। বাসের চার চাকার ঘূর্ণণে বন্ধুত্বও ঘুরতে থাকে, একসময় রূপ নেয় অন্যকিছুতে। রঞ্জিতের সব আছে। তার কাছে সুখের অপর নাম নিজস্বতা। সুখ মানে টাকা।

টাকা থাকলে শরীরের ক্ষুধাও মেটে। টিএনএজ বয়সে প্রেমিকের কাছে প্রতারিত নেহা (কঙ্গনা) এখন আর তার শরীর নিয়ে ভাবে না। উপরে উঠতে তাই অস্ত্র হিসেবেই দেখে কোমল আবেদনময়তাকে। রাহুলও (শারমান যোশী) যেমন স্বপ্ন দেখে মুম্বাই শহরে ধনকুবের হতে। নিজের ফ্ল্যাটকে অভিজাত যৌনশালা বানাতে সে দুইবার ভাবে না। বস, কলিগ হয়ে আরো অনেকেই, যারা তার উপরে উঠার সিঁড়ি ফ্ল্যাটটা তাদের আদিম আনন্দলোক হয়ে উঠে। প্রতিবেশি, সমাজ কে কি বলল রাহুলের তাতে থোড়াই কেয়ার। না চেয়েও কেয়ার না করে পারে না, যখন জানতে পারে নেহা আর বস রঞ্জিতের সম্পর্কের কথা। দোটানায় পতিত হয় রাহুল। ক্যারিয়ার না প্রেম? তার উদ্যোক্তা হবার স্বপ্নের গাড়ির চালক হবার দায়িত্বটা বসের হাতেই, তা এড়িয়ে যাবার সাধ্য রাহুলের নেই।

বিয়ে একটা বন্ধন। তারও আগে সামাজিকতা। মন্টি (ইরফান) একে একে আটাশজন মেয়ে দেখে ফেলে। গাঁটছড়া বাঁধা হয় না। শ্রুতির (কঙ্কনা সেন) আবার এসবে ঢের আপত্তি। মন্টির সঙ্গে দেখা হলে মন্টির তাকে ভালো লাগে, কিন্তু শ্রুতি এড়িয়ে চলে। প্রথম দেখাতেই যিনি বুকের ভাঁজে চোখ ফেলেন তাকে জীবনসঙ্গী করা অসম্ভব। মন্টির সহজ সাবলীলতাও ধোপে টেকে না। সব ভুলে রেডিও স্টেশনে কাজ করা আরেক কলিগের প্রেমে পড়ার পর তার অবৈধ সমকামীতাকে মেনে নিতে না পেরে ফের পুরনো ডিপ্রেশনে ডুব দেয় শ্রুতি। অন্য জব খোঁজে।

ভাগ্যের ফেরে মন্টিকে পায় কলিগ হিসেবে। ভাগ্য বদলের আশাতেই চল্লিশ বছর আগে প্রিয়তমাকে ফেলে আমেরিকায় পাড়ি জমায় আমোল (ধর্মেন্দ্র)। পরের চল্লিশটা বছর কেটেছে দুঃসহ। সবই পেয়েছেন, তবে শিভানিকে (নাফিসা আলি) ফেলে আসার কষ্টটা ছিল প্রবল। প্রেম মানে না বাঁধা। মানে না বয়স। একদিন চিঠি আসে শিভানির ঠিকানায়। শুধু একটিবার চোখে চোখ রাখতে চায় আমোল। অভিমান গলে বরফ হয়। সম্পর্কের শুকনো পাতারা নিমিষেই প্রাণ ফিরে পায়। জীবন সায়াহ্নে এসে দুটি প্রাণ আবার এক হতে চায়, হারাতে চায় দুরন্ত কৈশোরে। বয়স যেখানে নিছক সংখ্যা মাত্র।

এভাবেই গড়ায় গল্প। প্রেমের, যৌনতার, পুরনোকে নতুন করে পাবার, অবিশ্বাসের, দ্রোহের। আকাশ পেতে চায় শিখাকে। ভালবাসা দিয়ে ভুলিয়ে দিতে চায় অপূর্ণতা। নেহা আরেকবার প্রতারিত হয়। দুইবার ঘুরে দাঁড়ানো মেয়েটি হাল ছাড়ে তৃতীয়বারে, বেছে নেয়ে আত্নহননের পথ। প্রকৃতি সাহসীদের পক্ষে থাকে। নেহা এবং শ্রুতি দুজন রুমমেট, দুজনই চমৎকারভাবে বাঁধা ঠেলে এগিয়ে যেতে জানে। শিখাও ভুল করতে করতে নিজেকে সামলায়। ফিরে আসে দুঃখ নীড়ে, আপনালয়ে।

রাহুল পাবে নেহাকে? নেহা আরো একবার সুযোগ দেবে কাউকে? আকাশের মেসেজটা ফের একবার সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে শিখাকে। ‘আমি চলে যাচ্ছি। এসো। হয় বিদায় জানাতে, না হয় হাত ধরে একই ট্রেনে চড়তে’! রঞ্জিত না আকাশ? শিখা যাবে স্টেশনে? আমোল শিভানির সম্পর্কটাই বোধহয় ভালবাসা। যা পুরনো হয় না কখনো। শেষবেলায় প্রিয়ার বাহুডোরে কাটানোর ইচ্ছের স্থায়িত্ব কয়দিন? মন্টি শ্রুতি ভালো বন্ধত্ব গড়েছে। তারপর?

লাইফ ইন অ্যা মেট্রো, পরিচালক অনুরাগ বসুর দুর্দান্ত একটি কাজ। এই সিনেমার আগে তার তিনটি কাজ ছিল সায়া, মার্ডার, গ্যাংস্টারের মতো মুভিগুলো। ওগুলো ছিল ট্র্যাজিক রোমান্টিক ধারার ফিল্ম। চতুর্থ মুভিতেও জনরা ঠিক রেখে যোগ করেন স্ট্রিট মিউজিক। প্রিতমের সঙ্গীত পরিচালনায় এটিই ভারতের প্রথম স্ট্রিট মিউজিক জনরার মুভি। অনবদ্য চিত্রায়নে জীবন্ত উপন্যাসে রূপ নেয়া চলচ্চিত্রটির প্রতিটি দৃশ্য যেন কথা বলে। রাতের শহর, যখন সবাই নিজেকে নিয়ে ভাবনায় মত্ত।

রাতের দৃশ্যগুলিকে অনুরাগ বসু দারুণ মুন্সিয়ানায় তুলে ধরেছেন। ফিল্মফেয়ারে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালকের পুরস্কারসমেত এটি বাগিয়ে নেয় অসংখ্য সম্মাননা। কঙ্গনা, ইরফান, শিল্পারা কয়েক ক্যাটাগরিতে বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টরের পুরস্কার জিতেন। ইরফানের হিউমারাস সংলাপে বহু বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। বেস্ট কমিক রোলের অ্যাওয়ার্ড সেই বছর যোগ্য হাতেই উঠেছে বলা চলে।

সিনেমার প্রতিটি গান দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছে। আলভিদা, ইন দিনো, বাতে কুচ অ্যায়সে হ্যায়, কার সালাম গালগুলি মানুষের মুখে মুখে এখনো ফেরে। ‘ইন দিনো’ ছিল ২০০৭ এর সং অব দ্য ইয়ার। এই গানের জন্য জি সিনে অ্যাওয়ার্ডে সেরা গীতিকারের পুরস্কার বাগান সায়েদ কাদরি। প্রিতম, সায়েদ কাদরি, সুহেল কৌল এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনবদ্য পারফর্ম করেন আমাদের জেমস। তার কন্ঠে গাওয়া ‘আলভিদা’ আজো অনন্য হয়ে আছে।

অভিনয় নিয়ে বলতে গেলে কেউ কারো চেয়ে এক চুলও কম নয়। কে কে মেনন, শাইনি আহুজারা সেই সময়ে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। শিল্পা শেঠি, কঙ্গনার হয়ে কথা বলবে তাদের পুরস্কার৷ কঙ্কনা সেন শর্মা, শর্মান যোশী, নাফিজা আলি যার যার জায়গায় সেরাটা দিয়েছেন। ইরফান খান যতক্ষণ অনস্ক্রিন ছিলেন ততক্ষণ হাসিয়েছেন। ধর্মেন্দ্রকে নিয়ে বলার কিছু নেই। যেভাবে চরিত্রে আবেগ ফুটিয়ে তুলেছেন, তার বয়সের অনেককে তো বটেই, প্রেয়সীকে ছেড়ে আসা প্রত্যেকেই ফিরিয়ে নিয়েছেন অতীতে। বলেছিলাম, দুজন দুজনকে ছাড়া এক মূহুর্তও থাকব না। অথচ গোটা জীবনটাই পার করে এসেছি!’

দুর্দান্ত এই সংলাপ বাস্তবতার চিত্র এঁকে গেছে।

সিনেমার একদম শেষটা আপনাকে হাসাবে। আপনাকে কাঁদাবে। বাস্তবতা শেখাবে। ভালবাসার এক নতুন অধ্যায় নিয়ে ভাবাবে। জীবন সবসময় সরলরেখায় চলে না। সুউচ্চ দালানের ছাদে উঠে বুনো চিৎকারে দুঃখকে উড়িয়ে দেওয়া কিংবা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুই বৃদ্ধের গোটা জীবনে একে অপরকে না পাওয়ার কষ্টে জমানো অশ্রুজল আড়াল করে হাসার দৃশ্য, স্টেশনে বিদায় বলে ফিরে আসা, আবার সেই স্টেশনেই কারো কারো অবশেষে সুখ সন্ধান মেলা! জীবনের অঙ্ক বোঝা বড্ড কঠিন।

‘লাইফ ইন আ মেট্রো’ দুইটি সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত। একটি হলো-১৯৯৬ সালের ফরাসি চলচ্চিত্র ‘দ্য অ্যাপার্টমেন্ট’, অপরটি- ১৯৪৫ সালের ব্রিটিশ মুভি ‘ব্রিফ এনকাউন্টার’। ভারতের প্রথম মিউজিক ড্রামা জনরার এই মুভির বাজেট ছিল ০৯ কোটি, আয় ২৪ কোটি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।