প্রিয় সুনীল…

অনন্ত অন্ধকারের বুকে কেমন আছ তুমি? তোমার ভালো থাকার প্রার্থনা আমি আমার স্রষ্টার কাছে রোজই করি। জানি, ইহলোক-পরোলকের তত্ত্বে তোমার বিশ্বাস নেই, বিশ্বাস নেই স্রষ্টার অস্তিত্বেও। তাও আমি তোমাকে ভেবে প্রার্থনা করে যাই। এটা এজন্যও হতে পারে, যে সত্য তুমি দেখেছ, তা আমি দেখিনি বলে। আবার তোমার দেখাটা মিথ্যেও হতে পারে – আমার এই ভাবনা থেকে।

সে যা-ই হোক, জানো তো – গত দুইটা মাস আমি তোমাতে মজে আছি। এই দু’মাসে তোমার লেখা প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠা পড়েছি। কী অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ, সত্যিই পড়েছি। আমার এই দুইটা মাস অদ্ভুত এক ঘোরে কেটেছে। পড়তে পড়তে ক্লান্ত হলে ইউটিউব ঘেঁটে তোমার সাক্ষাৎকার দেখেছি। সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে চোখ জ্বালা করলে আবার বই নিয়েই বসেছি।

মধ্যরাতে যখন এই পৃথিবী শান্ত হয়ে আসতো, তখন আমার বড্ড একা একা লাগতো। সেই একাকিত্ব ঘোচানোর জন্যেও আমি তোমার সৃষ্টির কাছেই হাত পাততাম। প্রাক্তন চলে গেছে, এই দুঃখ যখন জেঁকে বসতো, তখন ইউটিউব ঘেঁটে তোমার হেঁড়েগলায় আবৃত্তি করা ‘কেউ কথা রাখেনি’ শুনে সেই দুঃখ লাঘব করতাম।

ভরা তারুণ্য অতিক্রম করছি আমি। যখন পরিবার, সমাজ, দেশ, পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করতে করতে মানসিক দিক দিয়ে আমার সেই তারুণ্য ফিকে আসতে চায়, তখনই হুমায়ূন ফরিদীর কণ্ঠে আবৃত্তি করা তোমার ‘উত্তরাধিকার’ শুনে সেই তারুণ্যকে পুনরুজ্জীবিত করি।

জানো, কবিতার ভক্ত আমি কোনো কালেই ছিলাম না। এক তোমার কবিতা শুনে শুনেই আমি শিমুল মুস্তাফা, মেধা বন্দোপাধ্যায় আর মুনমুন মুখার্জিদের চিনেছি। এখন তো আবৃত্তি শুনলেই অদ্ভুত এক ঘোরের জগতে পতিত হই। এই যে আমার মনোজগতে এত এত পরিবর্তন ঘটল, এসব তুমিই করেছ।

মাস দুয়েক আগেও যখন কেউ আমায় জিজ্ঞেস করতো, তোমার প্রিয় লেখক কে? তখন কারও নাম বলতাম না। বলতাম, যারা কবিতা লেখে, গল্প লেখে, উপন্যাস লেখে – তারা সবাই-ই আমার প্রিয়। এটা বলতাম এজন্য, যখন আমি নির্দিষ্ট করে কেউ একজনকে নিজের প্রিয় লেখক বলে ঘোষণা করি, তখন অন্য লেখকদের অবজ্ঞা করা হয়, তাদের সৃষ্টিকে তাচ্ছিল্য করা হয়-এই বোধ থেকে।

দিন কয়েক আগে এক সাহিত্যবোদ্ধা মেয়ের সাথে আমার ভাব হয়েছে ভীষণ। সেই মেয়ে যখন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার প্রিয় লেখক কে?’ তখনও আমি কারও নাম বলতে পারি নি। কল্পনায় শুধু ধূসরবর্ণা চুলের, স্থুল দেহাবয়বের, হেঁড়েগলার একটা মানুষ দেখতে পেলাম। সে মানুষটা তুমি। হ্যাঁ নীললোহিত, সেই মানুষটা তুমিই।

গুরুবাদে তোমার ভক্তি নেই, এ কথাও আমি জানি। সেদিন কোন এক সাক্ষাৎকারে শুনলাম, এখনকার মতো তোমাদের সময়ও নাকি একদল লোক রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব বলে পূজা করতো। তুমি নাকি এ ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ খাপ্পা ছিলে। তাই নিজের লেখায় রবীন্দ্রনাথকে ছিড়েখুঁড়ে খেতে। সেই তুমিই আবার ‘প্রথম আলো’য় রবীন্দ্রনাথকে কী সুন্দর এঁকেছ! কী করে করেছ এটা?

গুরুবাদে তোমার ভক্তি নেই বলে বেঁচে গেছ। নয়তো, আমার দুষ্টু সত্ত্বাটা এতদিনে নিশ্চয়ই তোমার পূজা করতো।

পুনর্জন্ম নিয়ে তোমাদের শাস্ত্রে কত কথাই তো লেখা আছে! অবশ্য যে মানুষটা ধর্মেই বিশ্বাস করে না, এসব কথায় সেই মানুষটার যে বিন্দুমাত্র আস্থা নেই, তা আমি জানি। আমাদের ধর্মেও পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই। কিন্তু কি জানো তো-এই পৃথিবীতে আমরা যে একটা জীবন পাই, তা আমার যথেষ্ট মনে হয় না। অন্তরের গহীনে কোথাও একটা পুনর্জন্ম পাওয়ার বাসনাটা আমার আকুলিবিকুলি করে সবসময়।

আমি নিয়তিবাদী মানুষ। দৈবে আমার অগাধ ভক্তি। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, ঈশ্বর চাইলে যা খুশি করতে পারেন। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় যদি কখনও আমি পুনর্জন্ম পাই, সে জনমে তোমার লেখার টেবিলের নীচে বসে থাকা কালো কুকুরটি হতেও আমার বিশেষ আপত্তি নেই!

কত কথা লিখলাম। আমার এই লেখার অধিকাংশ আমাদের এই রক্ষণশীল সমাজের মানুষ নিতে পারবে না। তারা আমাকে আক্রমণ করবে এটা জেনেই আমি তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার কথা লিখেছি। কারণ এই লেখা শুরু করার আগ থেকেই একটা কথা আমার মগজে বাজছে, ‘ভালোবাসা তা নয় যা আমি আমার প্রিয় মানুষটিকে বলি। ভালোবাসা তা, যা আমি তার জন্য করি।’

প্রিয় সুনীল, আমার সুনীল – তুমি ভালো থেকো!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।