রহস্য-রোমাঞ্চ এবং একজন আবীর

সাল ২০১০। স্বনামখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও নির্মাতা অঞ্জন দত্ত বাংলা চলচ্চিত্রে আবার নিয়ে আসলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীকে।

ষাটের দশকে ব্যোমকেশ চরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। শ্বেতসুভ্র পাঞ্জাবী, ধুতি আর ঠোঁটে সিগারেট মিলিয়ে নিখাঁদ বাঙালি বাবু ব্যোমকেশ, যিনি নিজেকে সত্যান্বেষী বলে দাবি করেন।

এমন চরিত্রে কোনো দক্ষ অভিনেতা অভিনয় করবেন এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু অঞ্জন দত্ত বেছে নিলেন বলতে গেলে এক নবীন চলচ্চিত্র অভিনেতাকেই। যদিও বেশকিছু সিরিয়ালের সুবাদে তিনি পরিচিত মুখ, তবুও অনেকেই সংশয়ে ছিলেন। সব সংশয় কাটিয়ে সেলুলয়েডের পর্দায় ব্যোমকেশ রুপে হাজির হলেন তিনি।

মুক্তির পর বাণিজ্যিক সফলতা থেকে সমালোচকের প্রশংসা সবই পেলো ছবিটি, সঙ্গে ব্যোমকেশ চরিত্রে বাঙালি দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন এই সময়ের ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা আবীর চট্টোপাধ্যায়। আর এখন রহস্য রোমাঞ্চ সিনেমায় নিজের আলাদা একজন জায়গা করে নিয়েছেন আবীর।

বাবা নাট্যব্যক্তিত্ব ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়, মা অভিনেত্রী রুমকি চট্টোপাধ্যায়। সেই সুবাদেই টিভি সিরিয়ালে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। রাজ চক্রবর্তীর সিরিয়াল ‘প্রলয় আসছে’ দিয়ে পরিচিতি ঘটে এরপর ‘একে একে সময়’, ‘খুঁজে বেড়াই কাছের মানুষ’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘অতিথি’-সহ বেশকিছু সিরিয়াল ও টেলিছবিতে কাজ করেন। জি বাংলায় প্রচারিত সিরিয়াল ‘শ্বাশুড়ী জিন্দাবাদ’-এর জনপ্রিয়তায় আরো আলোচিত হতে থাকেন।

অভিজিৎ-সুদেঞ্চার জনপ্রিয় সিনেমা ‘ক্রস কানেকশন’-এ পার্শ্ব চরিত্র দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক। এর পরেই অঞ্জন দত্তের ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ দিয়ে করলেন বাজিমাৎ। অঞ্জন দত্তের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন ‘আবার ব্যোমকেশ’, ‘ব্যোমকেশ ফিরে এলো’ সিনেমায়।

ব্যোমকেশ করে যখন ক্যারিয়ারের বৃহস্পতি তুঙ্গে তখনই সন্দীপ রায়ের থেকে অফার পেলেন বাংলার আরেক আইকনিক চরিত্র ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করার জন্য, তিনিও লুফে নিলেন। মুক্তি পেলো ‘বাদশাহী আংটি’, জনপ্রিয় হলো বেশ।

তবে মনোক্ষুন্ন হলেন অঞ্জন দত্ত। সন্দীপ রায়ের সাথে চুক্তি নিয়েও একটা ঝামেলা হল আবিরের। ফেলুদা চরিত্র আর না পেলেও অরিন্দম শীলের সঙ্গে ব্যোমকেশ করে যাচ্ছেন। একে একে মুক্তি পেলো ‘হর হর ব্যোমকেশ’, ‘ব্যোমকেশ পর্ব’ ও ‘ব্যোমকেশ গোত্র’।বলাই বাহুল্য, সবকটিই বাণিজ্যিক সফল। অনেকের মতে তিনিই সেরা ব্যোমকেশ। তবে ভিন্নআঙ্গিকে নির্মিত ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ হতাশ করেছে। চলতি বছর সোনাদা হয়ে এসেছেন ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ সিনেমাতে, এটাও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘জাতিস্মর’, ‘রাজকাহিনী’-তে ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করলেও মুক্তি প্রতিক্ষীত চৌরঙ্গী অবলম্বনে নির্মিত শাহেন-শাহ তে আছেন প্রধান ভূমিকায়। কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘বাস্তুশাপ’, ‘বিসর্জন’, ‘ছায়া ও ছবি’ করেছেন। সামনেই মুক্তি পাবে ‘বিজয়া’।

রাজ চক্রবর্তীর ‘কানামাছি’-তে খল চরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। ‘দ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ থেকে পুরোদুস্তর বাণিজ্যিক সিনেমা ‘বোঝে না সে বোঝে না’-তেও নিজের প্রতিভা দেখিয়েছেন। সুজয় ঘোষের হিন্দি সিনেমা ‘কাহানি’-তে অতিথিশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছেন।

বাংলাদেশের জয়া আহসানের প্রথম ভারতীয় বাংলা সিনেমা ‘আবর্ত’র নায়ক তিনি। ঋত্বিক ঘটকের জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘অ্যাবি সেন’, ‘যেখানে ভূতের ভয়’, ‘বেডরুম’, ‘চার’, ‘কাঠমুন্ডু’, ‘প্রেম বাই চান্স’, ‘সব ভূতুড়ে’, ‘যদি লাভ দিলে না প্রাণে’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘এবার শবর’, ‘ঠাম্মার বয়ফ্রেন্ড’, ‘যমের রাজা দিলো বর’, ‘হৃদ মাঝারে’-সহ আরো বেশ সংখ্যক সিনেমায় অভিনয় করেছেন।

ব্যক্তিজীবনে ২০০৭ সালে বিয়ে করেছেন নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়কে। এমবিএ করার সময় দু’জনের পরিচয়। এরপর থেকেই আছেন এক সাথে। একমাত্র মেয়ে ময়ূরাক্ষী চট্টোপাধ্যায়।

অমিতাভ বচ্চনের বিশাল ফ্যান আবীর। বিগ ‘বি’কেই অনুপ্রেরণা মানেন তিনি। একবার একটা সিনেমার শুটিংয়ে কিছু হিন্দি ডায়লোগ বলতে হত। শুরুতে শুটিং করতে আবির নাকি ডায়লোগগুলো অবিকল অমিতাভের মত করে বলেছিলেন!

আবীরের ডান গালে একটা কাটা দাগ আছে। যখন ক্লাস সেভেনে পড়েন তখন বাইসাইকেল চালাতে গিয়ে পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে যান। না, পড়ে গিয়ে গাল কাটেননি। পড়ে যাওয়ার পর রাস্তায় দিয়ে যাওয়া একটা বিড়াল তাঁর গালে আঁচড় দিয়ে যায়। দাগটা তখন থেকেই স্থায়ী ভাবে গালে বসে যায়। আবীরের অভিনয়ের মত এই দাগটাও এখন তাঁর ট্রেডমার্ক বটে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।