রঙিন হোক বিদায়কাব্য

সিনেমার হিরোদের মত লম্বা সুদর্শন এক ব্যাটসম্যান! ২০১০ সালে বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশকে একেবারে নাচিয়ে ছাড়লেন। সেটাই আমার প্রথম অ্যালিস্টেয়ার কুক দর্শন।

তখন খেলা এতটা বুঝতাম না। খেলোয়াড়টা দেখতে শুনতে, চালচলনে হিরোদের মত, ব্যাটিংও করে হিরোদের মত – তাই এরপর থেকে ইংল্যান্ডের খেলা হলেই বসে পড়তাম যার অন্যতম আকর্ষণ থাকতো অ্যালিস্টার কুকের ব্যাটিং দেখার!

এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম লোকটা আসলে মারদাঙ্গা সিনেমার হিরো নন, বরং অমিত প্রতিভাধর শান্ত এক কবি। তার আধুনিক ক্রিকেটের খড়স্রোতের সাথে চলার কোন আকর্ষণ নেই, তিনি বসে থাকেন শ্বেতশুভ্র প্রান্তরে। আইপিএল, পয়সার ঝকমারি ফেলে রেখে সবুজ মাঠে লাল চেরীর উপর ব্যাটের আলতো পরশ বুলিয়ে দেওয়া ক্রিকেট খেলতেই যার আগ্রহ।

কুকের ব্যাটিং – টিনএইজ বয়সে ক্রিকেট বোধের জন্ম হবার সূচনালগ্নে আমার অনেক বড় একটা সহায়তা ছিল। মন্ত্রমুগ্ধের মত কুকের ব্যাটিং দেখতাম। দেখে বুঝতাম টেস্ট ব্যাটিং কাকে বলে, টেম্পারমেন্ট কাকে বলে। বুঝতাম বল শুধু ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা মারার জিনিস না, বরং জ্যামিতিক পারফেকশনের সাথে সোজা ব্যাটে কভার ড্রাইভ বা স্কয়ার কাট করে দু’জন ফিল্ডারের মাঝখান দিয়ে লাল বলটাকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দেওয়া কতো মনোহর দৃশ্য হতে পারে!

আর ফর্ম! সেরা সময়ে কুকের মত ভয়ঙ্কর ফর্ম সম্ভবত কুকের পর আর কোন ব্যাটসম্যান দেখাইতে পারেনাই! এখনকার বিগ ফোরও না! ইংল্যান্ডের খেলা মানেই তখন কুক। আর কুক মানেই তখন সেঞ্চুরি! অবলীলায় তিনি বিশাল বিশাল সব সেঞ্চুরি করে ফেলতেন। অ্যাশেজ, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না!

নিজের দেশে তো বটেই এমনকি আবুধাবির গরম বা ইংলিশ ক্রিকেটারদের চির বধ্যভুমি ভারতের মাইনফিল্ডেও তিনি বোলার দর্শক সবাইকে বিরক্ত করে হতাশ করে কাঁদিয়ে ছেড়েছেন! কুক ততক্ষনই ব্যাট করবেন যতক্ষন কুক চাইবেন। কুক তত রানই করবেন যত রান কুক চাইবেন! কেউ পারলে ঠ্যাকাক!

কতো যে চোখ ধাঁধানো ঐতিহাসিক আর মনে রাখার মত সব সেঞ্চুরি! এখনও মনে আছে, ১৩ ঘন্টা ব্যাট করে ইশান্ত শর্মার বলে আউট হলেন ২৯৪ রানে! পেলেন না ট্রিপল সেঞ্চুরি! সারাজীবনের একটা আক্ষেপ থাকবে কুকের যেমন, তার একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে আমারও তেমন!

মাঝেমধ্যে মনে হয় শখের বশে ওয়ানডে খেলে ফেলতেন। কিন্তু সেসময় এতো সাবলাইম টাচে ছিলেন। দুবাইয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে করে ফেললেন টানা দুই ওয়ানডে সেঞ্চুরি ও একটি ৮০! ওই সিরিজে কুকের ব্যাটিং ইতিহাস হয়ে থাকবে অনেকদিন!

কিন্তু গত দুই আড়াই বছর বেশ অ-ধারাবাহিক ছিলেন! এই বছরও ব্যর্থতার শিকে ছিড়ছে না! ভারতের বিপক্ষে সিরিজে দৃষ্টিকটু এবং একেবারেই অচেনা সব ভঙ্গিতে আউট হওয়া… ভক্ত হিসেবে চোখকে অনেক পোড়াচ্ছে।

শচীন টেন্ডুলকারের ৫১ সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙা- যা একসময় কুক ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব হবে না বলে মনে হয়েছিল তাও ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল। নিজেও হয়ত বুঝতে পারছিলেন যে দলের উপর বোঝা হয়ে যাচ্ছেন। তাই তো চলতি সিরিজের চতুর্থ টেস্ট শেষে ঘোষণা দিয়ে ফেললেন। সিরিজের শেষ টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন কুক!

অবশ্যই অনেক বেদনাদায়ক খবর আমার জন্য! একে তো অন্যতম প্রিয় একজন ব্যাটসম্যানের বিদায় হচ্ছে। তার উপর আসলে এখন বিদায় নেবার কি খুব দরকার ছিল? হ্যাঁ অফফর্ম যাচ্ছে, কিন্তু ফর্মে ফিরতে অ্যালিস্টেয়ার কুকের কয়দিন লাগে!

তাছাড়া অফ-ফর্মে থাকা কুকেরও কোনো রিপ্লেসমেন্ট ইংল্যান্ডে নেই। ব্যাটিং বাদ দিলেও কুকের চলে যাওয়া মানে একজন সিনিয়র, একজন গ্রেট ক্রিকেটার, একজন এক্স ক্যাপ্টেনের অন ফিল্ড অফ ফিল্ড মেধা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, এবং একজন দুর্দান্ত স্লিপ ফিল্ডারের নৈপুণ্য থেকে বঞ্চিত হবে ইংল্যান্ড! আমি হলফ করে বলতে পারি কুকের যাওয়াটা ইংল্যান্ডের টেস্ট পারফরমেন্সে প্রভাব ফেলবেই!

এক যুগের সোনায় মোড়ানো ক্যারিয়ারের বেদনাবিধুর সমাপ্তি,  কিন্তু তাও মিথ্যে হয়ে যাবে না অ্যালিস্টেয়ার কুকের গ্রেটনেস! মিথ্যে হবে না তার ১২ হাজার টেস্ট রান, ৩২ সেঞ্চুরি, ৫৬ ফিফটি! অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস! এটা কেউ বলতে পারবেন না যে অ্যালিস্টেয়ার কুক ক্রিকেটের একজন জীবন্ত কিংবদন্দি হিসেবে অবসর নিচ্ছেন না!

সম্ভবত গত এক দশকের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারাটিই বিদায় নেবার ঘোষণা দিয়ে দিলেন! বিদায় অ্যালিস্টেয়ার কুক। বিদায় শৈশবের শিরো। একটাই অনুরোধ শেষ টেস্টে আবারো, আরও একবার আমার কৈশোরকে ফিরিয়ে আনুন শেফ! সোনালী সময়ের আভায় রঙিন হোক বিদায়কাব্য!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।