আমায় পড়বে মনে, কাছে দূরে যেখানেই থাকো

যুগের পর যুগ পেরিয়ে যায়, কিছু গান থেকে যায় চিরসবুজ। এসব গানে যারা কন্ঠ দিয়ে বিমোহিত করে রেখেছিলেন, তাঁরা দর্শকদের মনে স্থান করে নেন সম্মানের উচ্চ শিখরে। চাইলেও কখনো তাঁদের কথা ভোলা যাবে না। আজ যার কথা বলবো, তিনি তেমনই একজন।

সময়টা ১৯৭৫ সাল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক। ফলে রেডিওতে তাঁর সব গান প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি দ্বৈত গান গুলি থেকেও তাঁর গাওয়া অংশ কেটে প্রচার করা হয়।

কোন স্টেজ পারফরম্যান্সও করতে দেয়া হয়না। বলতে গেলে তিনি একপ্রকার নিষিদ্ধ, অথচ গায়কদের মধ্যে তাঁরই তখন ছিল সর্বোচ্চ ব্যস্ততা। এই অবস্থা থেকে আর কি হয়, এক পর্যায়ে হারিয়ে যেতে হয় সেই শিল্পীকে। তবে, কিশোর কুমার ফিরে এসেছেন, ফিরে এসেছেন তাঁর বিপুল চাহিদার কারণে। দর্শকদের প্রতিবাদে চাপে পড়ে কর্তৃপক্ষ নিজেই যেঁচে পড়ে এই জটিলতা কাটিয়ে তোলে।

এরপরই তাঁর পরিচালনা ও প্রযোজনায় একটি ছবিতে অমিতাভ বচ্চনকে অভিনয় করার জন্য প্রস্তাব দেন। তিনি ঘোষনা দিয়ে দেন অমিতাভ প্রস্তান নাকোচ করে দিলে তাঁর কন্ঠের জন্য আর গান গাইবেন না। ‘মামতা কি ছাও’ নামের সেই সিনেমাটি আর করেননি অমিতাভ। রাজেশ খান্নাকে নিয়ে মুক্তি পায় সিনেমাটি। অমিতাভের সাথেও আর কাজ করেননি কিশোর কুমার।

ষাটের দশকের একেবারে শেষে সংগীত জগতে যার রাজকীয় আবির্ভাব ঘটেছিল, তাঁর সেই অবস্থান ধরে রাখেন আমৃত্যু। তিনি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তিনি জলেন কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞ কিশোর কুমার।

মেরে সাপনো কে রানী, রুপ তেরা মাস্তানা, জিন্দেগী কা সাফার থেকে পাল পাল হ্যায় দিল কে পাস, তেরে বিনা জিন্দেগী সে কোয়ি শিকওয়া, সাগর কিনারে – সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানে তিনি দর্শকদের বিমোহিত করেছিলেন।

হেমা মালিনী ও কিশোর কুমার

আসল নাম আভাস কুমার গাঙ্গুলি। বাঙালি পরিবারের ছেলে হলেও বেড়ে উঠা মধ্যপ্রদেশে। বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি পেশায় উকিল ছিলেন। আর মা গৌরী দেবী ছিলেন ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে। পঞ্চাশের দশকেই তিনি হিন্দি সিনেমায় কাজ করা শুরু করেন। তবে শুধু গায়ক হিসেবে নয়, অভিনেতা হিসেবেও। প্রথম দিকে আলোচিত হতে থাকলেও ষাটের দশকে এসে গান ও অভিনয়ে ব্যর্থ হতে থাকেন।

অভিনেতা হিসেবে উনার দুটি ছবি বেশ আলোচিত – ‘হাফ টিকেট’ ও পারোসান। এরপর এই দশকের একেবারে শেষে জনপ্রিয় সিনেমা ‘আরাধনা’য় সুমধুর গানের সুবাদে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে। একের পর এক জনপ্রিয় গান মানেই কিশোর কুমারের গান। অ্যালকোহলের প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিল না। তারপরও দিব্যি ‘কাটি পাতাঙ’ সিনেমায় তাঁর মদ্যপ গান ‘ইয়েহ জে মহব্বত হ্যায়’ গেয়ে ফেলেন। তবে, তিনি ছিলেন চা আর মিষ্টির পোকা।

‘অভিমান’ সিনেমার সবগুলি গান জনপ্রিয় হওয়ার পর অমিতাভ বচ্চনের তখনকার প্রায় সব ছবিতেই অমিতাভের কণ্ঠে তাঁর গান থাকতো। ‘অমর প্রেম’, ‘কাটি পাতাঙ’, ‘আঁধি’, ‘ডন’, ‘নামাক হালাল’, ‘মুকান্দার কি সিকান্দার’ সহ বহু জনপ্রিয় সিনেমার নেপথ্য গায়ক তিনি। রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন থেকে ঋষি কাপুর, সঞ্জয় দত্ত সবার ঠোঁটেই জনপ্রিয় গান আছে কিশোর কুমারের।

শচীন দেব বর্মন, লক্ষ্ণীকান্ত-পেয়ারলালসহ সব জনপ্রিয় সুরকারদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। তবে, আলাদা করে বলতে হয় রাহুল দেব বর্মনের কথা। দু’জন জুটি বেঁধে একের পর এক কালজয়ী গান সৃষ্টি করেছেন। সহশিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বেশি পেয়েছিলেন সঙ্গীতের আরেক কিংবদন্তি লতা মাঙ্গেশকরকে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি লতাজী খুব সম্মান করতেন, লতাজী থেকে তিনি সব সময় এক রুপি কম পারিশ্রমিক নিতেন। প্রায় দুই দশক গায়ক হিসেবে তিনি শীর্ষে থেকেছেন।

হিন্দি সিনেমার এই গায়ক বাংলাতেও বেশ প্রতিষ্ঠিত। সত্তরের দশকে পূজার অ্যালবাম মানেই কিশোর কুমারের গান। রয়েছে একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে, আমার পূজার ফুল,নয়নসহ, কারো কেউ নইতো আমি – বহু জনপ্রিয় গান। এই সময়েই তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। আমার স্বপ্ন তুমি, আশা ছিল ভালোবাসা ছিল, এ আমার গুরু দক্ষিণা, কি আশায় বাঁধি খেলাঘর, চিরদিনই তুমি যে আমার সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে তাঁর স্বর্ণময় ক্যারিয়ারে।

ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘অবিচার’-এও রয়েছে তাঁর জনপ্রিয় গান। সত্যজিৎ রায়ের দু‘টো ছবিতেও তিনি রবীন্দ্র সংগীত গেয়েছেন। উত্তম কুমার, মিঠুন চক্রবর্তী থেকে তাপস পাল, প্রসেনজিৎ সবার ঠোঁটেই তাঁর জনপ্রিয় গান আছে। এছাড়া আরো নানা ভাষায় তিনি গান গেয়েছেন। গায়ক, নায়ক, সুরকার, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার সব মাধ্যমেই তিনি প্রতিভার ঝলকানি দেখিয়েছিলেন।

বাপ্পি লাহিড়ী ও কিশোর কুমার

এত জনপ্রিয়তার পরও তিনি কখনো ঘরে তুলতে পারেননি জাতীয় পুরস্কার। পাননি পদ্মশ্রীও। তবে, গায়ক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন সর্বোচ্চ ছয়বার। এর বাদে অন্যান্য বেসরকারি পুরস্কার পেয়েছেন বহুবার। আজ তাঁর নামে পুরস্কারও চালু আছে, তাঁর জন্মদিনে গুগল ডুডল হয়।

পারিবারিক জীবনটা তাঁর পেশাদার জীবনের মত সফল ছিল না। বিয়ে করেছেন চারটি। বাংলার বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও গায়িকা রুমা গুহ ঠাকুরতা হচ্ছেন ওনার প্রথম স্ত্রী। পরবর্তীতে ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করেন জনপ্রিয় নায়িকা মধুবালাকে।

মধুবালার অকালপ্রয়ানের পর যোগিতা বালী ও লীনাকে বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর সন্তান অমিত কুমার এক সময় বেশ জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন। স্বনামধন্য অভিনেতা অশোক কুমার ও অনুপ কুমার উনার আপন বড় দুই ভাই।

কিশোর কুমারের জন্ম ১৯২৯ সালের চার আগস্ট। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কিশোর ‍কুমারের রসবোধ ছিল তীব্র। তাঁর বাড়ির সামনে টাঙানো সাইনবোর্ডে লেখা থাকতো – ‘কিশোর থেকে সাবধান’। তিনি গাছের সাথে কথা বলতেন, তাঁর চুটকি শুনে সেটেই সবাই হেসে লুটিয়ে পড়তো।

কিশোর কুমার অভিনয়ের চেয়ে গান গাওয়াকেই প্রাধান্য দিতেন। যদিও, নিজের মুখেই আবার বলতেন, ‘বক্স অফিসে জনপ্রিয়তার দিক থেকে আমার চেয়ে এগিয়ে কেবল দিলীপ কুমার।’ বোঝাই যাচ্ছে, নিজের অহংবোধ ছিল তীব্র। খুব বেশি পেশাদার ছিলেন, পুরোটা পারিশ্রমিক বুঝে পাওয়ার পর তবেই স্টুডিওতে গান গেতেন। একবার বড় ভাইয়ের অনুরোধে কোনো একটা বাংলা সিনেমার জন্য অর্ধেক সিনেমা পেয়েই মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ান। কিন্তু, অর্ধেক গান গেয়েই চলে আসেন। কারণ, আগেই তিনি বলে রেখেছিলেন, ‘যেমন পারিশ্রমিক, গানও তেমনেই হবে।’

মিমিক্রি করার ওস্তাত ছিলেন কিশোর কুমার। ছিলেন কুন্দন লাল সায়গলের বিশাল ভক্ত। যুবক বয়সে তাঁকে নকল করে গান গাইতেন। যৌবনে তাই মিমিক্রিকে কিশোরের জুড়ি ছিল না বললেই চলে। এমনকি স্বয়ং সত্যজিৎ রায়েরও মিমিক্রি করতেন কিশোর।

মধুবালার সাথে কিশোর কুমার

‘ঘরে বাইরে’ ছবির সঙ্গীত আয়োজনের সময় ভুতুড়ে এক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’ গানটি প্রথমে সত্যজিৎ নিজে গেয়ে বলেন, ঠিক এভাবেই গাইতে। কিশোর কুমার মজা করে ঠিক সত্যজিতের ঢঙেই গাইতে শুরু করলেন। মানিকবাবু ভড়কে গেলেন, বললেন, ‘এটা কি করছো!’

কিশোর কুমার একগাল হেসে নির্ভার জবাব দিলেন, ‘ঠিক আপনার মত করেই গাইছি।’ স্টুডিওতে তখন হাসির রোল। গানটা যে শেষ অবধি ঠিক ঠাক মতনই কিশোর কুমার গেয়েছেন, সেটা সিনেমাটি যারা দেখেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।