শরনার্থী থেকে নায়ক রাজ

জন্ম ১৯৪২ সালে, কলকাতায়। তিন ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন সবার ছোট। কিশোর বয়সে কলকাতায় মঞ্চ নাটকে জড়িত ছিলেন। ১৯৬২ সালে খায়রুন নেসাকে (লক্ষ্মী) বিয়ে করেন। কলকাতায় শিলালিপি নামের একটা ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, ব্যবসা করতে পারেনি সেই ছবি।

ষাটের দশকে দাঙ্গা হয় কলকাতায়। তার জের ধরে ১৯৬৪ সালে ঢাকায় এসেছিলেন শরনার্থী হয়ে। সহজ ছিল না জীবনটা। বিনোদন জগতে ঠাঁই পাওয়ার জন্য প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। রাস্তায় ঘুমানো থেকে শুরু করে, কাজের জন্য পরিচালকদের দাঁড়ে দাঁড়ে ঘোরা – সবই করতে হয়েছে তাঁকে।

তবে হার মানেননি কখনোই। নিজের প্রতিভার প্রতি আস্থা ছিল তাঁর। প্রথমদিকে রাজ্জাক তখনকার পাকিস্তান টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’-তে অভিনয় করেন। দর্শকদের গ্রহনযোগ্যতা পান। এরপর কিছুদিন কাজ করেন ইকবাল ফিলমসের আব্দুল জব্বার খানের সহকারী হিসেবে।

সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের ‘তেরো নম্বর ফেকু অস্তাগড় লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে পরিচিতি পান রাজ্জাক। এরপর এরকম আরো কিছু সিনেমায় ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

নায়ক হিসেবে তার আবির্ভাব ১৯৬৬ সালে। জহির রায়হানের বেহুলা সিনেমায় সূচন্দার বিপরীতে অভিনয় করেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পোশাকী নাম ছিল আব্দুর রাজ্জাক। বনে গেলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক।

পঞ্চাশ বছর কাজ করেছেন ঢাকার ফিল্ম ইন্ড্রাস্টিতে। জনপ্রিয়তা পেয়েছেন কলকাতাতেও, টালিগঞ্জের ছবিতে একসময় একচেটিয়ে ভাবে কাজও করে গেছেন। বাংলা-উর্দু মিলিয়ে ৩০০ টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। দুই ভাই, আবির্ভাব, বাঁশরী, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, যে আগুনে পুড়ি, পায়েল, দর্পচূর্ণ, যোগ বিয়োগ, ছদ্মবেশী, জীবন থেকে নেয়া, মধুর মিলন ছবিগুলো তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

শুধু অভিনয় নয়, ১৮ টি সিনেমা পরিচালনাও করেন তিনি।। তার পরিচালনয়অনন্ত প্রেম, মৌ চোর, বদনাম, আমি বাঁচতে চাই, কোটি টাকার ফকির, মন দিয়েছি তোমাকে, এবং উত্তর ফাল্গুনী, আয়না কাহিনী প্রশংসিত হয়।

ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত হয়েছিলেন রাজ্জাক। রাজ্জাকের তিন ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে বাপ্পারাজ ও সম্রাট সিনেমার সাথে জড়িত। গুলশানের ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’-এ তাঁদের বসবাস।

২০১৫ সালে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ফিরেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। এবার আর পারলেন না। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট বিকাল সোয়া ছয়টার দিকে ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিভে গেল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো।

তিনি না থাকলেও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তাঁকে ভুলবে না। তিনি একজন মহীরুহ। আজো যখন, পর্দায় নতুন কোনো নায়ক আসেন, তখনও তাঁর মনে রাজ্জাক হওয়ার বাসনা থাকে। কিন্তু, রাজ্জাক একজনই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।