দ্য লিজেন্ড অব হায়দ্রাবাদি হালিম!

‘সিটি অব নিজাম’ খ্যাত হায়দ্রাবাদের হালিম হচ্ছে হায়দ্রাবাদি দম বিরিয়ানির মত বিশ্ববিখ্যাত। আর হায়দ্রাবাদি হালিম ও পিসটা হাউজ এখন একে অপরের সমার্থক কারণ বিশ্ববিখ্যাত এই হালিমটির নাম, ব্র্যান্ড ও বিপননের কাজটি তারাই করে থাকে।

মূলত অ্যারাবিয়ান ডিশ হলেও ষষ্ঠ নিজাম মাহবুব আলি খানের সময় হায়দ্রাবাদে আসা আরবদের হাত ধরেই হালিমের সূচনা হয়। তিনিই রাজকীয় মেন্যুতে এটি যোগ করেন। পরবর্তীতে সপ্তম নিজাম হালিমকে হায়দ্রাবাদি ঐতিহ্যবাহী রন্ধনপ্রণালীতে যোগ করেন। এরপর ইয়েমেন থেকে আসা আরব গোত্র প্রধান সাইফ নবাব জং বাহাদুরের হাত ধরেই এই হালিম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল হায়দ্রাবাদ শহরে।

আরব্য খাবারটিতে তারা যোগ করেছিলেন স্থানীয় মশলা ও অন্যান্য উপকরণ। ফলে এটা একেবারেই অন্যরকম হয়ে উঠলো। ফলে, আরব্য হালিম থেকে পুরো আলাদা হয়ে হায়দারাবাদি হালিম নামে পরিচিতি লাভ করে বিশ্বব্যাপী। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় দশ শতকের টেক্সটগুলোতে হালিমের প্রথম রেসিপিকে ‘হারিস’ নামে উল্লেখ করা হয়েছিল।

  • হায়দ্রাবাদি হালিম কী ও কিভাবে প্রস্তত করা হয়?

হালিম মূলত মধ্য এশিয়ার জনপ্রিয় খাবার যেটিতে খাঁটি ঘি, মাটন, গম ও গোটা মশলার উপকরণ (যেমন: এলাচি, দারুচিনি, গোল মরিচ, আদা-রসুনের পেস্ট) এবং তেলাঙ্গানায় উৎপাদিত স্থানীয় ডাল ব্যবহৃত হয়। হায়দারাবাদি হালিমের আসল উপকরন হল এই ডাল।

হালিম তৈরীর চুলাকে ঐতিহ্যবাহী ভাষায় ‘বাট্টিস’ বলা হয়। এটা মূলত ইট ও মাটির তৈরী চুলা যেখানে স্বল্প আঁচে তেতুল কাঠের লাকড়ি দিয়ে ৭-৮ ঘন্টায় হালিম রান্না করা হয়। একজন/দুইজন ব্যক্তি অনবরত কাঠের বৈঠা/হাতুড়ি দিয়ে হালিম নাড়াতে থাকে ডেকচির মধ্যে। আর ঘরোয়া পরিবেশে হাতের তৈরী কাঠের ঘুটনি ব্যবহার করা হয় হালিম নাড়ানোর কাজে।

হায়দ্রাবাদে রমজান মাসে এই হালিম স্পেশাল মেন্যু হওয়ায় দেশবিদেশ থেকে ট্যুরিস্ট ছুটে আসে এই হালিমের স্বাদ নেওয়ার জন্য। তবে, হালিম বিরিয়ানির মত সারাবছর বিক্রি করা হয় না শুধুমাত্র পুরো রমজানে পিসটা হাউজসহ ওল্ড সিটির অলগলিতে বিক্রি করা হয়। তাই, অনেক ট্যুরিস্ট চাইলেই নন সিজনে এই ইউনিক হালিম টেস্ট করা সুযোগ পান না।

হায়দ্রাবাদি হালিম বানানোর মহাযজ্ঞ

যদিও, পিসটা হাউজ তাদের আউটলেটগুলোতে সম্প্রতি হালিম বিক্রি শুরু করায় হালিমপ্রেমিদের হটস্পটে পরিণত হয়েছে পিসটা হাউজের আউটলেটগুলো। পাশাপাশি জৈন ও ভেজিটেরিয়ানদের জন্য ভেজ হালিম চালু করায় পিসটা হাউজের হালিম ভেজ ও নন-ভেজ সবার কাছে সমান জনপ্রিয়।

পিসটা হাউজের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক মোহাম্মদ আব্দুল মাজেদ ১৯৯৭ সালে পিসটা হাউজ চালু করেন। দীর্ঘ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ২০০২ সালে পিসটা হাউজে হালিম চালু করেন যেটির রেসিপি হায়দ্রাবাদের অন্যান্য হালিম থেকে যেমন আলাদা তেমনি ঘণ ও স্বাদে অতুলনীয়।

খাসির এই হালিম অতিরিক্ত ঘণ, তাই চাইলেই দ্রুত খেতে পারবেন না আর বানানোর নিয়ম অনেক জটিল।

পিসটা হাউজের হালিম
  • অজানা যত তথ্য

হায়দ্রাবাদের এই হালিমের কিছু তথ্য না জানলেই নয়। ৫০ টির দেশে এই হালিম পৌঁছে যায়। এর মধ্যে পিসটা হাউজের আউটলেট আছে যুক্তরাষ্ট্রে। আর মিডলইস্ট, আফ্রিকা, কানাডা ও ইউরোপে এই হালিমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

২০১৪ সালের রমজানে এই হালিম থেকে পাঁচশ কোটি রুপির ব্যবসা হয়। ২৫ হাজারের মত লোক এই হালিম বানানো ও বিপননের কাজে জড়িত ছিল।  হায়দ্রাবাদে নামকরা হালিমের শেফদের মাসিক বেতন এক লাখ রুপির মত। সাথে অন্যান্য বোনাস ও সুযোগ সুবিধা তো আছেই।

১৯৫৬ সালে ওল্ড সিটির মদিনা হোটেলে ইরানি বংশোদ্ভূত আগা হোসাইন জাবেদ অফিসিয়ালি হালিমকে পরিচিত করানোর কাজ শুরু করেন। পরে শাহ গাউজ, বাহার ক্যাফে, বাবার্চি ও পিসটা হাউজের হাত ধরে ভারত ও বাইরের বিশ্বে এর নাম ছড়িয়ে পড়ে।

চাইলে পার্সেলও নেওয়া যায়

হায়দ্রাবাদের এই হালিম ২০১০ সালে জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন স্ট্যাটাস (জিআইএস) পায়। এর মাধ্যমে সারা ভারতের হাজারো হালিমের মধ্যে নিজের স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে হায়দ্রাবাদি হালিম।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।