রাঈস কিংবা একজন আবদুল লতিফ: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন আহমেদাবাদ

‘গুজরাটের বাতাসেই ব্যবসা আছে’ কিংবা ‘কোনো ব্যবসাই ছোট না, ব্যবসার চেয়ে বড় কোনো কাজ নেই’ – ‘রাঈস’ সিনেমায় শাহরুখ খানের ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রটির এমন সব সংলাপ ভক্তদের কমবেশি মুখস্ত হয়ে গেছে। তবে, খুব কম লোকই জানেন যে, সিনেমাটি আদতে নির্মিত হয়েছে বাস্তব এক চরিত্র নয়।

তিনি হলেন গুজরাটের আবদুল লতিফ। বিখ্যাত এক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন। একটা সময় ছিলেন গুজরাটের মদ ব্যবসার প্রধান নিয়ন্ত্রনকারী। সিনেমায় যেমন প্রতাপশালী দেখানো হয়েছে শাহরুখকে, আবদুল লতিফ ছিলেন ঠিক তেমনই। অবৈধ এই ব্যবসা চালানোর সাথে সাথে রাজনৈতিক মহলের সাথেও সম্পর্ক রেখে চলতেন তিনি। এজন্যই একটা সময়ে বিপদ নেমে আসে তাঁর ওপর।

লতিফের বেড়ে ওঠা গুজরাটেই। আহমেদাবাদের কালুপুরে তাঁর জন্ম হয় ১৯৫১ সালে। খুব দরিদ্র এক মুসলিম পরিবারের ছেলে তিনি। সেখান থেকে তিনি গুজরাটের অপরাধ জগতের বড় এক নেতা বনে যান। শোনা যায়, তাঁর সাথে আশির দশকের দিকে ভাল সম্পর্ক ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেতাজ বাদশাহ দাউদ ইব্রাহিমের।

কৈশোরেই তিনি মদের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তখন ছিলেন বুটলেগার। যে ব্যক্তি বেআইনিভাবে আমদানি-রপ্তানির সাথে জড়িত তাঁকে বলা হয় বুটলেগার। তরুণ বয়সে তিনি ‘সফল’ এক বুটলেগারে পরিণত করেন নিজেকে। আর দেখতে দেখতে যৌবনে তিনি গুজরাটের মদ ব্যবসাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন।

ওই সময় ভারতে অপরাধ জগত ও রাজনীতির মধ্যে খুব দহরম মহরম সম্পর্ক ছিল। গোপনে গোপনে এখনো আছে। ব্যবসায় আবদুল লতিফ ছিলেন খুব জনপ্রিয় মুখ। তিনি ভীতিহীন ছিলেন, ব্যবসার কাজে যেকোনো লোকের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা বা ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল।

সেই সুবাদে বিজেপি ও জনতা দলের মত বড় বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে উঠবস ছিল লতিফের। এর ফলে নিজের অনৈতিক ব্যবসা চালানো সহজ হত তাঁর। রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই তাঁকে বন্ধু ভাবেনি। বরং, লতিফ ছিলেন পার্টিগুলোর জন্য নির্বাচন জয়ের হাতিয়ার।

এর বড় একটা কারণ হল, লতিফ ‍গুজরাটের সাধারণ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দরিদ্র মুসলমানদের জন্য তিনি ছিলেন রবিনহুডের মত এক চরিত্র। ব্যবসা থেকে যা আয় হত তাঁর বড় একটা অংশ তিনি দান করে দিতেন।

তাই গুজরাটের নির্বাচনে জিততে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য লতিফের মত জয় করা জরুরী ছিল। লতিফ যাকে বলতেন, সাধারণ মানুষ নির্দ্বিধায় তাঁকেই ভোট দিতে রাজি ছিলেন। লতিফের বড় ভুল ছিল তিনি অন্ধের মত রাজনৈতিক নেতাদের বিশ্বাস করতেন।

আর এটাই তাঁর জন্য বিপদ ডেকে আনে। বিজেপি যে বছর নির্বাচন জিতে ক্ষমতায় আসে সেবছরই তিনি গ্রেফতার হন। তবে, তাঁকে গ্রেফতার করাটা যথেষ্ট যৌক্তিকই ছিল। তার নামে খুন, কনট্রাক্ট কিলিং, দাঙ্গা, অপহরণ, চোরাকারবারী ও চাঁদাবাজি বিষয়ক ১০০ টি মামলা ছিল।

তাঁর গ্যাঙয়ের নামেও ২৪৩ টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ৬৪ টি খুন ও ১৪ টি অপহরণের মামলা। এখানেই শেষ নয়। আবদুল লতিফ ১৯৯৩ মুম্বাই বোমা হামলা মামলার অন্যতম অভিযুক্তদের একজন।

মুম্বাইয়ের সেই মর্মান্তিক হামলার সময় যেসব আরডিএক্স ব্যবহৃত হয় সেসব নৌপথে এই আবদুল লতিফই অবৈধ উপায়ে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৯৫ সালে তাকে দিল্লী থেকে গ্রেফতার করা হয়।

‘তিনি ছিলেন রগচটা একজন মানুষ। দিনভর সিগারেট খেতেন আর তাস খেলতেন। ফিয়াট গাড়ি চালাতেন। ১৯৯২ সালে যখন তাঁর নামে ওয়ারেন্ট জারি হল তখন দুবাই পালাতে চেয়েছিলেন। আমাকে টিকেটের ব্যবস্থা করে দিতে বলেছিলেন। ওই সময় একদমই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছিলেন।’ কথা গুলো বলছিলেন এখন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় জড়িত লতিফের সাবেক এক সতীর্থ।

সালমান খানের সাথে আবদুল লতিফ

আবদুল লতিফই তাঁর আসল নাম হলেও কাজের প্রয়োজনে কখনো তিনি আবদুল আজিজ, মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ হানিফ কিংবা রেহমান নাম ধারণ করতেন। লতিফের জনপ্রিয়তার কারণ জানাতে গিয়ে ওই সতীর্থ বলেন, ‘ওর প্রতিদ্বন্দ্বীরা ওকে খুব ভয় পেত। দাঙ্গা-ফ্যাসাদের সময় ও গরিবদের জন্য ত্রাণকর্তা হয়ে হাজির হয়েছিল। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, গরিবদের ও খুব সাহায্য করতো।’

তবে, এসবের আড়ালে তাঁর মদের ব্যবসা বেশ জমে উঠেছিল। তাই, অনেকেই তাঁকে পছন্দ করতেন না। এমন একজন ছিলেন স্বয়ং লতিফের বাবা ধর্মপ্রাণ আবদুল ওয়াহাব। তাঁর আট সন্তানের একজন হলেন লতিফ। সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলের পর লতিফের আর পড়াশোনা করা হয়নি অভাবের কারণে। বাবার সাথেই কাজ করা শুরু করেন। ১৯৭১ সালে লতিফ বিয়ে করেন আকিলা বানুকে।

প্রতিবেশিদের সাথে, অনেকটা যৌথ পরিবারের মতই থাকতেন লতিফরা। অভাব, বেকারত্ব থাকলেও নিজেদের লোকের প্রতি টান ছিল এই মানুষগুলোর। এটা ব্যবহার করেই অনেকবারই পুলিশের নাগালের মধ্যে থাকার পরও পালিয়ে যেতে সক্ষম হন লতিফ।

বাবার ব্যবসায় আয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না লতিফ। ৭০-এর দশকের মাঝামাঝিতে বুটলেগার হিসেবে বন্ধুদের সাথে অনেক অর্থের মালিক বনে যান। ফলে, একটা সময় বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। ধীরে ধীরে হানিফ দুধওয়ালা, সৈয়দ বাপু, পিলু মারওয়ারি ও আব্বাস আন্ধাদের সাথে মিলে অপরাধ জগতের সাথে আরো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন লতিফ।

দিল্লি থেকে গ্রেফতার করে আহমেদাবাদ নিয়ে আসা হয় লতিফকে

ওই সময় বেআইনি কায়দায় এক ট্রাক বিদেশি মদ আনা মানেই প্রায় দেড় লাখ রুপির লাভ। এমনও দিন আছে, যেদিন লতিফের দরজায় একটা নয়, ১০ টা ট্রাক এসে জমা হত। এই করে মাসিক প্রায় কোটি রুপির ওপর আয় করতেন তিনি। ওই সময়ে বসে এটা স্রেফ অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার ছিল।

পোপাটিয়াবাদের বাড়ির বেজমেন্টটা ছিল লতিফে ‘ক্লাব’। যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ঘরটাকে ‘রিমান্ড রুম’ হিসেবে ব্যবহার করা হত। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের এনে এই ঘরেই পেটাতেন লতিফ ও তাঁর শীষ্যরা। সেই ঘর এখনো আছে। গো-ডাউন হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

তবে, লতিফ আরো ওপরে উঠতে চাইতেন। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সুবাদে তিনি ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে দরিয়াপুর, জামালপুর, কালুপুর, রাইখাদ ও শাদপুর – মোট পাঁচটা মিউনিসিপাল সিটে নির্বাচন করেন। সবগুলোতেই জয়ী হন। তাঁর জনপ্রিয়তা বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। আহমেদাবাদে তিনি রীতিমত মাফিয়ার মর্যাদা পেতেন। লতিফের শিষ্যরাও আহমেদাবাদ শহরে বেশ ‘ভাব’ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।

অবস্থা সুবিধার না বুঝতে পেরে লতিফ ১৯৯২ সালে দুবাই পালিয়ে যান। দাউদের সাথে দেখা করেন। তিন বছর পর ফিরে দিল্লিতে লুকিয়ে থাকেন। ১৯৯৫ সালে গুজরাটে বিজেপি ক্ষমতায় আসা মাত্রই তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৯৭ সালের ২৯ নভেম্বর তাকে জেলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়। সেখান থেকে ফেরার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। তখন লতিফের বয়স ছিল ৪৬।

নারোদা হাইওয়ের ভুটিয়া বাঙলো। এখানেই এনকাউন্টার হয় লতিফের।

পুলিশ দাবী করে, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাঙয়ের গুলিতে মারা যান লতিফ। তবে, পরিবারের দাবী ছিল আহমেদাবাদে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল সাজানো একটা এনকাউন্টারে। আসল সত্যিটা এখনো অজানা।

যখন তিনি মারা যান তখন গুজরাটের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন শঙ্কর সিং ভাঘেলা। এনকাউন্টারে তাঁর মদদও ছিল। ২০১৪ সালে তাঁর বিপরীতে সমাজবাদী পার্টির হয়ে নির্বাচনও করেন লতিফের এক ছেলে। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লতিফের আরেক ছেলে নির্বাচন করেছিলেন ২০০৯ সালে।

আবদুল লতিফকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘রাঈস’ মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। এর আগেই ২০১৬ সালের এপ্রিলে সিনেমাটির বিরুদ্ধে মামলা ঠুঁকে দেন লতিফের ছেলে। তাঁর দাবী ছিল, সিনেমাটিতে তাঁর বাবার চরিত্রের অবমাননা করা হয়েছে। যদিও, সিনেমাটিতে আবদুল লতিফকে একটু বেশিই ‘মহৎ’ ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আদতে তিনি এতটা মহৎ যে ছিলেন না, সচেতন পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!

– ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও নিউজগ্রাম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।