আমার বোনের রক্তে রাঙানো ১৯ মে

বাঙালিদের আগেও আরেকটি জাতির উপর ভাষার জন্য চলেছিল গুলি। ভাষার জন্য লড়াই করা সেই জাতিটি হচ্ছে অসমিয়ারা। যে ভাষার জন্য লড়াই হয়েছিল সে আবারো খোদ বাংলা এবং অসমিয়া।

অসমিয়া অনেক পুরোনো ভাষা, এটাও উপমহাদেশীয় অন্যান্য ভাষার মত পূর্ব মাগধী-প্রাকৃত তপভ্রংশ থেকে এসেছে। এর বয়স মোটামুটি তিন শতাব্দীর মতই। তবে বহুদিন এটি একটি ভাষার গঠনে আসতে পারেনি, আঞ্চলিক কথ্য ভাষা হিসেবেই ছিল, তবে উনিশ শতকে এটি একটি সুগঠিত ভাষার রূপ নেয়।

আসামে দাপ্তরিক ভাষা বাংলাই ছিল, ইংরেজরা ১৮২৬ সালে আসামের শাসন পাবার পর ১৮৩৬ সালে সেটি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কাগজপত্রের মাধ্যমে ঘোষণা দেয়, তবে ব্রিটিশরা আসলে অসমিয়াকে বাংলার উপভাষা হিসেবে ভুল করায় তাঁরা এই জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আসামবাসীর ঘোর প্রতিবাদের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ১৮৭২ সালে আবার অসমিয়া ভাষায় ফিরে আসে।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পর, আসাম যখন স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ঘোষিত হলো, তখন, আসামের নাগরিকরা আশা করেছিলেন, অসমিয়াকেই রাজ্যভাষা করা হবে।

কিন্তু, প্রশাসন বাংলাকেই বহাল রাখে। ফলে ১৯৪৮ সালে আসামের মানুষেরা আন্দোলনে নামেন, এর নেতৃত্ব দেন সমাজের শিক্ষিত মানুষেরা। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়লে পুলিশ মাঠে নামে। এবং এক পর্যায়ে মিছিলে গুলি চালায়। সেবার কেউ আহত হয়নি, কিন্তু বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিলেন।

খবরের কাগজে কমলা ভট্টাচার্যকে নিয়ে শোকলিপি

অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে ১৯৬১ সালে প্রাদেশিক সরকার আসামে অসমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এর ফলে ক্ষেপে যায় এ রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা, যারা বরাক উপত্যকায় থাকতেন।

তাঁরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মাঠে নামলে পুলিশের সাথে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে মিছিলে গুলি চালালে ১১ জন নিহত হন, এর মধ্যে বাংলার জন্য প্রথম নারী ভাষাশহীদ কমলা ভট্টাচার্যও ছিলেন, এরপর আন্দোলন আরো তীব্র হয়, এবং তোপের মুখে সরকার বাংলাকেও রাজ্যভাষা হিসেবে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়।

আসামে বিভিন্ন জায়গায় ১৯ মে ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন মণিপুরিরাও।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের উত্তরপুর্বাঞ্চলের অসম, ত্রিপুরা ও মণিপুরে এবং বার্মায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী জাতির লোক বাস করে। অসমের বরাক উপত্যকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের রয়েছে সুদীর্ঘ ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস। মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে আন্দোলনের ফলে ১৯৮৩ সালে সরকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু পরে সরকার এই সিদ্ধান্ত স্থগিত করলে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা ফুঁসে ওঠে।

১৯৯৬ সনের ১৬ মার্চ মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়াদের ৫০১ ঘণ্টার রাজপথ-রেলপথ অবরোধ আন্দোলনে নামলে, পুলিশ আক্রমণে নামে। আসামের করিমগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয় সুদেষ্ণা সিংহ নামের এক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী তরুণী। এই ঘটনার ১২ বছর পর সরকার এই ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৫২’র আন্দোলন এই সবগুলো থেকে আলাদা, ৫২ একটি জাতির স্বত্বাকে জাগিয়ে তুলেছিল, চেতনা শক্তিশালী করে। তবু আমরা একে মহান করে তুলতে গিয়ে যদি অন্যদের ভুলে যাই, তবে একুশকেই অবনমিত করা হবে। ভাষা সবার অধিকার হোক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।