শ্রমজীবী ও ক্লান্তিহীন ক্রিকেটার

বার্ট আয়রনমঙ্গার – তাঁকে বলা হয় অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা লেফট আর্ম স্পিনার। অথচ, আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে ছোটবেলায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি বামহাতের তর্জনীর (অর্থাৎ যে আঙ্গুল ব্যবহার করে লেফট আর্ম বোলারগণ বল স্পিন করে) প্রায় অর্ধেক হারান! শারীরিক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তিনি সারাজীবন দাপটের সাথে বোলিং করে গেছেন। অত্যন্ত বিনয়ী, মিতভাষী এবং পরিশ্রমী এই ব্যক্তিটির জন্ম ১৮৮২ সালের সাত এপ্রিল।

১.

যে বয়সে বার্ট আয়রনমঙ্গার এর টেস্ট অভিষেক হয়েছিল সেই বয়সে সাধারণত অন্যান্য ক্রিকেটারগণ আরামদায়ক আর্মচেয়ারে বসে ঠাণ্ডা বিয়ার পান করতে করতে ক্রিকেটের উপর জ্ঞানগর্ভ লেকচার দেন! ১৯২৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে যখন অভিষিক্ত হলেন তাঁর বয়স তখন ৪৬ বছর! ভুল পড়েন নি, এটা কোন টাইপোও নয়। সত্যিই তাঁর বয়স ছিল ৪৬ বছর!

তবে, এটা তাঁর জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না। বার্ট এমন একজন মানুষ ছিলেন যে আগে কোনদিন সৌখিনতার মুখ দেখেনি এবং পরেও নয়। তিনি সারাজীবনই ছিলেন শ্রমজীবী। কঠোর পরিশ্রম করেই সারাজীবন অর্থ উপার্জন এবং জীবন-নির্বাহ করতে হয়েছে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। একজন অস্ট্রেলিয়ান হয়েও তিনি জীবনে অ্যালকোহল ছুঁয়েও দেখেন নি!

তিনি মেলবোর্নে যতদিন ছিলেন পুরনো এক বাড়িতেই কাটিয়ে দিয়েছেন। কাজ করেছেন সেন্ট কিলডা সিটি কাউন্সিলের একজন বিশ্বস্ত মালী হিসেবে। পরম মমতায় বছরের পর বছর পরিচর্যা করেছেন শাকসবজি এবং ফুলের বাগানের। এমনকি ৭০ বছর পর্যন্ত নিজেই মোয়ার নিয়ে বাগানের আগাছা সাফ করেছেন! সম্ভবত ক্রিকেট খেলে যে কয়দিন কাজ করতে পারেন নি, তা পুষিয়ে নিতেই এত বছর পর্যন্ত পরিশ্রম করে গেছেন!!

এই আমলে বসে তখনকার ক্রিকেটারদের জীবনকে অনুধাবন করা কষ্টকর হবে। সে আমলে ক্রিকেটে এত গ্ল্যামার, টাকা কিংবা পেশাদারিত্ব ছিল না। ক্রিকেট তখন জীবনের ছোট্ট একটি অংশের বেশি কিছু ছিল না। বার্ট একবারই সৌখিনতার স্বাদ পেয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর। কেননা, তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে কার্লটন অঞ্চলের মেলবোর্ন জেনারেল সিমেট্রি-তে। এখানে একাধিক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত এবং নামী লেখকদের সমাহিত করা হয়েছে!

২.

তাঁর খেলার স্টাইলও আধুনিক আমলের ক্রিকেটার বা দর্শকের কাছে মেনে নিতে কষ্ট হতে পারে। তিনি কোনমতেই ‘অ্যাথলেট’ ছিলেন না। শারীরিক গঠন মোটেই খেলোয়াড়সুলভ ছিপছিপে ছিল না এবং সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করার জন্য তাঁর কাঁধ ছিল সুবিশাল। এ কারণে বার্টের হাঁটাচলায় আড়ষ্টভাব ছিল। মূলত এটাই তাঁর ‘Dainty’ (ভঙ্গুর) নিকনেম পাবার কারণ।

তিনি সম্ভবত মাঠের সবচেয়ে দুর্বল ফিল্ডার ছিলেন, সবচেয়ে খারাপ ব্যাটসম্যান তো অবশ্যই! যে কোন দুর্বল ব্যাটসম্যানকে নিয়ে অতি প্রচলিত যে গল্পটি প্রচলিত আছে সেটি মূলত তাঁর থেকেই শুরু হয়েছে। যারা জানেন না তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি। কথিত আছে একবার কেউ একজন ড্রেসিংরুমে ফোন করে বার্টকে চেয়েছিল। একজন জবাব দিল ‘সে ব্যাট করতে গেছে’ বলে। জবাবে ফোনকর্তা ‘তাহলে আমি হোল্ড করছি’ বলেছিল। বার্ট এমনই ব্যাটসম্যান ছিলেন!

বডিলাইন সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে বার্ট যখন ব্যাট করতে নামেন তখন অপর প্রান্তে ডন ব্রাডম্যান ৯৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। হেলে-দুলে ক্রিজে গিয়ে তখনকার পঞ্চাশোর্ধ্ব বার্ট অর্ধেক বছর বয়সী ডনকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘চিন্তা কর না, বাছা! আমি তোমাকে নিরাশ করব না!’ সে সময় ওয়েলি হ্যামন্ড বল করছিলেন। ডন ব্রাডম্যান পরে জানিয়েছিলেন তিনি জীবনে কোনদিন পরপর দুই বল উইকেটের এত কাছ দিয়ে (হিট না করে) যেতে দেখেন নি! অবশ্য, বার্ট সত্যিই কথা রেখেছিলেন এবং ডনের সেঞ্চুরি না হওয়া পর্যন্ত আউট হন নি!

অবশ্য, আউট হবার সময় তাঁর স্কোর শূন্যই ছিল! ঠিক যেমন ছিল তাঁর ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারের এক চতুর্থাংশ ইনিংস! টেস্টে তাঁর মোট রান ছিল উইকেটের চেয়ে অনেক কম। ১৪ ম্যাচে মোট রান ছিল ৪২ এবং উইকেট ছিল ৭৪! তবে, ফার্স্ট ক্লাসে রানের পাল্লা ভারী-৯৬ ম্যাচে মোট রান ৪৭৬ এবং মোট উইকেট ৪৬৪, কোনমতে আর কী!

আসলে তিনি সেই আমলের ক্রিকেটার ছিলেন যখন একজন বোলারের কাজ ছিল শুধুই বল করা। এবং সেই কাজটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সাথেই করেছেন। ঠিক যেমনটি করেছেন মালীর কাজটি।

৩.

বার্ট আয়রনমঙ্গার এর জন্ম হয়েছিল কুইন্সল্যান্ডের গ্রাম্য পরিবেশে। তিনি ছিলেন বাবা-মা’র দশ সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠতম। তাঁর বাবা ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক।

কিশোর থাকা অবস্থায় শস্য কাটার যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বামহাতের আঙ্গুল হারান। সম্ভবত বোনের কারণে তাঁর জীবন বেঁচে যায় কেননা রক্তপাত থামাতে না পেরে তাঁর বোন পুরো হাতটি আটার বস্তার মধ্যে চেপে ধরেছিলেন! এতে রক্ত পড়া বন্ধ হয় এবং সৌভাগ্যক্রমে কোন ইনফেকশনও হয় নি। তবে, কাটা জায়গাটি সারাজীবনের জন্য পিণ্ড আকার ধারণ করেছিল।

বার্টের ফার্স্টক্লাস ডেব্যু হয় ১৯১০ সালে যখন তাঁর বয়স ২৭ বছর, ভিক্টোরিয়ার হয়ে। ১৯১৩ সালে একে একে নিউ সাউথ ওয়েলস এবং সফররত কিউ দলের বিরুদ্ধে চমৎকার বোলিং করেন। তাঁর নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন অজি নামী ক্রিকেটার ওয়ারউইক আর্মস্ট্রং তাঁকে মেলবোর্নে যাবার জন্য রাজি করান।

৪.

গ্রামের ছেলে বার্ট আয়রনমঙ্গার মেলবোর্ন পৌঁছলেন। জীবিকার জন্য কাজ করেছেন বারম্যান এবং সিগারেট-বিক্রেতা হিসেবে। পরে মালীর স্থায়ী কাজ শুরু করেন যার কথা আমরা আগেই জেনেছি। যাই হোক, ১৯১৪ সালে তিনি প্রথমবারের মত শেফিল্ড শিল্ড কাপ খেলেন এবং শুরু থেকেই দু হাত ভরে উইকেট শিকার আরম্ভ করেন।

তাঁর বোলিং এর গতি ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি, অনেকটা স্লো মিডিয়াম পেসারের মত। ইংল্যান্ডের ডেরেক আন্ডারউড এর সাথে মিল আছে। দুজনের আরও একটি মিল ছিল-স্টিকি উইকেটে দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত ভয়ঙ্কর! তবে, বার্টের বল রিলিজ একটু উপরে থাকার কারণে বেশি বাউন্স পেতেন। আঙ্গুলের পিণ্ডের কারণে কোন কোন বল হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠত (নিজের অজান্তেই টপ স্পিন হয়ে যেত)।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরও তাঁর মুড়ি-মুড়কির মত উইকেট শিকার অব্যাহত রইল। বিশেষ করে বৃষ্টি-বিঘ্নিত ম্যাচে তিনি আক্ষরিক অর্থেই আনপ্লেয়েবল হয়ে উঠতেন।

৫.

ধারাবাহিকতার পুরষ্কারস্বরুপ শেষ পর্যন্ত ১৯২৮ সালের অ্যাশেজ সিরিজে তিনি ডাক পেলেন। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট শুরু করার ১৮ বছর পর! ১ম ইনিংসেই ৪৬ বয়সী ‘বুড়ো খোকা’ স্বভাবজাত আন্তরিকতার সাথে বল করলেন ৯৪.৩ ওভার! দ্বিতীয় ইনিংসে করলেন আরও ৬৮ ওভার। জ্যাক হবস, হারবার্ট সাটক্লিফ, ওয়েলি হ্যামন্ড, প্যাটসি হেন্ড্রেন, ডগলাস জারডিন কিংবা পার্সি চ্যাপম্যান কেউই তাঁকে ডমিনেট করতে পারে নি। তবুও, পুরো ম্যাচে ৩০৬ রানে ৬ উইকেট খুব একটা উজ্জ্বল পারফরমেন্স বলা যায় না। অবধারিতভাবে পরের টেস্টে বাদ পড়লেন। তিনিও নিজেও হয়ত আর টেস্ট খেলার আশা করেননি।

কিন্তু, ২ বছর পর আবারও সবাইকে চমকে দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজে ডাক পেলেন। মেলবোর্নের চতুর্থ টেস্টটিতে বৃষ্টি হানা দেয়। বার্ট নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন। প্রথম ইনিংস শেষে তাঁর বোলিং ফিগার হয় ২০-৭-২৩-৭, ক্যারিবিয়রা মাত্র ৯৯ রানে গুটিয়ে যায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৮ বছর বয়সী বার্ট ৫৬ রানে ৪ উইকেট দখল করেন। অর্থাৎ, পুরো ম্যাচে ৭৯ রানে ১১ উইকেট!

৬.

তাঁর জীবনের সেরা পারফরমেন্সটি আসে ১৯৩২ সালে। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে এসেছিল। মেলবোর্নের পঞ্চম এবং সিরিজের শেষ টেস্টেও বৃষ্টি হানা দিয়েছিল। নরম উইকেটে সফরকারীরা মাত্র ৩৬ রানে গুটিয়ে যায়, বার্টের বোলিং বিশ্লেষণ ছিল ৭.২-৫-৬-৫! দ্বিতীয় ইনিংসে কিছুটা ‘খারাপ’ বল করেন, ১৫.৩-৭-১৮-৬! এবার দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ হয় সব উইকেট হারিয়ে ৪৫। ম্যাচে বার্ট আয়রনমঙ্গার ২৪ রানে ১১ উইকেট শিকার করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন পর্যন্ত এটি বিশ্বরেকর্ড! দশ বা ততোধিক উইকেট শিকার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম রানের বিশ্বরেকর্ড।

কুখ্যাত বডিলাইন সিরিজটিই ছিল তাঁর শেষ সিরিজ। খুব একটা খারাপ করেন নি। ২৭ গড়ে ১৫ উইকেট নিয়েছেন। ৪-১ ব্যবধানে সিরিজে হারলেও একমাত্র জয়সূচক ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ও’রাইলির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ হয় মাত্র ১৪ ম্যাচে ৭৪ উইকেট শিকারের মাধ্যমে। গড় ১৭.৯৭! সারাজীবনের মত টেস্টেও ছিলেন মিতব্যয়ী, ওভার প্রতি মাত্র ১.৬৯! তাঁর চেয়ে ভাল ইকোনমি আছে (কমপক্ষে ৩০ উইকেট পাওয়া বোলারদের মধ্যে) শুধুমাত্র ট্রেভর গডার্ড এবং বাপু নাদকার্নি’র।

টেস্ট ছাড়লেও আরও কিছুদিন ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট চালিয়ে যান। ১৯৩৫-৩৬ মৌসুমে ভিক্টোরিয়ার হয়ে ভারত এবং সিলন (শ্রীলঙ্কা) সফর করেন। জীবনের শেষ ফার্স্টক্লাস ম্যাচটি খেলেন ভারতের বোম্বেতে। ম্যাচে ৫০ রানে ৫ উইকেট দখল করেন। তাঁর ফার্স্টক্লাস ক্যারিয়ার শেষ হয় ২১.৫০ গড়ে ৪৬৪টি উইকেট শিকারের মাধ্যমে। বয়স ৪৫ বছর হবার পর তিনি মোট ৬৫টি ম্যাচ খেলেছেন, যার মধ্যে ১৫টি ম্যাচে তিনি ৪০০ ও বেশি বল করেছেন! তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন!

ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার পর পূর্ণকালীন মালীর কাজ শুরু করেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত তাঁদের বাড়িতে কোন টেলিফোন ছিল না। জীবনে কোনদিন গাড়ি চালান নি এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গাড়ি কেনার সামর্থ্যও হয় নি!

১৯৭১ সালের ৩১ মে সেই পুরনো ও জীর্ণ বাড়িতেই ঘুমের মধ্যে তিনি সবাইকে ছেড়ে চির অজানার পথে পাড়ি দেন। সারা জীবনের মত যাবার বেলাতেও তিনি চলে যান চুপচাপ। সবার অগোচরে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।