‘সুপারম্যান’ কুশল ও ইতিহাসের সেরা টেস্ট ইনিংস

কপালের নাম গোপাল হলে যা হয় আর কী, কুশল পেরেরার ইনিংসটি মিস করেছি!

ওই ইনিংসটি ধরেই আলোচনা চলছে সবসময়ের সেরা ইনিংসের। বিভিন্ন যুগের গ্রেট ইনিংসগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গেলে অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। অনেক বড় ক্যানভাসের ব্যাপার। আমি স্রেফ আমার দেখা সেরা টেস্ট ইনিংসগুলো ভাবলাম। সাজালাম। এই মূহুর্তে যতটা মনে পড়ছে সেসব, কোনোটা বাদ পড়ে গেলে পরে আবার সংযোজন করতে হবে।

  • ব্রায়ান লারা (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

১৫৩, ব্রিজটাউন ১৯৯৯, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

এক নম্বরে, কারণ এটিই সেরা! বর্ণনার জন্য ছোট্ট জায়গা যথেষ্ট নয়। আমার দেখা সেরা, সব বিবেচনায়ই সর্বকালের সেরা দুই-তিন ইনিংসের একটি।

  • ভিভিএস লক্ষ্ণণ (ভারত)

২৮১, কলকাতা ২০০১, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

অনেক মহাকাব্য লেখা হয়েছে এই ইনিংস নিয়ে। আমি দুটি ব্যাপার ভুলব না। প্রথমত, শেন ওয়ার্নের বিশাল টার্নেও স্পিনের বিপক্ষে যেভাবে অনসাইডে খেলেছেন, রাউন্ড দা উইকেটে করা লেগ স্পিনে যে ফ্লিক, অনড্রাইভগুলো করেছেন, আমি বিশ্বাস করি না আর কেউ সেভাবে তা করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ফিজিক্যাল দিকটি, যা নিয়ে আলোচনা কমই হয়। দ্বিতীয় দিন বিকেলে উইকেটে গিয়েছিলেন লক্ষ্ণন, অপরাজিত থেকে শেষ করেছেন। পর দিন ফিফটি করে আউট হয়েছেন দলের শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। সেদিনই আবার ফলো অনের ব্যাট নেমেছেন তিনে, দিন শেষে অপরাজিত ১০৯। পর দিনও সারাদিন ব্যাট করেছেন। শেষ দিন সকালে আউট হয়েছেন।

  • আজহার মেহমুদ (পাকিস্তান)

১৩২, ডারবান ১৯৯৭, প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা

ভয়ঙ্কর সুইঙ্গিং ও বাউন্সি উইকেটে, প্রতিপক্ষের চার পেসার ডোনাল্ড-পোলক-ফ্যানি ডি ভিলিয়ার্স-ক্লুজনার। ৮৯ রানে ৫ উইকেট পড়ার পর উইকেটে গিয়েছিলেন আজহার, দলের বাকি ১৭০ রানের মধ্যে একাই করেছেন ১৩২। শেষ চার জুটিতে এসেছে ১৩২ রান, তাতে শেষ চার ব্যাটসম্যানের রান ছিল ২, ৬, ৬ ও ০। বাকি সব করেছেন আজহার একাই। একটা ফ্রিক ইনিংস।

  • সনাৎ জয়সুরিয়া (শ্রীলঙ্কা)

২৫৩, ফয়সালাবাদ ২০০৪, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান

উইকেট ছিল বোলিং সহায়ক। ম্যাচের অন্য তিন ইনিংসে গোটা দলের রান ছিল ২৪৩, ২৬৪, ২১৬। তৃতীয় ইনিংসে জয়াসুরিয়া একাই ২৫৩। নবম উইকেটে ১০১ রানের জুটিতে দিলহারা ফার্নান্দো করেছিলেন কেবল ১ রান! এতটাই অবিশ্বাস্য খেলেছিলেন জয়াসুরিয়া। দলের শেষ ৬ ব্যাটসম্যান মিলে করেছিলেন ১১ রান, ওই ৬ জনকে নিয়েই আরেকপাশে জয়াসুরিয়া করেছিলেন একশর বেশি রান।

  • কেভিন পিটারসেন (ইংল্যান্ড)

১৮৬, মুম্বাই ২০১২, প্রতিপক্ষ ভারত

ইংল্যান্ডের দুই স্পিনার সোয়ান ও পানেসার মিলে নিয়েছিলেন ম্যাচে ১৯ উইকেট। উইকেট কতটা টার্নিং ছিল, সহজেই অনুমেয়। সেই টার্নিং উইকেটেই ভারতের তিন স্পিনারকে সামলে, জহির খানের রিভার্স সুইংয়ের জবাব দিয়ে পাল্টা আক্রমণে ২৩৩ বলে ১৮৬। কেপির ব্যাটসম্যানশীপের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ওই ইনিংস।

  • রিকি পন্টিং (অস্ট্রেলিয়া)

১৫৬, ওল্ড ট্রাফোর্ড ২০০৫, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড

ম্যাচ জেতানো নয়, ম্যাচ বাঁচানো ড্র। তবে সেই ড্র ছিল জয়ের সমান। হার্মিসনের গতি ও বাউন্স, হগার্ডের সুইং, ফ্রেডির আগ্রাসন, জোন্সের ৯০ মাইল গতির টানা রিভার্স সুইং সামলে শেষ দিনে প্রায় ৭ ঘণ্টা ব্যাট করে ১৫৬ রান। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তার ব্যাটসম্যানশীপ। যদিও শেষ করে আসতে পারেননি, ৪ ওভার বাকি থাকতে আউট হয়ে যান। ম্যাকগ্রা ও লি সেই ৪ ওভার কাটিয়ে ড্র নিশ্চিত করেন।

ম্যাচের পর মাইকেল ভন বলেছিলেন, তার দেখা সেরা ইনিংস। স্টিভ ওয়াহ বলেছিলেন, ‘মনোসংযোগ ও নিবেদনের অনন্য নজির, রিকি ক্যাপ্টেন হিসেবে গ্র্যাজুয়েট হলো এই ইনিংস।’

  • অ্যাডাম গিলিক্রিস্ট (অস্ট্রেলিয়া)

১৪৯*, হোবার্ট ১৯৯৯, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান

৩৬৯ রান তাড়ায় ১২৬ রানে নেই ৫ উইকেট, সে‌ পরিস্থিতিতে নেমে অবিশ্বাস্য প্রতি আক্রমণ। ল্যাঙ্গারের সঙ্গে ২৩৮ রানের জুটি, অভাবনীয় জয়। প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণ ছিল ওয়াসিম-ওয়াকার-শোয়েব-সাকিলাইন-আজহার মাহমুদ। ল্যাঙ্গার ১২৭ রানে আউট হয়েছিলেন। ১৬৩ বলে ১৪৯ করে গিলি ফিরেছিলেন দলের জয় সঙ্গে নিয়ে।

  • গ্রায়েম স্মিথ (দক্ষিণ আফ্রিকা)

১৫৪, এজবাস্টন ২০০৮, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড

চতুর্থ ইনিংসে জিততে প্রয়োজন ছিল ২৮৩। প্রথম ৬ ব্যাটসম্যানের অন্য কেউ ৩০ করতেও পারেননি। অ্যান্ডারসন-ফ্রেডি-পানেসারদের দারুণ খেলে স্মিথ একাই টেনেছেন। পরে ষষ্ঠ উইকেটে ৪৫ রান করে সঙ্গ দেন মার্ক বাউচার। ২৪৬ বলে অপরাজিত ১৫৪ করে স্মিথ ফেরেন দলকে জিতিয়ে। ৪৩ বছর পর ইংল্যান্ডে সিরি জেতে দক্ষিণ আফ্রিকা।

  • শচিন টেন্ডুলকার (ভারত)

১৪৬, কেপ টাউন ২০১১, প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা

ডেল স্টেইনের অবিশ্বাস্য দুটি স্পেলের কারণেই এই ইনিংস আমার সেরাদের তালিকায়। অবিশ্বাস্য সুইং বোলিংয়ের প্রদর্শনী দেখেছিলাম, মূলত আউট সুইং। কোনো কোনোটি লেগ স্টাম্পে পিচ করে অফ স্টাম্পের বাইরে গেছে। সেটিও প্রচণ্ড গতিতে। ওই দুই স্পেলে ১১ ওভার করেছিলেন, ১৩ রানে নিয়েছিলেন ২ উইকেট। ওই ৬৬ বলের ৪৮টি খেলেছিলেন শচিন। কিছু ছেড়েছেন, কিছু ব্লক করেছেন, অল্পের জন্য ব্যাটের কানা নেয়নি কয়েকটি। আরেকপাশে ছিল মর্কেলের তোপ। হাল না ছেড়ে, মাথা নিচু করে উইকেটে পড়ে থেকেছেন শচিন। পরে কাজে লাগিয়েছেন।

স্টেইন ইনিংসে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। শচিন করেছিলেন ৪৬৫ মিনিটে ১৪৬। ওই দুই স্পেলে স্টেইন-শচিনের সেই লড়াই সম্ভবত আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা মুখোমুখি লড়াই।

শচিনের শেষ টেস্ট সেঞ্চুরি সেটিই। পরে ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত টানা ৪০ ইনিংসে সেঞ্চুরি পাননি, যা তার টেস্ট ক্যারিয়ারের দীর্ঘতম খরা।

  • বীরেন্দ্র শেবাগ (ভারত)

২০১, গল ২০০৮, প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা

দল করেছে ৩২৯, শেবাগ একাই ২০১। দলের আর কেবল দুই জন দুই অঙ্ক ছুঁতে পেরেছিলেন। ইনিংসটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল অবশ্য অন্য জায়গায়, অজান্তা মেন্ডিসের বলে তখন চোখে আঁধার দেখছে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। তার রহস্যের কোনো কূল কিনারা তারা পাচ্ছিল না। কিন্তু শেবাগ ছিলেন ভিন্ন জগতে, মেন্ডিসকে উড়িয়েছেন, মুরালি-ভাসকে গুঁড়িয়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত আউট হননি। ক্যারিং দা ব্যাট থ্রু আউট দা ইনিংস, ২৩১ বলে অপরাজিত ২০১।

সেরা দশের পর ‘অনারেবল মেনশন’ আরও এক ডজন। সেরার সিরিয়াল অনুযায়ী নয়, সাল অনুযায়ী আগে-পরে ইনিংসগুলি সাজাচ্ছি।

  • শচিন টেন্ডুলকার (ভারত)

১৩৬, চেন্নাই ১৯৯৯, প্রতিপক্ষ পাকিস্তান

  • সাঈদ আনোয়ার (পাকিস্তান)

১৮৮, কলকাতা ১৯৯৯, প্রতিপক্ষ ভারত

  • ব্রায়ান লারা (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

২১৩, জ্যামাইকা ১৯৯৯, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

  • মার্ক বুচার (ইংল্যান্ড)

১৭৩*, হেডিংলি ২০০১, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

  • নাথান অ্যাস্টল (নিউজিল্যান্ড)

২২২, ক্রাইস্টচার্চ ২০০২, প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড

  • মাইকেল ভন (ইংল্যান্ড)

১৮৩, সিডনি ২০০৩, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

  • ইনজামাম উল হক (পাকিস্তান)

১৩৮*, মুলতান ২০০৩, প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ

  • কুমার সাঙ্গাকারা (শ্রীলঙ্কা)

১৯২, হোবার্ট ২০০৪, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

  • অ্যাডাম গিলক্রিস্ট (অস্ট্রেলিয়া)

১৪৪, ক্যান্ডি ২০০৪, প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা

  • মার্কাস ট্রেসকোথিক (ইংল্যান্ড)

১৮০, জোহানেসবার্গ ২০০৫, প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা

  • মাহেলা জয়াবর্ধনে (শ্রীলঙ্কা)

১২৩, পি সারা ওভাল ২০০৬, প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা

  • ভিভিএস লক্ষ্ণণ (ভারত)

৭৩*, মোহালি ২০১০, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া

– ফেসবুক থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।