‘কাভি হা কাভি না’ ও একজন আন্ডাররেটেড কুন্দন শাহ

‘কাভি হা কাভি না’ – এই সিনেমাটা আমি দু’বার দেখেছি। সিনেমাটার নাম দেখে মনে হতে পারে, একটা মেয়ে একটা ছেলের সঙ্গে হ্যাঁ/না বলার প্র্যাকটিস করছে — আর এটা নিয়েই সিনেমা। সত্যি-সত্যি মনে হলে এটা তা না — এর বাইরে আরও অনেক কিছু আছে। এখানে মূলত লোকাল একটা গল্প, যার পরিষ্কার গাঁথুনি আছে। একটা স্বপ্নদৃশ্য দিয়ে গল্পের চক্র শুরু, এরপর নানা চড়াই-উতরাই। এভাবে একই জায়গায় নিয়ে এসে পরিচালক কুন্দন শাহ‌ একসময় দর্শকের মুখ-বরাবর ঠাণ্ডা পানির ঝাঁপটা মারেন।

প্রথমেই কুন্দন শাহ‌’র পরিচয় দিচ্ছি — তিনি সার্কাজমের ওস্তাদ ছিলেন। মারা গেলেন কিছুদিন আগে; কোনও এক অক্টোবরে। মারা যাওয়ার আগে তিনি পৃথিবীতে উনসত্তুর বছর কাটিয়ে গেছেন। তার জীবনের শুরুটা হয়েছিল ক্লার্কের একটা ছোট চাকরি দিয়ে। কিন্তু একসময় কুন্দন শাহ বুঝতে পারলেন, ক্লার্কের চাকরি নয় — ফিল্মমেকিং হল তাঁর প্রিয় বিষয়।

তিনি পুনের এফটিআইআই–এ ডিরেকশন নিয়ে পড়লেন। সেখানে পেলেন সাঈদ মীর্জা, বিধু বিনোদ চোপড়াদের। যদিও ছেলে নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে সিনেমা বানাবে — এই ভাবনাটা ওই সময় একদমই পছন্দ করেননি তার বাবা। বাবার অপছন্দের কারণেই হয়তো জীবদ্দশায় কুন্দন শাহ্‌কে সিনেমাতে কম, টেলিভিশনেই বেশি ব্যস্ত দেখা গেছে।

কুন্দন শাহর মৃত্যুর খবর শোনার পর, আমার কীভাবে যেন তার পরিচালিত ‘কাভি হা কাভি না’র মূল চরিত্র সুনীলের কথা মনে পড়েছিল। সিনেমায় দেখা যায় — সুনীল গেঞ্জি পড়ার সময় নাকে আটকে যাচ্ছে। পেপসি খাওয়ার সময় বাচ্চাদের মত অদ্ভুত শব্দ করছে। তাদের ছ’জনের একটা ব্যান্ড আছে, সেই ব্যান্ডের প্র্যাকটিসেও সে সময়মতো যেতে পারে না।

প্রতিদিনই দেরী হয়ে যায়। অথবা কেউ না-কেউ দেরী করিয়ে দেয়। কিন্তু সুনীলের মুহূর্তের মধ্যে গল্প বানানোর ক্ষমতা আছে। মিথ্যে তার সঙ্গে ছায়ার মত থাকে। সে একেকসময় একেকটা বলে দেরী হওয়ার ব্যাখ্যা দেয়। তারপর একটু পর নিজ থেকেই সত্যটা বলে ফেলে।

এই ভালো-খারাপের দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত হয় আনা নামের একটি মেয়ে। তার প্রতি একতরফা আগ্রহ সুনীলের। আগ্রহ শেষ হলে দেখা যায়, আনার কারণে সুনীল ব্যান্ডের বাইরে চলে গিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও সে বৃত্তে ঢুকতে পারছে না। আমার মনে হয়, পরিচালক কুন্দন শাহ‌’র নিজের জীবনও এমন। তিনি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন — কিন্তু এর বাণিজ্যকরণ দেখে বৃত্তে ঢুকতে পারেন নি।

স্কুল লাইফে প্রথমবার ‘কাভি হা কাভি না’ দেখে সুনীলের জন্য খারাপ লেগেছিল। মনে হচ্ছিল — সুনীলের বেদনা আমাকে বহন করতে হচ্ছে। যদিও দ্বিতীয়বার দেখার সময় আমি কোনও বেদনা বহন করিনি। সিনেমার স্ক্রিন-প্লে চিন্তা করে সোজা কুন্দন শাহ্‌’র ছবি খুঁজে বের করেছি। তিনি দেখতে সত্যিই ভদ্রলোকের মতোন ছিলেন।

মাজরুহ সুলতানপুরীর কলম চলেছে ‘কাভি হা কাভি না’ সিনেমার গানে। সঙ্গে যতিন-ললিত এর মিউজিক। পঙ্কজ আদভানী ছিলেন সহকারী লেখক হিসেবে। পার্শ্বচরিত্রে নাসিরউদ্দিন শাহ, অঞ্জন শ্রীবাস্তবের মতো অভিনেতারা আছেন। আছেন আশুতোশ গোয়ারিকরও। সেইসময় ছোট-খাটো চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটি যে একসময় ‘লাগান’ কিংবা ‘স্বদেশ’ এর মত সিনেমা বানাবেন — সেটা তখনও কেউ জানে না।

এছাড়াও আরেকটা ব্যাপার হলো — কুন্দন শাহ’র প্রথম সিনেমার নাম ‘জানে ভি দো ইয়ারো।’ এটা ১৯৮৩ সালের সিনেমা। এর খ্যাতি তাঁকে সারাজীবন মুড়ে রেখেছিল। তিনি যখন মারা গেলেন, সেদিনও পত্রিকায় শিরোনাম এসেছে—‘জানে ভি দো ইয়ারো ডিরেক্টর কুন্দন শাহ্‌ পাসেস অ্যাওয়ে।’

জানে ভি দো ইয়ারো

যারা ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ দেখেন নি — তারা একটা কাল্ট সিনেমা দেখা থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছেন। বলা হয়ে থাকে, কমেডি আর স্যাটায়ারের এমন মিশ্রণ এই সিনেমার আগে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা বলিউড দেখে নি। ‘জানে ভি দো ইয়ারো’তে ডেড-বডি চরিত্রে অভিনয় করা সতিশ শাহ‌ কিছুদিন আগে বলেছেন, ‘আমি আমার সফলতার জন্য কুন্দনকে ধন্যবাদ জানাই। তার আগে কেউ আমাকে বিশ্বাস করেনি। নাসিরুদ্দিন শাহ‌, আমি ও অন্যরা সিনেমার লাইনে সুদর্শন বলতে যা বোঝায় —তা ছিলাম না। কিন্তু কুন্দন আমাদের মধ্যে অন্য কিছু দেখেছিল।’

সতিশ শাহ‌’র এই কথা মিথ্যা না। ‘কাভি হা কাভি না’তে তার মুখে একটা চমৎকার সংলাপ আছে। গল্পে তিনি আনা মেয়েটার বাবা। দৃশ্যে দেখা যায় — আনা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মুষড়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ভালো না-বেসেও সুনীলের সঙ্গে বিয়েতে রাজি হয়। প্রপোজাল নিয়ে সুনীল আসে আনার বাড়ি। এই সময় আনার বাবা সুনীলকে বলে উঠেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত, তুমি ভেতরে আসার জন্য দরজাকে পছন্দ করেছো। জানালা দিয়ে আসো নি।’

রঞ্জিত কাপুরের সংলাপ এমনিতেই ভালো; ‘জানে ভি দো ইয়ারো’তেও তিনি এই কাজটি করেছিলেন। যার কারণে জীবনের প্রথম সিনেমাতেই কুন্দন শাহ্‌ জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় সিনেমা ‘কাভি হা কাভি না’ এর দশ বছর পরের কাজ। এই সিনেমার গীতিকার ও কম্পোজার দুই জেনারেশনের মানুষ। যাদের নিয়ে গল্পটা ঘুরছে তারা নতুন। আর যারা তাদের সঙ্গে আছেন, তারা অভিজ্ঞ সব অভিনেতা। তাঁরা কঠিন বাঁধনে নতুনদের জড়িয়ে রেখেছেন। তা না হলে এই আন্ডাররেটেড সিনেমা কিছুটা হলেও ঝুলে যেতো।

মাঝখানে নয় কি দশ বছর বিরতির সময় কুন্দন শাহ টিভির জন্য কিছু কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে আছে কার্টুনিস্ট আর কে লক্ষ্মণের চরিত্র নিয়ে ‘ওয়াগলে কী দুনিয়া।’ সেখানে অভিনয় করেছিলেন অঞ্জন শ্রীবাস্তব ও শাহরুখ খান। এর পরেই তিনি শাহরুখ খানকে নিয়ে ‘কাভি হা কাভি না করেন। যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তারা জানেন, সুনীল চরিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা পারফর্মেন্সের একটি। ওই সময় রিলিজের আগেই সিনেমাটি ফিল্মফেয়ারের জুরি বোর্ডকে দেখানো হয়েছিল। তারা শাহরুখ খানকে তখনই এর জন্য ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড দেন।

ওয়াগলে কি দুনিয়া

এ ব্যাপারে পরিচালকের নিজস্ব ভাষ্য, ‘সিনেমায় একটা গানে (আনা মেরে পেয়ার কো) শাহ্‌রুখকে একটা ট্যাক্সি থেকে আরেকটা ট্যাক্সিতে কয়েকবার লাফ দিতে হয়, এবং এটা তাকে করতে হয় আনার দিকে তাকিয়েই। আমরা দৃশ্যটা এক শটেই নিয়ে নিই। পরবর্তীতে আমি শাহ্‌রুখকে জিজ্ঞেস করি, সে এটা কীভাবে ম্যানেজ করেছে? শাহ্‌রুখ বলেছিল,—‘আমি আমার সুযোগগুলো গ্রহণ করছি।’

এই একই কথা পরিচালক কুন্দন শাহ্‌’র জন্যও সত্যি। তিনি ‘কাভি হা কাভি না’ সিনেমার জন্য যে বাজেট পেয়েছিলেন, তা ছিল খুব অল্প। এ কারণে শুধু গোয়া’তে শুট করার কথা থাকলেও, তাকে মুম্বাইতে এসে কাজ শেষ করতে হয়েছে। শেষের দিকের একটা ইন্টারভিউতে তিনি এ প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন, তার সারমর্ম হলো — ‘কাভি হা কাভি না’কে তার খরচ তুলতে ১২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিলো।

জীবদ্দশায় কুন্দন শাহ্‌ ব্যাক ব্রাশ করতেন। তার মাথার সমস্ত চুল ছিল সাদা। গায়ের রঙ কালো, প্রায়ই এক রঙা শার্ট পরতেন। চোখে থাকতো সাধারণ ফ্রেমের চশমা। মোটামুটি চুপচাপ চেহারা। এই চুপচাপ মানুষের শেষের দিকের কয়েকটা সিনেমা চলে নি। তিনি মোটামুটি ব্যর্থ হয়েছিলেন। ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ আর ‘কাভি হা কাভি না’ এই মূলত তার ছবি। কিন্তু এরপরেও তিনি স্পষ্টবাদী ছিলেন।

মৃত্যুর তিন বছর আগের এক ইন্টারভিউতে তিনি বলেছেন, ‘এখন শাহ্‌ রুখের অভিনয় প্ল্যাস্টিকের মতো। প্রতিটি দৃশ্যে তার ম্যানারিজম।’ আরও জানিয়েছেন, ‘এখন একজন অভিনেতা ফাঁদে পড়ে, যখন তার সিনেমা ১০০ কোটির ব্যবসা করে না। তাই তাদের যা বলে দেয়া হয়—তাই করতে হয়।’ এটা সত্যি যে ‘কাভি হা কাভি না’তে ওই অর্থে বাণিজ্যকরণ নেই। তারপরেও ভালবাসার সিনেমায় যে-সব উপাদান থাকা উচিত, তার প্রতিটিই এই সিনেমাতে পাওয়া যায়।

১৯৯৪ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে রিলিজ হওয়া এই সিনেমার বয়স সম্প্রতি দুই যুগ হল। আমি এ উপলক্ষে সিনেমাটি দ্বিতীয়বার দেখলাম। ড্রামার কুশলী ব্যবহার থাকলেও ‘কাভি হা কাভি না’ এখনও পুরনো হয় নি। বেশ চেনা যায়। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড অর্থহীন এর ‘বয়স’ নামে একটা কম-শোনা গান আছে।

সেখানে বলা হয়, ‘তোমায় আমি চিনি ছেলে,অনেক–দিনের চেনা।’ এই সিনেমার সুনীল হল সেই-জন, যাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। অস্বীকার করার উপায় নেই—প্রায় সব ছেলেকেই এই গল্পের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এজন্য যারা এখনও সুনীলকে চেনেন না, তাদের চিনে নেবার আহবান রইল।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।