বর্ণবাদ, কলপ্যাক ও দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট

১৯৪০ দশকের শুরু থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পার্টি তাঁদের রাজনৈতিক স্লোগানে একটি শব্দ ব্যবহার করে আর সেটি হলো আপার্টহাইট” বা ‘বর্ণবাদ’। কিন্তু এই বর্ণবাদি প্রথা আফ্রিকায় চলছিলো তারও বহু আগে থেকে।

ইতিহাস খুঁজতে যেতে হবে অনেক পেছনে।

১৬৫২ সালে ‘ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ আফ্রিকার কেপটাউনে তৈরী করে কেপ কলোনি। ১৭৯৫ সালে সেই কেপ কলোনি দখন করে ব্রিটিশরা। সেই কেপ কলোনিতে ডাচ আর ব্রিটিশদের সাথে বুয়োরাও থাকতো আর সেই বুয়ো এর মানে হলো চাষী। তাদের ভাষা তৈরী হয় ডাচ আর জার্মান ভাষা মিলে আর এর নাম হয় আফ্রিকান্স ভাষা।

পরে তাঁরা ব্রিটিশদের চাপে কেপ কলোনি থেকে চলে যায় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তরাংশে একটি বুয়োর রিপাবলিক তৈরি করে। ১৮৬৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার খনিতে হীরে ও ১৮৮৪ সালে স্বর্ণ পাওয়া যায়। আর এইসব সম্পদ আহরণের জন্য বাহিরের লোক আসা শুরু করে। এর কিছুকাল পরে দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ আদিবাসী, ব্রিটিশ শাসক শ্রেনি ও ডাচ-বুয়র দের মধ্যে ত্রিমূখি লড়াই আরম্ভ হয়।

ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। সাদাদের ন্যাশনাল পার্টি আর কালোদের আফ্রিকান ন্যাশনাল পার্টি। ১৯৪৮ সালের নির্বাচনে সাদাদের ‘ন্যাশনাল পার্টি’ জয় পায় এবং তারা একটি নীতি নেয়। আর সেই নীতি হলো আপার্টহাইট বা বর্ণবৈষম্য। আফ্রিকানদের ভাগ করা হয় চার ভাগে – সাদা, কালো, বর্ণময় আর ইন্ডিয়ান।

এই বর্ণবাদের ছোবল এসে পড়ে ক্রিকেটাঙ্গনেও। দক্ষিন আফ্রিকার জাতীয় দলের পাশাপাশি তৈরী করা হয় দক্ষিন আফ্রিকা কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয় দল। সেই দলের খেলোয়াড়রা আজ কে কোথায় আছে কেউ জানেনা, হয়তো নিজের দেশের মানুষরাই জানেনা। ততকালীন আফ্রিকান সরকার এই বিষয়টাকে নিয়ে যায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। ঘোষণা দেয় তারা শুরু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ডের সাথে।

অর্থাৎ, তাঁরা শুধু শ্বেতাঙ্গদের সাথে খেলতে চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল সেটা মানেনি। ফলাফল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞা। দীর্ঘ বাইশ বছর পর ভেঙেছিলো সেই নিষেধাজ্ঞা। আর এই বাইশ বছরে হারিয়ে গিয়েছিলো একসময়ের আফ্রিকান লিজেন্ড গ্রায়েম পোলক আর ব্যারি রিচার্ডসদের। তবে মজার বিষয় এই বাইশ বছর পরে যখন আন্তর্জাতিক মাঠে নামে দক্ষিণ আফ্রিকান দল কেউই বলবেনা যে তারা পিছিয়েছে, কারণ নিষেধাজ্ঞার পর প্রথম বিশ্বকাপেই তারা হয়েছিলো সেমিফাইনালিস্ট। এরপর সব ঠিকঠাক চলছিলো, কিন্তু কোপটা পড়ে ২০১৬ সালে।

‘তোমার গায়ের রঙ কি?’ – ২০১৬ সালে ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা (সিএসএ) একটি আইন পাস করেন আর সেটি হলো ‘জাতীয় দল সবার’। বর্ণপ্রথা বিলোপে এই আইন নেয়া হলেও জাতীয় দলে আসার আগে প্রথম প্রশ্ন হতো ওইটাই।

খুবই সহজ একটি আইন। আপনি দেখলে মনে করবেন এইটা কোনো আইন হলো, স্বাভাবিক বিষয়। আর আইনটা ছিলো, প্রতি মৌসুমে দলে অন্তত পাঁচজন সাদা চামড়ার খেলোয়াড় রাখতে হবে। তো আসুন এইবার সেই আইনের মারপ্যাচের খেলাটা দেখে আসি৷ বাকি যে ছয়জন খেলোয়াড় বাকি থাকে সেখানকার চারজন খেলোয়াড় হতে হবে শ্যামলা বর্ণের আর দু’জন হতে হবে কালো বর্ণের। আর প্রতি ম্যাচের আগে কোচ-ক্যাপ্টেনের আলোচনা থাকতো, ‘কালো-সাদার অনুপাত ঠিক আছে তো?’

২০১৫ সালের সেমিফাইনালের কথা মনে আছে? সেদিন কাইল অ্যাবটের পরিবর্তে মাঠে নামেন হাফ ফিট ফিল্যান্ডার। গুঞ্জন উঠেছিলো সেদিন কালো আর সাদার অনুপাত মেলানোর জন্যই নাকি এই পরিবর্তন করা হয়। যদিও তখন সাদা-কালো অনুপাতের নিয়ম ছিল না, কিন্তু বোর্ড সভাপতি হারুন লরগাতকে নাকি চাপ প্রয়োগ করা হয় ফিল্যান্ডারকে খেলানোর। ফিল্যান্ডার খেললেন কিন্তু অন্যদিকে কাইল অ্যাবট আফ্রিকার খেলা বাদ দিয়ে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে।

সাউথ আফ্রিকানরা লোয়ার লেভেল থেকে প্লেয়ার গড়ে তোলে, কিন্তু জাতীয় দলের ঢোকার আগ মুহুর্তে না করে দেয়। কারণ, ২০১৫ সালের প্রণীত আইন অনুযায়ী আফ্রিকান দলে জায়গা পাবেন তিন ধরনের প্লেয়ার – সাদা (৫), কালো(২) আর শ্যামবর্ণ (৪)। আর ঠিক উল্টোটা হচ্ছে আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে। তাদের ঘোরায়া ক্রিকেটের মোট ছয়টি দল। আর এই ছয়দলের খেলোয়াড় ৬৬ জন।

মজার বিষয়, প্রতি দলে ৬ জন করে মোট ৩৬ জন কৃষ্ণাঙ্গ প্লেয়ার বিপরীতে ৩০ জন শ্বেতাঙ্গ। যারা অনূর্ধ্ব -১৯ এ খেলেন তারা সেটি শেষ করে পাড়ি জমান ইংল্যান্ড কিংবা অন্যদেশে। আর মাঝখানে বিশে দাঁড়ানো মানুষেরা খেলে যাচ্ছে কোনোদিন জাতীয় দলে খেলার আশায়, কেউ পারছেন কেউ হয়তো পারছেন। আর যাদের ত্রিশ পার হলো তারা কোই গেলো? আবার এরমাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কলপ্যাক চুক্তি।

একসময় নেলসন ম্যান্ডেলা আন্দোলন করেছিলেন এই বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে, হয়েছিলেন ইতিহাসের অমর৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত থামেনি এই প্রথা। ক্রিকেটকেই কলুষিত করেছে এটা, হারিয়ে যান দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক গ্রেট।

  • কলপ্যাক কি আফ্রিকানদের ক্রিকেটের অভিশাপ?

শুরুতেই কয়েকটা প্রশ্ন আর উত্তর জেনে নেই –

প্রশ্ন ১: কলপ্যাক রুল কি?

উত্তর: ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইইউ-র সদস্য দেশগুলির নাগরিকরা অন্য যে কোনও সদস্য রাষ্ট্রে কাজ করার অনুমতি পান। ‘কোটোনু অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অ্যাসোসিয়েসন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ইইউ-র সঙ্গে সমঝোতা করা ৭৮টি দেশের সদস্যরাও এমন সুবিধা কেন পাবেন না, এ নিয়ে ‘ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ জাস্টিস’-এ যান স্লোভাক হ্যান্ডবল প্লেয়ার মারোস কলপ্যাক। (পরবর্তীতে অবশ্য স্লোভাকিয়া ইইউ-র অন্তর্ভুক্ত হয়) এরপর থেকে ইইউ-র নাগরিকদের মতো সমঝোতা স্বাক্ষরকারী দেশগুলির নাগরিকরাও সমান স্বাধীনতা পান কাজ ও চলাচলের ক্ষেত্রে। কলপ্যাক এই রুল দিয়েই ঢুকে গেছেন ইতিহাসে।

প্রশ্ন ২: ক্রিকেটে কলপ্যাক?

উত্তর: ইইউ-র সঙ্গে সমঝোতা আছে এমন দেশগুলির মাঝে ক্রিকেটে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডও। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকান বাঁহাতি স্পিনার ক্লডি অ্যান্ডারসন প্রথম কলপ্যাকে যাওয়া ক্রিকেটার।

প্রশ্ন ৩: কলপ্যাকে গেলে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়তে হয়?

উত্তর: হ্যাঁ। তবে চাইলে কলপ্যাক বাদ দিয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে পারেন তারা। কলপ্যাকে খেললে যে দেশ থেকে ক্রিকেটার গেছেন, সে দেশেও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পারেন তারা। তবে শর্ত হচ্ছে- খেলতে হবে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট মৌসুম ছাড়া অন্য সময়

কলপ্যাক ডিলে ভিনদেশে পাড়ি জমান প্রোটিয়ারা।

সেদিন ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয় তিনজন। কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাত আর অধিনায়ক ডু প্লেসিস। সবার থেকে ঠান্ডা রয়েছেন প্লেসিস। কারণ তিনি কলপ্যাক সম্পর্কে ভালোই জানেন। তার সুযোগও হয়েছিলো ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার। ওহ সেদিনের সেই সংবাদ সম্মেলনের কারণ ছিলেন কাইল এবট আর রাইলে রুশোর কলপ্যাকে হ্যাম্পশায়ার খেলতে যাওয়া। ক্রিক এক্স নামের এক এজেন্সি মাধ্যমে গিয়েছিলো এবট আর সেই মাধ্যমে আগেই গিয়েছিলেন ডু প্লেসিস। র‍্যামসবটম ক্রিকেট ক্লাব থেকে লিভারপুল ক্রিকেট ক্লাব হয়ে নটিংহ্যাম লিগ খেলেছেন ডু প্লেসিস

নটিংহ্যামশায়ারের দ্বিতীয় একাদশের হয়ে এক ম্যাচে প্লেসিস করলেন ডাবল, এরপর টানা তিনটে শতক। এরপর নটিংহ্যামশায়ার একটি প্রস্তাব দেয়, আর সেটি হলো তাদের হয়ে তিন বছর পেশাদার ক্রিকেট খেলা। তবে সাথে একটা শর্ত ছিলো যে, যদি ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয় তাহলে তাকে সেটাই করতে কবে। কিন্তু ডু প্লেসিস মানলেন না সেটা। কারণ তিনি চেয়েছিলেন সাউথ আফ্রিকার জাতীয় দলের হয়ে খেলতে।

কলপ্যাকে যাওয়া ক্রিকেটারদের কাউন্টির দলগুলো যেভাবে আর্থিক মূল্য দেয়, আফ্রিকান ঘরোয়া লিগের দলগুলো সেটা দিতে ব্যার্থহয়। আফ্রিকান এক ক্রিকেটার তিনি এখন ‘অফিসের সিলিং এবং পার্টিশন স্লাপায়ার’ হিসেবে কাজ করেন। তবে তিনি ছিলেন আফ্রিকান ঘরোয়া লিগের সেরা ক্রিকেটারদের একজন। সেই পেসার ডেল ডিভ এমন একটা আর্থিক চুক্তির প্রস্তাবনা পান, যেটা তাঁর জন্য যথেষ্ট ছিলনা। ফলাফল মাত্র ২৫ বছর বয়সে অবসরে যেতে হয় তাকে। আর তিনি কলপ্যাকে গিয়ে ক্রিকেটে টিকে থাকার চেষ্টা করেন নি, করলে হয়তো অন্যরকম হতো।

একদিকে বর্ণবাদ আরেকদিকে কলপ্যাক। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আরেকদিকে অপেক্ষাকৃত নিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অনুসরণ করেছেন কেভিন পিটারসেন, জোনাথন ট্রট বা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেয়া কিটন জেনিংসদের। ইংল্যান্ডে গিয়ে এক নিশ্চিত ভবিষ্যতে পা দেন তারা আর অপরদিকে আফ্রিকা হারাতে থাকে তাদের অমূল্য সম্পদদের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।