পকেটে ৩৫০০ টাকা, কলকাতার বাদ্যের সাথে কাশীর হাওয়া

‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ দেখে কাশী যাবার জন্য মন কেমন করে উঠেছিল যেন, কৈশোরে। কিন্তু মনে হত, ওসব জায়গা হয়ত কখনোই যাওয়া হবে না।

এখানে গঙ্গার ধারে স্নানের দৃশ্য নিয়ে গত শতকের প্রথম দিকে ডকুমেন্টারি আছে, দেখে মনে হত, খুব একটা তো পাল্টায়নি। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ সানাই বাজাচ্ছেন, গঙ্গার উপর দিয়ে নৌকায়, সন্ধ্যা নামছে, এই ব্যাপারটা যখন আরেকটা ডকুতে দেখি, শিহরিত হয়েছিলাম। আঘোরি সাধুদের নিয়ে ডকুমেন্টারি তো আছেই। উপন্যাসের পাতায় বয়স হলেই কেউ চলে যাবে কাশী, এরপর হারিয়ে যাবে। একটা রহস্যময় জায়গা যেন।

আর কলকাতা। গল্পের পাতায় চেনা হয়ে গেছে কফি হাউস, কলেজ স্ট্রিট, গড়ের মাঠ কিংবা ধর্মতলা। দেশভাগ কিংবা সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন। যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, কোলকাতা গেছি বাবার সাথে। শহরটা ওভাবে ঘুরে দেখা হয়নি সেবার, আফসোস ছিল। কলকাতার পূজার অনেক নামডাক শুনেছি। এবার সুযোগ হয়ে গেল।

ষোল তারিখ রাতে গাড়িতে উঠলাম, অনেক জ্যাম পেরিয়ে বেনাপোল পৌঁছলাম বিকেলের দিকে। শুভেন্দু ওর বাড়িতে, ঝিনাইদহতে ছিল। ওখান থেকে যোগ দিল আমার সাথে। সীমান্ত পার হলাম।

যশোর রোড আমার বরাবরই ভালো লাগে। বিশাল বিশাল রেইনট্রি গাছ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যশোরে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের একটা ঘাটি ছিল। ওখান থেকে কোলকাতা অব্দি বানানো, এই যশোর রোড। যুদ্ধের সময় লেখা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, এলেন গিন্সবার্গের। অদ্ভুত লাগে।

ইচ্ছে করেই হাঁটলাম অনেকক্ষণ। পূজার বাদ্য চলছে। সাউন্ডবক্সে উৎকট গানের জায়গায় বাজছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান। একটা কেমন যেন আমেজ এসে লাগল বুকে।

একটা ভ্যানে উঠে এলাম মতিগঞ্জ বাসস্ট্যাণ্ড। আমরা সরাসরি কলকাতা যাচ্ছি না। আগে উঠব শুভেন্দুর দাদার বাসায়, চাকদহতে, নদীয়া জেলায় পড়ে জায়গাটা।

চাকদহ জায়গাটা খুব ভালো লেগে গেছে কেন যেন। এর নামের পেছনে একটা কাহিনী আছে। পুরাণ মতে, ভাগীরথী (গঙ্গা) নদী আনার সময় রথের চাকা এই জায়গাটায় এসে চেপে যায়। ফলে যেই দহ বা গর্তের মত তৈরী হয়, সেই ‘চক্রদহ’ থেকেই চাকদহ বা চাকদা।

রাতে বের হলাম শহরে। ১৮৮৬ সালে পৌরসভা বানানো, বোঝা যায়, বেশ পুরানো শহর।

পূজা চলছে, মফস্বল তো, একটা আটপৌরে ভাব। সবজায়গায় লাইটিঙ, মানুষজনের ভেতর আনন্দ। কানে ভেসে আসছে রবিঠাকুরের গান, তোমার খোলা হাওয়ায়…। খানিকটা দূরে পুরানো দিনের হিন্দি গান, মুহম্মদ রাফির গলায়। মরা গাঙের পাড়ে বসলাম। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ। চা, অন্ধকার, মানুষ, আলো, মরিচবাতি, খাবারের দোকানগুলোতে ভিড়। বিরিয়ানি, মিষ্টি, রোল দেদারসে চলছে।

পরের দিন সকালে গঙ্গার পাড়ে গেলাম। কাশফুলে শাদা হয়ে আছে পাড়। বসে থাকলাম। একটা শান্ত নিভৃত জায়গা, আর বাতাস। এরপর রুমে এসে তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য, কোলকাতা।

চাকদা রেলস্টেশনে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকলাম। আন্তঃনগর লোকাল ট্রেন। উঠে একটা সিট পেলাম। এরপর শুরু হল খেলা।

এত মানুষ, এত মানুষ, এত মানুষ। ভিড়ের এমন ঝক্কি দেখে পিলে চমকে গিয়েছিল। ভিড় তো ঢাকাতেও আছে। কিন্তু এমন ভিড়, স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াচ্ছে কিছুক্ষণের জন্য, মানুষের স্রোত সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে নামছে, বিপরীত স্রোত আবার উঠছে। এসব ট্রেনে টিকেটের বালাই নেই, কেউ চেক করে না, তাই কেউ কাটেও না।

নামলাম শিয়ালদা স্টেশনে। নেমে বিরানি পটকালাম। সেইখান থেকে হাঁটা শুরু মহাত্না গান্ধী রোড ধরে সোজা। পথে পড়ল অনেক পুরানো দালান, উত্তর কলকাতা। কলেজ স্ট্রিট, প্রেসিডেন্সী, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ান কফি হাউস। পূজায় কেমন যেন নেতানো শহর। পাশে বিদ্যাসাগর উদ্যানে মন্দির, ভিড় সেদিকমুখী।

জোড়াসাঁকোর ওদিকটায় হাঁটলাম। কলকাতার মল্লিক বাড়ি নিয়ে শুনেছি আগে, মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে। এবার নিজ চোখে দেখলাম,বাইরে থেকে। বিশাল ব্যাপারস্যাপার। ভেতরে ঢুকতে পারিনি, ব্যক্তিগত মালিকানা তো। বাড়িটার ‘মার্বেল প্যালেস’ নামেও পরিচিতি আছে।

রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক ১৮৩৫ সালে বাড়িটা বানান। এর ভেতর নাকি অসাধারণ, ঢুকতে না পারার আফসোসটা থাকবে। এর ভেতর শিল্পকর্মের এক অসাধারণ সংগ্রহ আছে। পিটার পল রুবেন্স কিংবা স্যার জশুয়া রেনল্ডসের মত শিল্পীদের পেইন্টিং আছে এইখানে। জাঁকমক আভিজাত্য এইখানে অলংকৃত।

রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে থাকি। এই গলি ঐ গলি করে উদ্দেশ্যবিহীন। বনেদি বাড়ির পূজাগুলো আমার কাছে লেগেছি হৃদ্যতাহীন। কোলকাতার চেয়ে বরং আমার চাকদাকে ভালো লেগেছে বেশি।

পুরানো ঘিঞ্জি গলিগুলো, একেকটা রাস্তার নাম, গন্ধ, দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যে গড়ায়। আমরা কটন স্ট্রিটে গিয়ে থামি। আমাদের রাতের থাকার জায়গা দেখতে হবে। এইখানে পাই ‘গুরুদুয়ারা ছোটা শিখ সঙ্গত’। আমরা অনুরোধ করে রাতে থাকার জায়গাটা জুটিয়ে ফেলি।

অনেক পুরানো দালান এই গুরুদুয়ারা। দোতলায় প্রার্থনার জন্য বিশাল ঘর। যেতেই প্রসাদ দিল, খেলাম।

তিনতলায় একটা ফাঁকা ঘর পড়ে আছে। আমাদের থাকতে দিল। শিখ ধর্মের এই ব্যাপারটা ভালো, তাদের গুরুদুয়ারায় তারা সব ধর্মের লোককে থাকতে দেয়। অমৃতসরেও এই ব্যবস্থা আছে।

রাতের কলকাতায় ফের হাঁটাহাঁটি। যাকারিয়া স্ট্রিট থেকে চাঁদনীচক, মুসলিম আর ঊর্দু বোল। খেলাম রয়াল ইন্ডিয়ান হোটেলে। বেশ খানিকক্ষণ হাঁটার পর মেট্রোতে করে ফেরা। প্রথম দেখা বধূর মত, আমি কোলকাতায় তখন মোহাচ্ছন্ন।

সকালে উঠলাম বেশ আগে। নাখোদা মসজিদ আগের রাতে দেখেছি বাইরে থেকে, সকালে এসেছি ভালো করে দেখতে। মুঘল স্থাপত্যের অনুকরণে এই মসজিদটা বানানো হয় ১৯২৬ সালে, যাতে প্রায় দশ হাজার মুসল্লি একসাথে নামাজ পড়তে পারে। বানান আব্দুর রহিম ওসমান নামের এক জাহাজ ব্যাবসায়ী। ‘নাখোদা’ মানে কিন্তু নাবিক।

পরে হাঁটতে বেরুলাম আবার নাস্তা সেরে।।হাওড়া ব্রিজের নিচে দুপুরের পরে পেলাম, ফুলের বাজার। নাম ‘বড়বাজার ফুল মার্কেট’। পূজার সময়, নোংরা জায়গাটায় ফুলের পাইকারি বাজার, সেই চলছে, কোন ফুলটা নেই আসলে। এর সাথে আছে নানান রকম পাতা আর ধানের গোছা। পূজায় সরগরম একেবারে।

আর্মেনিয়ান চার্চ ঢাকায় পেয়েছি, কোলকাতাতেও পেলাম। গঠন অনেকটা একই। ঢাকায় আর্মেনিয়ানরা এখন না থাকলেও কোলকাতায় এখনও আছে।

সেইখান থেকে ডালহৌসি হেঁটে গেলাম। রাইটার্স বিল্ডিং দিয়ে রাজভবন হয়ে ধর্মতলা। এইখানে ব্রিটিশ ভারত শাসনের জন্য বিশালাকার দালান সব। বঙ্গভঙ্গের রদের পর তো দিল্লী চলে গেল রাজধানী। তার আগে পর্যন্ত ব্যাপারস্যাপার এখান থেকেই চলত, ছড়ি ঘোরানো হত।

এরপর নিউমার্কেট আর এসপ্লানেড। এইখানেও চৌরঙ্গি, শহীদ মিনার, ময়দান, প্রকাণ্ড সব ভিক্টোরিয়ান দালান। রাতে কাচ্চি খেলাম আমিনিয়াতে।

সেদিন দশমী, আমাদের ভাষায় ‘বিসর্জন’, ওদের ভাষায় ‘ভাসান’। ট্রাকে করে ঢোল সানাই বাজিয়ে বাজিয়ে সব যাচ্ছে গঙ্গায়, বিসর্জনে। শহরে উৎসব ভাব।

রাতের হাওড়া অদ্ভুত। গঙ্গা দেখা যায় ব্রিজ থেকে, রাতের কলকাতা। এই ব্রিজ নিয়েও অনেক গল্প শুনেছি। ব্রিটিশ আমলের সে ব্রিজ এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে। এরপর রেইলস্টেশন হয়ে আমাদের উদ্দেশ্য বেনারস।

সাতটা চল্লিশ মিনিটে কলকা মেইল ট্রেন, স্লিপারের টিকেটের গতি করতে পারলাম না। অগত্যা জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়লাম।

একবার কাকে যেন বলতে শুনেছি, কেউ যদি জীবন নিয়ে অনেক হতাশ হয়ে পড়ে, জগৎ সংসার নিয়ে কোনো আশা ভরসা নেই, সে যেন ইন্ডিয়ার এইসব ট্রেনে উঠে পড়ে।

বিহারের বিভিন্ন শহর হয়ে যায় এই ট্রেন। প্রচুর বিহারি উঠেছে। একজন তো বলল, পাটনার চেয়ে তো নোংরা শহর নাই কোথাও। ওইখানে গেলে দু’দিনের মধ্যেই চিকুনগুনিয়া হওয়াটা নিশ্চিত।

জেনারেল কম্পার্টমেন্টে এই ভিড়ে টিকেট চেকার উঠতে সাহস করে না। যেহেতু কেউ চেক করে না, তাই কেউ টিকেট কাটেও না।

মুঘলসরাই পৌঁছলাম ভোর সাড়ে ছটায়। এটা উত্তর প্রদেশের একটা রেইল জংশন, ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশরা বানায় এটা। এখান থেকে বেনারস মাত্র ১৬ কি.মি. দূরত্বের। শের শাহের বানানো গ্রাণ্ড ট্রাঙ্ক রোডের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মুঘল সরাই, যা পূর্বকে উত্তরের সাথে যোগ ঘটিয়েছে। এখন অবশ্য নাম মুঘলসরাই নেই, এখনকার নাম হল পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় রেইল জংশন। স্টেশন থেকে বের হয়েও ছোট গাড়ি মিলল, পঁচিশ রুপি নিল, বেনারস যাবে।

নেমে নাস্তা সেরে ফের টেম্পু করে গেলাম, দশ রুপি দিয়ে, দশাশ্বমেধ ঘাট। এই ঘাটটাই বেশি জনপ্রিয়। আমরা ফের থাকার জায়গা খুঁজতে লাগলাম। আশ্রমে কিংবা ধর্মশালায় থাকার জায়গা খুব ভাল, কিন্তু থাকা হল না। থাকলাম বিশ্বনাথ মন্দির থেকে একটু ভেতরে, বিশ্বনাথ পেয়িং গেস্ট হাউসে। চারশো টাকায় দুজনের রুম মিললো।

তো এই শহরটা নিয়ে এবার বলা যাক। বেনারস, ভারানাসী বা কাশি যে একই বস্তু, এটা অনেক পরে জেনেছি। ‘কাশি’ শব্দটা এসেছে ঋকবেদ থেকে, সংস্কৃত ‘কাশ’ অর্থ হল আলো। কাশি শব্দটার অর্থ দাঁড়ায় তাহলে, ‘আলোর শহর’।

প্রায় তেইশ হাজার মন্দির আছে এই বেনারসে।

হিন্দু পুরাণে এই কাশির তাৎপর্য অনেক। শিব একবার ব্রহ্মার সাথে যুদ্ধে পাঁচ মাথার একটা কেটে ফেলে। এই কাটা মস্তক হাতে রাখা কিংবা গলায় ঝুলানো যুদ্ধজয়ের প্রতীক। ব্রহ্মাকে অপমান করার জন্য শিব সবসময় সেই কাটা মাথা নিজের হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, কিন্তু এই কাশিতে এসেই কিনা তা হাত থেকে পড়ে হারিয়ে যায়। সে থেকেই কাশি খুব পবিত্র একটা জায়গা।

বেনারসের সভ্যতা আসলেই অনেক প্রাচীন। এখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া নিদর্শন অনুযায়ী খ্রিস্টের জন্মেরও ১৮০০ বছর আগে মানব সভ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। হিউয়েন সাঙ সাতশ শতাব্দীতে এসে এই শহরকে বর্ণনা করেন ধর্ম ও শিল্পকর্মের কেন্দ্ররূপে। তিনি এখানে তিরিশটা মন্দির থাকার কথা বলেন।

এ এক জাদুর শহর। কবি তুলসীদাস এখানে বসে কবিতা লিখেছেন।

শিখধর্মের গুরু নানক ষোল শতকে এসে এখানে এসে এতটাই প্রভাবিত হন, শিখধর্মের জন্যেও এই শহরের তাৎপর্য আছে। এই শহরের কাছেই সারনাথে গৌতম বুদ্ধ তার প্রথম ধর্মোপদেশ বক্তৃতা দেন, প্রায় ৫২৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়ও গুরুত্ব পেয়েছে এই শহর। মুঘল আমলে আকবর এইখানে দুটো মন্দির তৈরী করে দেন, অর্থ খরচ করেন প্রচুর। ঠিক এর উল্টোটা করেন আওরঙ্গজেব, এইখানে অনেক মন্দির ভেঙ্গে ফেলেন, ধ্বংসযজ্ঞ চালান, একটা মসজিদ তৈরী করে দেন।

এরপরেই যেন এর পুনর্জন্ম হয়। বিভিন্ন হিন্দু রাজা প্রচুর পরিমাণে অর্থদান করতে থাকেন, এই শহর হতে থাকে উন্নত থেকে উন্নততর। ব্রিটিশ আমলে আবার ১৮৫৭ এর সিপাহী বিপ্লবের সময় এইখানে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, ভেঙে ফেলা হয় অনেক ঘরবাড়ি।

এই শহর নিয়ে যতই পড়ি, ঘোর লাগে। সেটা আরো বেড়ে যায় এইখানে এসে। সঙ্গীতের শহর, চিত্রকলার শহর, অতীন্দ্রিয়বাদের শহর। যেরকমটা দেখেছি সত্যজিতের ক্যামেরায়, এ যেন আরো বাস্তব, আরো ধোঁয়াশার। উঁচুনিচু চিপা গলি দিয়ে, অগোছালো জালের মত শহরের ভিতর হেঁটে গেলে, পুণ্যার্থীর ভেজা শরীরে হেঁটে গঙ্গাস্নান শেষে, ধুপের গন্ধ, মনে হয় প্রাচীনযুগে এখনো পড়ে আছি। সময়টা একটা চাকায় যেন অনেক পিছিয়ে গেছে, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যেন আশ্চর্যের সীমা থাকে না। বাড়িগুলো দুইতলা তিনতলা, আশ্রম, বোর্ডিং। দেয়ালে দেয়ালে চিত্রকর্ম, ভারতীয় ধাঁচের, দেব দেবী, কিংবা রাজকীয় ফরমের। মার্কিন মুলুকের লেখক মার্ক টোয়েনের মত করে বলতে ইচ্ছা করে – ‘Benares is older than history, older than tradition, older even than legend, and looks twice as old as all of them put together.’

দশাশ্বমেধ ঘাটে অনেক ভিড়, দুপুরের পর সেই ঘাট ধরে হেঁটে গেলাম আশ্বিঘাট পর্যন্ত। অনেক নোংরা এই গঙ্গা, তবুও এর পাশে এত নামের এত ঘাট, এত বৈচিত্র্যময় দালানের গঠন, দেখে গেলাম।

এরপর ফিরতে হবে যখন, হাতে বৈঠা টানা একটা নৌকায় উঠে পড়লাম, পঞ্চাশ রুপি করে দিলাম। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ নেই, কোনো তাড়া নেই যেন। অন্ধকার নেমে পড়তেই ঘাটের পাশে দালানগুলোতে আলো জ্বলে উঠল, গঙ্গার বুক থেকে যে তা দেখেনি, তার পক্ষে সেই সময়টা বোঝাবো কেমন করে জানি না। দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গা আরতি শুরু হয়ে গেছে।

এই আরতি দেখলাম খুব কাছ থেকে বসে। সপ্তাহের কোন দিন যেন হয়, হিসেবটা জানা নেই। এরপর আরতি শেষে যেদিকে বিকেলে গেছি, তার বিপরীত দিকে হাঁটলাম। এদিকেও অসংখ্য ঘাট। এসে পৌঁছলাম মণিকর্ণিকা ঘাটে।

হিন্দুধর্ম মতে, এই ঘাটে মৃতদেহ পোড়ালে মোক্ষলাভ ঘটে। দেখলাম গোটা সাত আটটা মড়া পোড়াচ্ছে। আগুনের তাপে মাঝে মনে হল গলে যাব যেকোনো সময়। এরপর আরেকটু এগিয়ে ঘাট থেকে উঠে পড়লাম উপরে।

অনেক পুরানো মন্দির। কাঠের আড়ৎ আছে, এইখানে। লোকজন তখনো মৃতদেহ আনছে। শ্মশানঘাটে যেমনটা থাকে, এইখানে প্রচুর আঘোরি সাধু। মড়া পোড়ানো ছাইগুলো নিয়ে পরে শরীরে মাখবে। একদিকে বসে মদ চালান করছে। ওদিকে গেলাম না।

এরপর বিভিন্ন অলিগলি হয়ে হাঁটতে লাগলাম। এটা ঠিক, গলিগুলো বেশ অপরিষ্কার কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

বেনারসের মিষ্টির কথা বলা দরকার। কয়েকটা দোকানে, অলিগলির ভেতর, মিষ্টি যা খেয়েছি, স্বর্গীয়। নানান পদের, নানান স্বাদের। দুপুর রাতে খাবার ইন্ডিয়ান থালি, ভাত রুটি নিরামিষ।

পরেরদিন ভোর পাঁচটায় উঠি আমি, একাই। রাস্তায় তখনো অনেক লোক। ঘাটে যেয়ে দেখি, আলো জ্বলছে, রাত থেকে যা জ্বলছিল। এরপর সব বাতি হুট করে নিভিয়ে দিল। অন্ধকার ফেটে একটু একটু করে আলো আসতে লাগলো।

সূর্যপ্রণাম চলছে।

আবার নৌকায় করে ঘুরলাম। বেশ শান্ত সব।

আমি এবার মণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে হাঁটতে লাগলাম। গঙ্গার এই ঘাটগুলোতে ভিড় নেই একদম। মণিকর্ণিকা ঘাটে গত রাতে পোড়ানো শবের ছাই পড়ে আছে দেখলাম। শ্মশানের গন্ধ আমার কখনোই ভালো লাগে না।

আরো সামনে, হাঁটতে লাগলাম। সকালবেলা গঙ্গার পাড় ভালোই লাগলো। বালাজী মন্দির নামে একটা মন্দির আছে। নিচে গেইট, সিঁড়িঘরটা অন্ধকার। একজন পুণ্যার্থীকে যেতে দেখে আমিও উঠে গেলাম, প্রায় চারতলার উপরে মন্দির।

আমার জীবনে বোধহয় সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতার এটা একটা। একজন বাঁশি বাজাচ্ছে, আমি জানালার কাছে বসলাম। এত সুন্দর রাগ ভৈরবী, সকালের রোদে গঙ্গার জল চকচক করছে, পাশে ঘাটে দালানের সারি, চলে গেছে দূরে। একটা মিনারে এক ঝাঁক পায়রা ঘুরছে। এক নাম না জানা পাখি ডেকে দূরে চলে যাচ্ছে। যে বাঁশি বাজাচ্ছে, তার খেয়াল নেই চারপাশে কি ঘটছে। এত তন্ময় হয়ে বুকে বাজা সেই সুর, চোখে জল চলে আসে।

অনেক কষ্টে নিজেকে বের করে আনলাম সেখান থেকে। সুন্দরের মাঝে বেশিক্ষণ থাকতে নেই।

এরপর আরো সামনে হেঁটে দেখলাম একটা মসজিদ। এত মন্দিরের মাঝে, যে কেউ আশ্চর্য হবে। পরে জানলাম, এটাই আওরঙ্গজেবের বানানো সেই মসজিদ। সুন্দর, মুঘল স্থাপত্য, মসজিদের লোকজন ঢাকা থেকে এসেছি শুনে বেশ অবাক হলো। ঢাকা থেকে সচরাচর কেউ যায় না হয়ত।

এরপর আবার ফিরলাম। এরপর আমাদের গন্তব্য, সারনাথ। বেনারস থেকে দশ কিলো মতো দূরে।

গৌতম বুদ্ধ যখন বোধিগয়াতে বোধিবৃক্ষের নিচে প্রবোধিত হন, তারপরে তিনি সারনাথে আসেন। বুদ্ধ দৈবজ্ঞানে দেখতে পান, তাঁর পাঁচ শিষ্য এইখানে আছেন, যারা তার কথা খুব সহজেই বুঝতে পারবে। এরপর তিনি এইখানে চলে আসেন, এবং প্রথম ধর্মপ্রচার করেন এক ভরা জোৎস্নার দিনে। এরপর বর্ষার মৌসুমটা তিনি এইখানেই কাটান। ততদিনে তার অনুসারির সংখ্যা ষাটে এসে পৌঁছায়। তিনি এরপর এদেরকে বিভিন্ন দিকে ধর্মপ্রচারের জন্য।

তিনি যেই জায়গায় প্রথম ধর্মপ্রচার করেছেন বলে জানা যায়, সেইখানে গেলাম। অদ্ভুত লাগল। এক ভরা পূর্ণিমায় কল্পনা জাল ছড়ায়।

এই জায়গাটা পরে বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। গুপ্ত আমলের অনেক ধংসাবশেষ পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি উন্নতিসাধন হয় সম্রাট অশোকের সময়ে, মৌর্য আমলে।

সারনাথে জাদুঘরে পেলাম এক আশ্চর্য জিনিস, ‘অশোক স্তম্ভ’। ভারতের জাতীয় প্রতীক এইযে অশোক স্তম্ভ, পাথরের ওপরে খোদাই করা চারটা সিংহের মুখ চারদিকে, কি নিখুঁত আর মসৃণ। পরে তুর্কীরা বেনারসে অভিযান চালালে এর ওপর হাতুড়ি চালায়। স্তম্ভের কিছু অংশ একটু ভাঙা সেইজন্য।

বেনারসে এলাম, বেনারসি শাড়ি কেনা হবে না, এ কেমন কথা। আমি শাড়ি কম বুঝি, মার জন্য নিতে চাইলাম, আত্নবিশ্বাসে কুলালো না। বেনারসে মুসলিম সম্প্রদায় মূলত এই শাড়ির নির্মাতা। এই শাড়ির সুনাম আছে পুরো উপমহাদেশ জুড়ে।

তখন বিকেল। তড়িঘড়ি করে মুঘলসরাই স্টেশানে এলাম। সারাদিন ইন্টারনেট পাইনি। ট্রেনের ব্যাপারটা তাই আর দেখা হয়নি। এইখানে এসে দেখি, যা ট্রেন আছে, রবিবার ছুটির দিন বলে সব লেইট। পরে যোধপুর থেকে এল যোধপুর এক্সপ্রেস, হাওড়া যাবে। টিকেট কাটিনি, জেনারেলে এত ভিড়, ওঠা গেল না।

স্লিপারে উঠলাম। চেকার নামিয়ে দিল পরের স্টেশানে, ভাবুয়া। বিহারের একটা স্টেশানে। তখন মধ্যরাত।

অনেক নোংরা স্টেশান, মানুষের ভিড় নেই। স্টেশান থেকে বের হয়ে চারদিক ঘুরে দেখলাম। মৃত আর পরিত্যক্ত সব।

পরের ট্রেন পাব কিনা, অনিশ্চয়তা। স্টেশানে ঘোষণা দিচ্ছে খাঁটি ভোজপুরিতে, ওর মর্মোদ্ধার করা মুশকিল অবশ্য। এরপর এলো ইন্দোর থেকে গরীবে নেওয়াজ এক্সপ্রেস। পড়িমরি করে উঠে পড়লাম জেনারেল কম্পার্টমেন্টে। এরপর সকালে কোলকাতা।

আর থামিনি। চাকদা হয়ে আবার হরিদাসপুর। দেশে চলে আসলাম। পেছনে ফেলে আসলাম, সব।

সবশেষে বলি, এই ট্যুরের খরচ হয়েছে সব মিলে সাড়ে তিন হাজার টাকা। কাচ্চি আর রসগোল্লা এভাবে না গিললে আরো কমত অবশ্য।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।