জটায়ু এবং মগনলাল মেঘরাজ

‘আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। বাবা খুব করে চেয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন যেন ফেলুদার রোলটা করে। ওর সাথে আমরা এই ব্যাপারে আলাপও করেছিলাম। লম্বা সময়ের জন্য ওর শিডিউল দরকার ছিল। ওসময় তো অমিতাভ খুব ব্যস্ত, আর আমাদের লজিস্টিক সাপোর্টও আজকের দিনের মত ছিল না।’ – কথাগুলো বলেছেন সন্দীপ রায়।

হ্যা, স্বয়ং সন্দীপ রায় বাঙালির চিরায়ত গোয়েন্দা চরিত্র প্রদোষচন্দ্র মিত্র বা ফেলুদার জন্য অমিতাভ বচ্চনকেই চেয়েছিলেন। সত্যবাবুর অবশ্য বিগ বি-কে মনে ধরার কারণও ছিল। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ রায়ের একমাত্র হিন্দী ছবি ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’দে ন্যারেটর ছিলেন অমিতাভ। ওমন ভরাট কণ্ঠটা ফেলুদা হিসেবে দারুণ মানিয়ে যাওয়ার কথা। তবে সেটা আদৌ হয়নি। তাই, ফেলুদা হিসেবে বিগ ‘বি’ কতটা জমজমাট হতেন? – এই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া যায়নি।

রায় পরিবারের লক্ষ্য ছিল হিন্দি সিনেমার কোনো নায়ককে নেওয়া। কারণ, মিনি সিরিজটা প্রচারিত হবে ভারতের জাতীয় সম্প্রচারযন্ত্র দূরদর্শণে। ফেলুদা হিসেবে তাই যাকেই নেওয়া হোক না কেন, তাকে হতে হবে বলিউডের – এমনটাই ছিল সত্যজিৎ-সন্দীপের ভাবনা। দৃশ্যপটে তখনই আসেন শশী কাপুর, কাপুর পরিবারের সবচেয়ে প্রতিভাবানদের একজন।

কিস্সা কাঠমান্ডু কা’র একটি দৃশ্য

শশী কাপুরকে অবশ্য শুরুতে বাঙালিরা পছন্দ করেনি, বিশেষ করে ততদিনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ে অভ্যস্ততা চলে এসেছিল তাঁদের। ১৯৮৬-৮৭ সালে এই সিরিজটি প্রচারিত হয়। শশী কাপুর মন্দ করেননি বলেই শোনা যায়। ‘শোনা যায়’ বলার কারণ এই সিরিজের কোনো ভিডিও চিত্র তামাম ইন্টারনেট জগৎ ঘুটেও পাওয়া গেলো না।

আদতে পরিচালনার কাজটা সন্দীপই চালিয়েছিলেন, কারণ সত্যজিৎ রায় তখন বেশ অসুস্থ। ছোট একটা চরিত্রে ছিলেন সুচিত্রা সেনের মেয়ে মুনমুন সেনও। নির্মানের জন্য বেছে নেওয়া হয় ফেলুদার অন্যতম সেরা বেস্ট সেলার গল্প ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’-কে। প্রতাপশালী মগন লাল মেঘরাজের চরিত্রটা করেন কিংবদন্তিতুল্য বাঙালি অভিনেতা উৎপল দত্ত। এর আগে সত্যজিতের ‘জয় বাবা ফেলনাথ’ সিনেমাতেও ধুন্ধুমার এই ভিলেনের চরিত্রটা উৎপলই করেছিলেন।

বরাবরের মত এখানেও তিনি ছিলেন প্রথম ও শেষ পছন্দ। তপেশ রঞ্জন মিত্র বা তোপশের চরিত্রটা করেন মাস্টার অলঙ্কার জোশি। লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ুর ভূমিকায় ছিলেন মোহন আগাসে। মগনলাল মেঘরাজের হাতে লালমোহন বাবু নাজেহাল হওয়ার দৃশ্যটা এই গল্পের আইকনিক ব্যাপারগুলোর একটি।

এই মোহন আগাসে পরে অবশ্য এর ‘প্রতিশোধ’ নিতে পেরেছিলেন। কারণ, সন্দীপ রায়ের যুগে এসে তিনিই ছিলেন মগনলাল মেঘরাজ। ফেলুদা চরিত্রের ৩০ বছর উপলক্ষে ১৯৯৫-৯৬’র দিকে সন্দীপ রায় টেলিভিশনের জন্য ‘ফেলুদা ৩০’ নামের একটা সিরিজ নির্মান করেন।

ততদিনে উৎপল দত্ত মারা গেছেন। সন্দীপ তাই মোহনকে বেছে নিলেন মেঘরাজের জন্য। ওই সিরিজে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ও ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ দু’টোই ছিল। এবার কাঠমান্ডুতে মেঘরাজরুপী মোহনের হাতে নাজেহাল হন জটায়ুর চরিত্র করা কিংবদন্তি অভিনেতা অনুপ কুমার।

ফেলুদা ভক্ত মাত্রই অবশ্যই জানেন, মেঘরাজ আর জটায়ুর কেমন আদায় কাঁচকলা সম্পর্ক। তবে, জটায়ুকে ঘায়েল করতে পারলেও ফেলুদাকে কখনোই পুরোপুরি ঘায়েল করতে পারেননি মেঘরাজ। তবে দু’জনের দ্বৈরথ আজো কিংবদন্তিতুল্য!

দ্য হিন্দু, এইচটুজিটু ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।