সেরাটা দিয়ে চমকে দেওয়া এক রকস্টার!

সাঞ্জু বাবা খ্যাত অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের সাপ-সিড়ির মতো চরাই-উতরাইয়ের জীবনকে বড় পর্দায় আনার জন্য পরিচালক রাজ কুমার হিরানী বেছে নিলেন প্রতিভাবান একজন অভিনেতাকে। সঞ্জয়ের রূপে উপস্থাপন করার জন্য বহু চড়া মেকাপে প্রথম ধাপ হিসেবে ফটোসেশন সম্পূর্ণ করেছেন, এবং ছবিগুলো তাকে পাঠিয়েছেন যার জীবনী নিয়েই ‘সাঞ্জু’ গল্পের নির্মাণ। ছবিগুলো দেখে সঞ্জয় দত্ত এতোটাই অবাক হয়েছে যে, অবিশ্বাসের সুরে রাজুকে জবাব দিয়েছিলেন – ‘আমার ছবি আমাকেই পাঠাচ্ছো কেন?’

সঞ্জয়ের ক্যারিয়ারের একটি পালক হিসেবে যুক্ত হয়েছিলো মুন্নাভাই এমবিবিএস। তার আত্মজীবনী নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে এক ঝলকের জন্য সেই মূহুর্ত তৈরি করা হয়েছিলো। সব আগের মতোই থাকবে, শুধু সেই অভিনেতার অঙ্গভঙ্গি, চাল-চলন নতুনরূপে বসিয়ে দেয়া হবে। ভাবনানুযায়ী তেমনটাই করা হলো। সঞ্জয় দত্ত সেই অভিনেতার ডেডিকেশন দেখে পরিচালককে মজার ছলে প্রশ্ন করেছিলো, ‘রাজু, মুন্নাভাই থ্রি তে আমিই থাকছিতো?’

এই বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলাতে যেমনটা ছিলো মেকাপের কারসাজি, প্রযুক্তির ব্যবহার, তেমনিই ছিলো পুরোটা চলচ্চিত্র জুড়ে সেই ‘অভিনেতার’ নিজের সেরাটা দেবার জন্যে আত্মোৎসর্গ। অভিনেতাটি রণবীর কাপুর। আর সাঞ্জুসহ, রকস্টার, বারফির মতো নির্মাণগুলো রনবীর কাপুরের আত্মোৎসর্গ গুণেরই যেন একেকটি পরোক্ষ প্রকাশ!

বলিউডের স্বনামধন্য ‘কাপুর’ পরিবার। পৃথ্বীরাজ কাপুর থেকেই যে পরিবারের হিন্দি চলচ্চিত্রে রাজত্বের যাত্রা ধীরে ধীরে শুরু। সেই পরিবারেই জন্ম রনবীর কাপুরের। দাদা রাজকাপুর, বাবা ঋষি কাপুর, মা নিতু সিং কাপুর সহ সকল অভিনয়শিল্পীদের কাজ দেখে-শুনেই সিনেমার আঙিনাতেই বেড়ে ওঠা।

প্রথম ক্যামেরার কাছাকাছি এসেছে সে, বাবার পরিচালিত সিনেমা ১৯৯৯ এর ‘আ আব লওট চালে’ এর সহপরিচালক হিসেবে। তবে বাবা-দাদার এক বংশ পরম্পরায় নায়ক হিসেবে শুরুটা করেছেন ২০০৭-এ সঞ্জয় লীলা বনসালির ‘সাওয়ারিয়া’ দিয়ে। বলিউডে আগমনটা কিন্তু স্বজনপ্রীতির খাতিরেই, তবে এই জায়গাটা যে বহু নিষ্ঠুর, তা রণবীরও ভালো করেই জানে। কে কোথা থেকে এসেছে দেখার আগে, কিভাবে টিকে আছে সেটাই দিনশেষে যেন গুরুত্ব পায়। যা রনবীর কাপুর প্রতিনিয়ত নিজের প্রতিভা দিয়ে টিকে থাকার লড়াই করে প্রমান করে যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীক দিক দিয়ে প্রথম সিনেমাই বাজের তালিকায়। তবুও বছর শেষে ফিল্মফেয়ারে নবাগতের ব্ল্যাক লেডি হাতে নিয়ে সেই ছেলেটি জানান দিয়েছিলো, রনবীর কাপুরের যাত্রাটা কিন্তু বহুদূরের।

সাওয়ারীয়ার সেই তরুণের মিষ্টি হাসির সাথে করা টাওয়াল ড্যান্স, কতশত তরুণীদের হৃদয়ে যে ঝড় তুলেছে, সে ঝড় আজও সময়ে অসময়ে তোলপাড় করে দিয়ে যায়৷ ছোট্ট কিশোরীদের ডায়রির পাতাতে রণবীর নিজের স্থিরচিত্র দিয়ে জায়গা করে রেখেছেন নিজের আকর্ষণীয় সুদর্শন রূপ দিয়ে৷ দর্শকের আসনে বসা তরুনী-যুবতীদের হাতে লেখা যেমন তার নাম দেখা যায়, তেমনিই দেখা যেত বলিউড সুন্দরী দীপিকা পাড়ুকোনের ঘাড়ের পাশে ট্যাটু হিসেবে খচিত করা, ইংরেজিতে দুই অক্ষর ‘আরকে’! আর রনবীর কাপুরের এই গুণটিকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার লোকেরও অভাব নেই।

ইন্ডাস্ট্রির বাহিরটা অজানা, তবে বহু সুন্দরী অভিনেত্রীদের সাথে মন দেয়া নেয়া হয়েছে বহুবার। কিন্তু দিনশেষে ফলাফলটা নিয়েছে ভিন্নরূপই। দীপিকা পাড়ুকোন নিজের হৃদয়ভাঙার সময়ই চোখের সামনে আধার জগৎ দেখতে পেরেছে,স্বপ্ন দেখেছিলো সোনাম কাপুরও, ক্যাটরিনা কাইফের সাথে লিভ ইন রিলেশনশিপ আর সম্পর্কের পূর্ণতা পায়নি৷ বর্তমানে ভাট কন্যা আলিয়া ভাটের সাথে প্রণয়ের নতুন গল্প লেখা হচ্ছে। ভক্তকূলের আশা হয়তো এই সম্পর্কের একটি সুন্দর ইতি দেখার।

অবশ্য এই ভক্তকূলসহ সকল সারির দর্শকদের মনে আশা বহু আগেই জেগেছিলো, এবং সেটি হলো বলিউডের সুপারস্টারের তালিকায় রনবীর কাপুরের নামটা যুক্ত হবে হয়তো বহু আগেই৷ ‘ওয়েক আপ সিড’, ‘আজাব প্রেম কি গাজাব কাহানি’, ‘রকেট সিং’-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমাগুলো তো তেমনই জানান দিচ্ছিলো৷

কিন্তু আশায় গুড়েবালি হিসেবে ক্যারিয়ারে রয়েছে, ‘বেশারাম’, ‘রয়’, ‘বোম্বে ভেলভেট’, ‘তামাশা’র মতো ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ সিনেমাগুলো। তবে ১২ বছরের এই চমৎকার এক ক্যারিয়ারে দর্শকপ্রিয় ও সমালোচকপ্রিয় সিনেমায় নিজের প্রতিভা ফুটিয়ে তুলতে কমতি রাখেনি রনবীর কাপুর৷ ‘আঞ্জানা আঞ্জানা, রাজনীতি, ইয়ে জাওয়ানি হ্যা দিওয়ানি, জাগ্গা জাসুস, তামাশা, রকস্টার, অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল, বারফি, সাঞ্জু, বাচনা অ্যা হাসিনো’সহ বহু সিনেমায় এসেছে নতুনরূপে৷ সামনে ‘ব্রক্ষ্মাস্ত্র’, ‘শামসেরা’র মতো ভিন্ন কিছু মুক্তি পাবে।

ব্যক্তিগতজীবনের প্রেমিক পুরুষের পরিচয়ের কারণে, বড়পর্দায় নিজের পারফরম্যান্সের দিকে আঙুল তুলতে কোনো সুযোগই দেন না রনবীর। তার নম্রতা, সদাচরণ দর্শক থেকে শুরু করে বলিউডপাড়ার লোকদের, এমনকি তার অতীত-ভালোবাসার মানুষকেও বন্ধু করে রাখার জন্য যেন যথেষ্ট। নিজের সিনিয়রদের জন্য সর্বদা সম্মানই তাকে এতোটা আপন করে রাখে। শাহরুখ-আমির-সঞ্জয়দের নামটি নেয়ার সময়ও ‘স্যার’ যোগ করতে ভুল করেনা সে৷ চলচ্চিত্রে তাঁর পথচলা ও প্রতিভা আভাস দেয়, রনবীর কাপুর দ্বারা দ্রুতই বহু প্রত্যাশা পূরণ ও আরো খ্যাতি অর্জন সম্ভব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।