সিনেমার সিংহাসনে তিনি অন্ততকালের রাজা

প্রথম কবে দেখেছিলাম? নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। জীবন থেকে নেওয়া বা আলোর মিছিলে হতে পারে। ফারুক বা ছোট মামা চরিত্রে। বিটিভিতে এই সিনেমা দুটি অনেক অনেক দেখাত। জাতীয় দিবসগুলোতে ধরাবাধা ছিল এই দুই সিনেমার একটি। কিংবা ওরা ১১ জনেও হতে পারে। পারভেজ।

নয়ত, ছায়াছন্দে প্রথম দেখেছি। ছায়াছন্দ মিস হতো না দুনিয়া উল্টে গেলেও।ছায়াছন্দে তার ২-৩টি গান থাকত নিশ্চিত। ওই ‘দূর দূর দূরান্তে’ বা ‘নীল আকাশের নিচে আমি’ গানে প্রথম দেখে থাকতে পারি।

‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’ গানটা মনে গেঁথে আছে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন হাতে। ফোনের ওপাশে শবনমের ‘হ্যালো’ শুনে তার মুখভঙ্গি, কথা বলার সময় কণ্ঠের রোমান্টিসিজম, রিসিভার মুখের সামনে এনে গান ধরা, পুরো গানে তার চোথ-মুখের এক্সপ্রেশন, কিছুই ভোলার নয়। ওই গানেই প্রথম দেখেছিলাম?

ঢোল বাজাতে বাজাতে হাসিমুখে ‘তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে’ গানটিও ছায়াছন্দে দেখে দেখে একদম মনের ভেতরে ঢুকে বসে গেছে। কে জানে, এটিও প্রথম দেখতে পারি।

ম্যাগাজিনের পাতার ছবিও স্পষ্ট মনে আছে। ‘অনন্ত প্রেম’ ছবিতে তার সঙ্গে ববিতার একটি ছবি দেখে ভেতরে ভেতরে কিছু অনুভব করেছিলাম। নিউজ প্রিন্টে সাদাকালো ছবি। তবে ভীষণ জীবন্ত। সেই অনুভূতির নাম জেনেছি, বুঝেছি অনেক পরে। ওই ছবি এখনও চোখে ভাসে, সেই অনুভূতি এখন্ও দোলা দেয়।

ম্যাগাজিনের পাতায়ই প্রথম পড়েছিলাম, ‘রংবাজ’ নাম সিনেমার কথা। সম্ভবত প্রথম অ্যাকশন সিনেমা। রোমান্টিক আর সামাজিক ইমেজ ছেড়ে অ্যাকশন সিনেমা বানানোর আর অভিনয় করার দু:সাহস দেখিয়েছিলেন। সেই ছোট বেলায়ই কেমন চমকে যেতাম ওসব পড়ে।

আমাদের স্কুলে যখন সাঈদ ভাই ঘন্টা বাজাতেন, আমার চোখে ভাসত ছুটির ঘন্টার দপ্তরীকে। হাসিমুখে ঘন্টা বাজাচ্ছেন। ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ দেখে দারুণ মজা পেতাম। ওই ছোট ছেলেটির মত কোনো রহমত ভাইকে পড়াশোনা শেখাতে ইচ্ছে করত।

‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’ দেখেই মনে হয় প্রথমবার ঢাকা আসার সাধ জেগেছিল। মনে আছে, ছোট্ট বেলায় প্রথমবার ঢাকা এসেছিলাম আব্বার সঙ্গে। আমি অপেক্ষা করছিলাম রাত হওয়ার। কারণ রাতে ‘লাল লাল নীল নীল’ বাতি দেখা যাবে!

এই সবই দেখেছি বিটিভিতে, সিনেমায় বা ছায়াছন্দে। সব কটাকেই প্রথম মনে হচ্ছে, কারণ হতে পারে, প্রতিবারই তাকে নতুন করে আবিষ্কার করতাম! একটু বড় হয়ে সিনেমা হলে দেখেছি। নিজেদের একটা হল থাকায় সিনেমার পোকা ছিলাম ছোট বেলায়। সব সিনেমা দেখতে হতোই। একবার নয়, কয়েকবার করে।

তার পুরোনো সিনেমার কিছু সিনেমা হলেও দেখেছি। আমরা যখন একটু বড় হয়েছি (তখনও আসলে ছোটই), তার নতুন সিনোমাগুলোও সিনেমা হলে দেখছি, তখন তিনি জেনুইন নায়ক চরিত্রের সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন। তার পরও প্রতিবার তাকে চেনা যেত আলাদা করে। তার আভা বোঝা যেত, তার ‘Aura’ ফুটে উঠত।

তার অভিনয় নিয়ে বলার মত সাহস বা যোগ্যতা নেই। সেই চেষ্টাও করব না। কিন্তু তার স্মার্টনেস, আহ! মনে পড়ে, সেসময় বড়দের আলোচনায় শুনতাম, সুদর্শন কোনো ছেলের চূড়ান্ত উদাহরণ সবসময় থাকতেন তিনিই। তখন যেটুকু বুঝতাম, এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারি, তার চেয়ে সুদর্শন নায়ক বাংলা সিনেমায় আর আসেনি। আর কখনও আসবে কিনা কে জানে!

আজ বলতে লজ্জা নেই, আমার মুখটা তার মত একটু লম্বাটে ধরণের বলে কতশত বার চুপি চুপি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখেছি, একটুও কি তার মতো দেখায়? একটুও মিল নেই দেখে হতাশ হয়েছি, তবু আবার পরে দেখেছি! প্যান্টের মধ্যে শার্ট গুজে পরতে চাইতাম ঠিক তার মত করে।

তার বচন, তার এক্সপ্রেশন, তার প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে অদ্ভূত একটা আভিজাত্য ঠিকরে বের হতো। যেন আমাদের মাঝের কেউ নন, তিনি বিশেষ কেউ। এই মানুষটিই আবার নানা সময়ে অভিনয় দিয়ে হয়ে উঠতেন কখন্ও চাকর, কখন্ও দপ্তরী, কখন্ও ডাকাত, রংবাজ বা ব্যর্থ প্রেমিক। একই সঙ্গে আভিজাত্য আর পাশের বাড়ির ছেলে, দু’টিকেই ধারণ করা, দু’টিই ফুটিয়ে তোলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তার। হয়ত সহজাতই।

সিনেমা-গান, স্মরণীয় অভিনয়, এসব নিয়ে বলতে গেলে শেষ হবে না। আমাদের ছোটবেলা, একটু বেড়ে ওঠার সময়টায় নিত্য বসবাস ছিল বাংলা সিনেমার সঙ্গে। সাদাকালো বা আংশিক রঙিন সিনোমার যুগে দারুণ রঙিন ছিল আমাদের কল্পনার জগত। সেখানে নায়কের নায়ক, সত্যিকার নায়ক ছিলেন এই একজনই। তিনি যেভাবে রাঙিয়েছেন, আর কেউ পারেনি। তিনি যেভাবে হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, আর কেউ ধারেকাছেও যেতে পারেননি।

কিংবদন্তীর মৃত্যু নেই, কীর্তিমানের প্রস্থান নেই-এসব কেতাবী কথা বলতে পারি। অনেকের ক্ষেত্রে ফরমালিটি করে বলা কথাগুলোও তার জন্য ভীষণ সত্যি। তবে ওভাবে বলার প্রয়োজন দেখছি না। কারণ তার মুত্যু আসলেই নেই। আমার হৃদয়ে, আমাদের হৃদয়ে, সিনেমার জগতের সিংহাসনে তিনি অন্ততকালের রাজা। তিনি একজনই।

রাজ্জাক। আমার নায়ক। আমাদের নায়ক। স্মৃতিগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা।

বাংলা সিনেমার দুর্দশায় আর নানা সময়ে নানা অপমানে শেষ অনেক কটা বছর অনেক কষ্ট পেযেছেন। ওপারে নিশ্চযই অনেক অনেক ভালো থাকবেন!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।