কিং খের

বন্ধুর মত বাবা, কিংবা একজন নৃশংস ভিলেন; কমেডি ভূমিকা কিংবা কিংবা সিরিয়াস কোনো চরিত্র; বলিউড কিংবা হলিউড – যেখানে যেভাবেই কাজ করুন না কেন মনে হয়, এই ভূমিকায় তাঁর চেয়ে ভাল কেউ করতে পারতো না। আশি কিংবা নব্বই দশকে যারা সিনেমা দেখা শুরু করেছেন, কিংবা আজকের দিনেও যিনি বলিউডের সিনেমা দেখছেন তাদের সবার কাছেই তিনি পরিচিত।

তিনি হলেন অনুপম খের। ১৯৫৫ সালের সাত মার্চ জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা নি:সন্দেহে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি আশীর্বাদের নাম। তিনি হয়তো নায়ক নন, তিনি কোনো সিনেমায় প্রধান ভূমিকায় কাজ করেননি বললেই চলে। তবে, যতটুকু সময় তিনি পর্দায় থাকেন, তখন তাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না কেউ। সেটা মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি যখন ‘সারাংশ’ সিনেমায় এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল হেড মাস্টারের ভূমিকায় কাজ করেন, তখনও সত্যি ছিল। আজ যখন তিনি হলিউডের ‘দ্য বিগ সিক’-এর মত সিনেমা করে যাচ্ছেন তখনও সত্যিই আছে।

মহেশ ভাটের ‘সারাংশ’ ছবির দৃশ্যে অনুপম খের, রোহিনী হাত্তানগাদি ও সোনি রাজদান। সোনি রাজদান হলেন মহেশ ভাটের স্ত্রী ও আলিয়া ভাটের মা।

সব চরিত্রে মানিয়ে নেওয়ার মত লোক বলিউডে খুব কম আছেন। সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের একজন অনুপম খের। এমনি এমনি তো আর তিনি ৫০০-এর বেশি সিনেমা করেননি। তিনি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ার (এফটিআইআই) চেয়ারম্যানও। ভারতীয় সিনেমার ‘কাচামাল’ সরবরাহের প্রতিষ্ঠানটা সঠিক হাতেই আছে।

অনুপম খোর যে ঐতিহাসিক সব ভিলেনের চরিত্র করেছেন, সেটা কে না জানে। বিশেষ করে ‘দিল’, ‘হাম’, ‘কারমা’, ‘বেটা’ সিনেমায় তার নেতিবাচক চরিত্রগুলো সিনেমার পোকাদের আজো মনে থাকার কথা। পদ্মভূষণ সম্মাননা পাওয়া এই অভিনেতা নিশ্চিত করেছেন যে, সিনেমাগুলো দেখার পর যেন দর্শকরা তাঁকে ঘৃণার দৃষ্টিতেই দেখেন।

চুলসহ অনুপম খের, তরুন বয়সের ছবি

মূদ্রার ঠিক অন্য পিঠের মত চুটিয়ে কমেডি ভূমিকায়ও কাজ করে গেছেন তিনি। ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ সিনেমায় তাঁর চরিত্রদু’টির আবেদন যেমন কখনোই কমবে না।  কিংবা ‘দিল হ্যা কি মানতা নেহি’ সিনেমায় মজার এক বাবাকেও কখনো ভোলা যাবো না। কম বেশি প্রতিবছরই প্রায় প্রতিটি পুরস্কারের কমেডি শাখার মনোনয়ন পাওয়াদের মাঝে তিনি থাকেন।

অনুপম খের যে সত্যিকারের এক সব্যসাচী সেটা বুঝতেও বাকি নেই বলিউডের। ‘সিরিয়াস’ চরিত্র করায় তার জুড়ি মেলা ভার। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মহেশ ভাটের ‘সারাংশ’ সিনেমাতেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সিনেমা দিয়েই ফিল্ম ফেয়ারের বিবেচনায় পেয়েছিলেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার। কিংবা পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়া অনুপমের ‘আ ওয়েন্সডে’ সিনেমাটা দেখতে পারেন। পর্দায় পুলিশ অফিসার প্রকাশ রাঠোরের ভূমিকায় আরেক শক্তিমান অভিনেতা নাসিরউদ্দিন শাহের সাথে তার লড়াইটা নি:সন্দেহে উপভোগ করবেন। আবার ‘ঘোসলা কা খোসলা’ ছবিতে বিনয়ী বাবার চরিত্রটিও কিন্তু কম আলোচিত নয়।

‘আ ওয়েন্সডে’ সিনেমায়

শুধু, উপমহাদেশেরই নয়,  তিনি পাশ্চাত্যেরও মন জয় করেছেন। তিনি ২০০২ সালের গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের জন্য মনোনিত ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’ সিনেমায় কাজ করেন। ২০০৭ সালে গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার জয়ী অ্যাং লি’র ‘লাস্ট, কওশন’ সিনেমাতেও দেখা গেছে তাঁকে। এখানেই শেষ নয়, ২০১৩ সালের অস্কারজয়ী ডেভিড ও. রাসেলের সিনেমা ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এ কাজ করেন তিনি। আর ২০১৭ সালের কমেডি সিনেমা দ্য বি সিকের প্রসঙ্গে তো আগেই বলা হয়েছে।

১৯৮৫ সালে তিনি অভিনেত্রী কিরণ খেরকে বিয়ে করেন। আপন করে নেন কিরণের আগের ঘরের ছেলে সিকান্দার খেরকেও। নিজের ছেলে বলেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। মজার ব্যাপার হল, কিরণ আর অনুপমের পরিচয় কিন্তু বলিউডের প্রাণকেন্দ্র মুম্বাইয়ে নয়। তাঁদের পরিচয় চন্ড্রিগড়ে। দু’জনেই কাজ করতেন চন্ড্রিগড় থিয়েটার গ্রুপে। সেখানেই বন্ধুত্ব হয় দু’জনের। পাঁচ বছর পর বিয়ে।

অনুপম খেরের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিমলায়। অনেক সাক্ষাৎকারেই তিনি নিজের ক্যারিয়ারের, জীবনের অনেক বাঁধার কথা বলেছেন। প্রচণ্ড প্রতিভাবান এই মানুষটার গল্প গুলো শুনে মনের অজান্তেই মুখ থেকে শুধু একটা লাইনই বের হবে – অসম্ভব বলে নেই কিছু!

– ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও লেটেস্টলি.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।