উত্তর কোরিয়ানদের হীরক রাজার গল্প

কিম জং উন!

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত এক নেতার নাম। উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ এই নেতা তার অদ্ভুত সব নিয়ম নীতি, ভুতুড়ে পদক্ষেপ কিংবা কাজে বিশ্ব রাজনীতির ফ্রন্ট লাইনে থাকেন সব সময়ই।

বিচিত্র চুলের ছাট, পোশাকে ভিন্নতা তাঁকে আলাদা করে রাখে সব সময়। ২০১১ সালের দিকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বনে যাওয়া এই তরুণ এখনো দেশ চালাচ্ছেন নিজের মতো করে।

গণমাধ্যমের সামনে এসেছিলেন ২০১০ এর দিকে। এর ১৪ মাস পরই পেয়ে যান দেশের ক্ষমতার চাবি। পিতার অনুপস্থিতিতে সবাই ধারণা করেছিলেন সবকিছু বুঝতে বুঝতে অন্তত কিছু সময়তো প্রয়োজন উনের,অনভিজ্ঞ উন পরামর্শ নেবেন পিতার সাথে কাজ করা ঝানু রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে। কিসের কি! উপদেষ্টাদের একজন কে ক্যামেরার সামনেই উপস্থিত মিটিংয়ের সময়ই গ্রেপ্তার করান এবং পরের সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। আরেকজনকে পরবর্তী মিটিংয়ে আসতে বললেও তাঁর আর খোঁজ মিলেনি, তৃতীয়জনকে গৃহবন্দী করে রাখেন।

সকালের সূর্য দেখেই দিনের বাকি গল্প বলে দেওয়া যায়। ক্ষমতার কয়েকদিনের মাথায় নেতার এমন আচরনে উত্তর কোরিয়ার জনগনও ততোদিনে বুঝে ফেলেছেন ভবিষ্যৎ কপালের লিখন।

তিনি একাধারে ওয়াকার্স পার্টি অব কোরিয়ার ফার্স্ট সেক্রেটারি, উত্তর কোরিয়ার কেন্দ্রীয় সেনা কমিশন ও জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, কোরিয়ান পিপলস আর্মির সুপ্রির কমান্ডারও তিনি।

দেশটি ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বিশ্বরাজনীতির মাথা ব্যথার কারণ হয়েই আছে, কিম জং উনের ক্ষমতা পাওয়ার ফলে সেই মাথাব্যাথা বেড়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুন। যেমন দু’বছর আগে বিশ্ব নেতাদের বারবার নিষেদ স্বত্ত্বেও হাইড্রোজেন বোমার সফল পরীক্ষা চালিয়ে বুঝিয়ে দেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুমকি, চাপ – এসবকে তিনি থোড়াই কেয়ার করেন।

সমালোচনা বা মতের অমিল মোটেই পছন্দ নয় কিমের। মতের অমিলে নিশ্চিত মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুর ধরণ কিমের নিজস্ব চিন্তাধারার প্রয়োগে। যেমন লোকমুখে প্রচলিত আছে, দীর্ঘদিনের সেনাপ্রধান জ্যাং সং থায়েক কে কামানের গোলা বা ক্ষুদার্থ কুকুরের খাদ্য বানিয়ে মৃতুর স্বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্বর এবং প্রশ্নবিদ্ধ আইনের প্রয়োগ হলেও প্রতিবাদ জানানোর সাহস কেউই রাখে না, কারণ এতে মৃত্যুর বিকল্প কিছুই কপালে জুটবেনা।

ব্যাক্তিগত জীবনে কিম জং উন খুবই বিলাসী। দেশজুড়ে রয়েছে তার ১৭টি প্রাসাদ, নিজস্ব একটি দ্বীপের মালিকও তিনি। অবসরে সময় কাটাতে কিমের প্রিয় জায়গা এটা। ভোজন রসিক কিমের খাওয়া দাওয়ার তালিকা শুনলে চোখ আপনার কপালে উঠবেই। ডেনমার্ক থেকে আসে শুকরের মাংস, ইরান থেকে আসে ক্যাভিয়ার, চীনের তরমুজ আর জাপানের কোবে প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকার অংশ।

কিম যে সিগারেটের ধোয়া বাতাসে উড়ান সে সিগারেটের দাম প্রতি পিস ৪৪ ডলার। প্রিয় খেলা ‘স্কি’এর জন্যে যে রিসোর্ট তিনি তৈরী করেছেন তাতে ব্যয় হয়েছে ৩৫ মিলিয়ন ডলার। কিমের সংগ্রহে যে ঘড়ি রয়েছে তার দাম প্রায় ৮.২ মিলিয়ন ডলার। যেখানে ২০১৫ সালের এক হিসাবনুযায়ী উত্তর কোরিয়ার নাগরীকদের জন্য দৈনিক বরাদ্দ ২৫০ শস্যদানা।

একগুঁয়ে কিম দেশে জারি করেছেন অদ্ভুতুড়ে সব নিয়ম, নির্দিষ্ট ২৮ টি হেয়ার কাট আছে, যার ১০টি পুরুষের এবং ১৮ টি নারীদের জন্য। তবে কিম যেভাবে চুল কাটান সেভাবে দেশের আর কেউ কাটতে পারবে না। এই কাটিং শুধু কিমের জন্য।

আপনার বাসস্থান নির্ধারণ করা আপনার সম্মতিতে হলেও উত্তর কোরিয়ার জনগনের বাসস্থান কিম সরকার নির্ধারণ করে। কিছুদিন কোরিয়ায় এবং কিছুদিন অন্যদেশে গিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আপনাকে যেকোনো একটি দেশই বেছে নিতে হবে।

দেশটিতে ইন্টারন্যাশনাল কল নিষিদ্ধ। ইন্টারন্যাশনাল কলের কারন ২০০৭ সালে এক ব্যক্তিকে অন দ্য স্পটে গুলি করা হয়।অন্যায় করলে আপনি শাস্তি পাবেন। তবে আপনি যদি উত্তর কোরিয়ার নাগরিক হোন তাহলে আপনার অন্যায়ের কারনে আপনার পাশাপাশি আপনার পুরো পরিবারকে শাস্তি পেতে হবে।

‘সরকার-ই ঈশ্বর’ এ নীতিতে কিম জং উন এবং তার বাবা কিম জং ইল এর স্থাপত্যের সামনে গিয়ে মাথা নত করতে হবে এবং কাদতে হবে। কেউ না কাদলে তাঁর গন্তব্য কারাগারে।

বছরের বিশেষ দুটি দিন অর্থাৎ ৮ জুলাই এবং ১৭ ডিসেম্বরে কেউ জন্মদিন পালন করতে পারবে না। কারণ এ দুটি দিনে উত্তর কোরিয়ার সাবেক দুই শাষক কিম ই সুং এবং কিম জং ইল মৃত্যুবরণ করেন।

আপনি উত্তর কোরিয়া ভ্রমণ করলে আপনাকে ছবি তুলতে দেওয়া হবে না। একবার কোনোভাবে একজন টুরিস্টের মাধ্যমে ২৭ টি ছবি ফাস হয়ে যায়। যার একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিলো খাদ্যাভাবে এক ব্যক্তি মাটি থেকে ঘাস কুড়িয়ে খাচ্ছেন।

সরকার বিরোধী মন্তব্যের জন্য পাঠানো হয় এডুকেশনাল ক্যাম্পে। যেখানে পাশবিক নির্যাতনের আর অমানবিক শাস্তিতে ব্রেইন ওয়াশ করানো হয়।

কোরিয়ার বাসিন্দাদের জন্য আপনার আমার মতো ইন্টারনেটের ব্যবস্থা নেই, চাইলেই মুভি দেখে রুমে বসে আয়েশ করার সুযোগও নেই। ফেসবুক-হোয়াটসাপ সেখানে অনেক দুরের চিন্তা, বাইরের কোনো টিভি চ্যানেল নেই। স্থানীয় তিনটি চ্যানেল আছে, যেখানে ২৪ ঘন্টাই সরকারের প্রোপাগান্ডা চলে।

২০১০ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে পর্তুগালের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিলো কিমের দেশটি। পরবর্তীতে শাস্তি স্বরুপ দলের প্রতিটি খেলোয়াড়দের পাঠানো হয়েছে লেবার ক্যাম্পে। প্রতিটি খেলোয়াড়ের আগামী দুই প্রজন্ম এ শাস্তি বয়ে বেড়াবে।

বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা আতঙ্ক উত্তর কোরিয়াও এর বাইরে নয়। কয়েকদিন আগেই চীন ফেরত বিমানবাহীনির এক কর্মকর্তা কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থায় পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করেছিলেন। শাস্তিস্বরুপ সেখানেই গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে তাঁকে।

৮০ এর দশকে সত্যজিত রায়ের ‘হীরক রাজার দেশ’ ছবিটির সবগুলো চরিত্রই ছিলো কাল্পনিক। কোনো এক কল্পিত রাজার ভয়ে তটস্থ থাকতে দেখা গিয়েছিলো সবাইকে। তবে সেটা ছিলো সাদাকালো যুগের টেলিভিশনের পর্দায়।  কয়েকযুগ পেরিয়ে কিম জং উন যেনো উত্তর কোরিয়ানদের কাছে সত্যজিত রায়ের সেই কল্পিত এক নায়কের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, কিংবা তার চেয়েও নির্মম!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।