খাঁচা: আশায় বাঁচে জীবন

হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক। তাঁর মর্মস্পর্শী ছোটগল্প ‘খাঁচা’। সে গল্পটিকে সিনেমায় রূপদান করা আপাতদৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও কাজটি করে ফেলেছেন আকরাম খান। তিনি ছোটগল্পটিকে বড়পর্দায় তুলে এনেছেন। সাহিত্যকে পর্দায় নিয়ে আসা বেশ কঠিন, বিশেষ করে লেখকের বর্ণনায় পাঠক যখন চোখের পর্দায় নানারকম দৃশ্যপট সাজিয়ে নেয়। তাই সাহিত্যকে নিয়ে নির্মিত সব চলচ্চিত্র মন ছুঁতে পারেনা, কিংবা বলা চলে ঠিক সাহিত্যের মতো হয়না।

আকরাম খানের ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটি দেখার জন্য আমি শুরু থেকেই আগ্রহী ছিলাম। ট্রেলার দেখার পর ছবিটি দেখার বাসনা জেগেছিল। যে শুক্রবারে ছবিটি মুক্তি দেয়া হয় সে শুক্রবারে আমি স্টার সিনেপ্লেক্সের আশে-পাশেই ছিলাম না; অথচ প্রতি শুক্রবারে বসুন্ধরা সিটির পাশেই গ্রীণ রোডে অফিস করতে হয়। তাই জানা থেকেও আফসোসে পুড়েছি, ‘খাঁচা’ দেখতে পারিনি বলে। বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোর মতো এ ছবিটি সপ্তাহজুড়ে চলেনি, তাই অবসর পেয়ে দেখার সুযোগ করে উঠতে পারিনি। শেষমেস দেখতে হলো ডেস্কটপে, সিনেমাহলের বড় পর্দায় দেখার স্বাদ না পেলেও যা পেয়েছি তা অমূল্য। আমার মনের অন্দরমহলে কি হচ্ছে, তা নিয়ে এ রচনা। রিভিউ লেখার মতো কঠিন কাজ করছিনা, স্রেফ একজন দর্শকের ভাবনাগুলো সাজিয়ে নেয়া বলা যায়।

জয়া আহসান বর্তমান সময়ের সেরা একজন অভিনেত্রী। যতোই দিন যাচ্ছে তার গ্লামারের সাথে সাথে যেন অভিনয় প্রতিভা বিকশিত হচ্ছে। প্রতিটি কাজ আগের জয়াকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, একজন দর্শক হিসেবে এমন অভিনয় দেখতে পাওয়া তৃপ্তিকর। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি জয়া আহসানই চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে ঘিরে রয়েছে আরো দুজন শক্তিমান শিল্পী। একজন মামুনুর রশীদ অন্যজন আজাদ আবুল কালাম।

গল্পের পটভূমি পাক-ভারত দেশভাগের সময়। বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তান থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভারত যেতেন অন্যদিকে সে দেশের মুসলমানরা আসতেন বাংলাদেশে। তাদের চোখে থাকতো নতুন জীবনের স্বপ্ন। যেখানে কোন পিছুটান নেই, অর্থকষ্ট নেই, দুবেলা পেটপুরে খাওয়ার নিশ্চয়তা আছে। এই আশা নিয়ে পরিবারগুলো নিজের ভিটে ছেড়ে এসেছিল, গিয়েছিল। তখনকার এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের জীবন নিয়ে সাজানো হয়েছে কাহিনী।

সে পরিবারের মূল পুরুষটি বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে পড়লে তার ছেলে হাল ধরে সংসারের, বেছে নেয় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের পেশা; বিসর্জন দেয় নিজের শখ-আহ্লাদ। সে পরিবারটি আশায় থাকে, কখন বাংলাদেশ ছেড়ে ভারত যাবে। এ দেশে যে তখন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর চলছে নির্যাতন। পরিবারটি সুনিবিড় শান্ত সমাজে বাস করতে চেয়েছিল। পেরেছিল কি? জানতে হলে দেখতে হবে ‘খাঁচা’।

সরোজিনী চরিত্রে জয়া ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। জীবনের কয়েকটি ধাপে জয়াকে দেখা গেছে। জয়ার নতুন বিয়ে হয়, স্বামীর সঙ্গে দুষ্টুমিতে মেতে ওঠা মার্জিত সাজসজ্জার সে জয়াকে দেখে কোন ছেলেই চোখ সরাতে পারবেনা। এতটা রূপবতী লেগেছিল তাকে। আবার জয়াকে পাওয়া যায় গ্রাম্য গৃহবধুর রূপে। সংসারের সকল কাজ নিজে করে চলেছে সরোজিনী, ছেলেদের উচ্ছ্বল কৈশোরকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে বাবার শাষণের হাত হতে। অসুস্থ শ্বশুরের সেবায়ও সরোজিনী ছিল আদর্শ পুত্রবধু।

কিছু কিছু দৃশ্যে স্রেফ চোখ দিয়েই নিজের যাতনা উগড়ে দিয়েছে সরোজিনীরূপী জয়া। ভাঙা ফ্রেম হাতে নিয়ে জানালার গ্রীলের ফাঁকে আকাশপানে চেয়ে থাকা সরোজিনী, কিংবা মুসলমান বন্ধুদের হাতে নিগৃহিত হওয়া পুত্রের শরীর দেখে ভাবলেশহীন চেয়ে থাকার সময় ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরা – এমন দৃশ্যে অভিনয় শুধু জয়াকে দিয়েই সম্ভব। আবার শেষ বয়সের সরোজিনীকে দেখেও তেমন অচেনা লাগেনি।

কর্তার চরিত্রে মামুনুর রশীদ যুৎসই অভিনেতা। তবে বিভিন্ন সময়ে তার পরিবর্তন তেমন হয়নি। তিনি অভিনয় দিয়ে তা কাটিয়ে দিয়েছেন বটে কিন্তু বয়সের ছাপ দেখা যায়নি তার সাজসজ্জায়। ব্যাপারটি নিয়ে পরিচালক সচেতন হলেই পারতেন।

আজাদ আবুল কালাম ছিলেন আম্বুজাক্ষ (হিরণ) ডাক্তার চরিত্রে। সময় তাকে পরিবর্তনের আবরণে ঢেকে দিয়েছে ব্যাপকভাবেই। কাঁচা চুল পেকেছে, আবার ঘনত্বও কমেছে সে চুলের। সংসার নিয়ে চিন্তায় মানুষের শরীরে বাহ্যিক পরিবর্তন নিয়ে আসে, পরিচালক হয়তো সে কথাটিই এ চরিত্রের সাজসজ্জার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন।

‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রে আরো কিছু চরিত্র ছিল, বলতে হয় সরোজিনীর সন্তানদের চরিত্রের কথা। সময়ের সাথে তাদের পরিবর্তন তেমন চোখে লাগেনি। পরিচালক এ জায়গায় নজর দিলে মন্দ হতো না। বাকি চরিত্রগুলো ছিল প্রয়োজনে আসা।

বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে পরিচালক সুনিপুণ দক্ষতায় সে সময়ের গল্প বলেছেন। চল্লিশের শেষ হতে ষাটের দশকের একটা সময় পর্যন্ত গল্পের ব্যাপ্তি। ছোটগল্পকে সিনেমার মতো দীর্ঘ প্লাটফর্মে তুলে ধরে আকরাম খান মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এজন্য স্যালুট পেতেই পারেন তিনি। অনেক সিনেমাই উপন্যাস বা বড় গল্পকে ঠিকঠাক তুলে ধরতে পারেনা। একজন পরিচালকই হচ্ছেন সিনেমার প্রাণ, তিনি যেভাবে চাইবেন সেভাবে সিনেমা নির্মিত হবে। আকরাম খান কাজটি যথাযথভাবে করেছেন, তার পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন।

মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার – ২০১৭ তে সমালোচক ক্যাটাগরিতে তিনটি পুরস্কার পেয়েছে ‘খাঁচা’। সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক (আকরাম খান) ও সেরা অভিনেতার (আজাদ আবুল কালাম) পুরস্কার ঝুলিতে পুরেছে ‘খাঁচা’। পুরস্কার না পেলেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন জয়া আহসান ‘সরোজিনী’ চরিত্রের জন্য।

‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটির শুটিং হয়েছিল নড়াইল জেলায়। কিছু অংশের শুটিং হয় মুন্সিগঞ্জের দোহার ও নাটোর জেলার রাণীভবানীর জমিদার বাড়িতে। শুটিং লোকেশান উপযুক্ত ছিল বলেই সিনেমাটি মূল গল্পের আবহ ধরে রাখতে পেরেছিল।

আমি ‘খাঁচা’ চলচ্চিত্রটি দেখেছি ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখতে হবে বড়পর্দায়, সেখানে না হলে সিডি বা ডিভিডি কিনে, কিংবা হালের স্ট্রিমিং মিডিয়ায়। যেভাবেই হোক সঙ্গে থাকতে হবে বাংলা চলচ্চিত্রের। তবেই সুদিন ফিরবে, সহসা না হোক কোন একদিন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।