খালিদ হাসান মিলু ও সঙ্গীতাঙ্গন কাঁপানো এক ট্র্যাজেডি

১২ টি অ্যালবাম, পাঁচ হাজারটির মত গান, ২৫০ টি সিনেমায় প্লে-ব্যাক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – খালিদ হাসান মিলুকে মনে রাখার অনেক কারণই আছে। অথচ, রোগ শোকে ও আর্থিক অনটনে একটা সময় পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাটাই ভীষণ কষ্টকর হয়ে উঠেছিল তাঁর জন্য।

হানিফ সংকেতের সৌজন্যে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে উঠে এসেছিল সেসব দিনের গল্প।

ইত্যাদির সেই পর্বে (বাঁ-থেকে) হানিফ সংকেত, প্রতীক হাসান ও খালিদ হাসান মিলু।

সেই অবস্থায় ইত্যাদিই তাঁকে সুযোগ দিয়েছিল। সুযোগ্য ছেলে প্রতীককে নিয়ে তিনি মঞ্চে উঠেছিলেন। দর্শক-শ্রোতাদের আবেগের জলধারায় ভাসিয়েছিলেন। যদিও, সেই লড়াইটা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। লিভার সিরোসিসে ভুগে ২০০৫ সালের ২৯ মার্চ তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে তাঁর চলে যাওয়াটা ছিল বিশাল এক ট্র্যাজেডি।

খালিদ হাসান মিলু জন্মগ্রহন করেন ১৯৬২ সালে ৩ এপ্রিল পিরোজপুরের আদর্শপাড়াতে। মিলুর বাবা মোদাচ্ছের আলী মিয়া ছিলেন স্থানীয় ‘গুনাইবিবি’ পালা গানের সাথে জড়িত। বাবা গানের মানুষ হিসেবে ছোট্ট মিলুরও ছিলো গানের প্রতি বিশেষ এক ঝোঁক। এর কারণে তাঁর গানের প্রতিভাও বিকশিত হয় দ্রুত। বাবার হারমোনিয়াম দিয়েই মিলুর গানের সাধনা শুরু।

তিনি ওস্তাদ রবীন দাস,সুরেশ দাস সহ আরো কয়েকজনের কাছে সংগীত বিষয়ে তালিম নেন। তার তালিম নেয়া তখন পূর্নতা পায় যখন তিনি ১৯৭৮ সালে খুলনা বেতারে তালিকাভুক্ত শিল্পি হন। খুলনায় তিনি ‘স্পার্টান’ একটি ব্যান্ডও গঠন করেন।

সংগীতে নিজেকে আরো বিকশিত করতে খালিদ হাসান মিলু ১৯৮৩ সালে ঢাকায় চলে আসেন। সে বছরই আকবর কবির পিন্টু পরিচালিত আলী হোসেনের সুরে ‘কালো গোলাপ’ ছবিটির মাধ্যমে প্রথম চলচ্চিত্রে গান করেন।

পারিবারিক ছবিতে মিলু

খালিদ হাসান মিলু এদেশের দর্শক শ্রোতাদের কাছে প্রথম আলোচিত হন ১৯৯১ সালে এহতেশাম পরিচালিত ও আনোয়ার পারভেজের সুরোরপিত ‘চাঁদনী’ ছবিটির অভাবনীয় সাফল্যের পর। ছবিতে তার গাওয়া গান দর্শক শ্রোতারা দারুণ ভাবে গ্রহন করে।

তার ঠিক দুই বছর পর অথাৎ ১৯৯৩ সালে ‘মৌসুমী’ চলচ্চিত্রের ‘সেই মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে কিনা’ গানটি তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তায় নিয়ে যায়। এর প্রেক্ষিতে তিনি গাইতে থাকেন একের পর এক সব চলচ্চিত্রে।

১৯৯৪ সালে শাহাদাত হোসেন পরিচালিত ও জালাল আহমেদের সুরোরপিত ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ ছবির ‘ভালোবাসা ভালোবাসা মানেনা কোন পরাজয়’ গানটির মাধ্যমে পান শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৯৭ সালে মোরাম্মদ হান্নান পরিচালিত ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে ‘প্রানের চেয়ে প্রিয়’ ছবির ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়’ গানটি অমর হয়ে থাকার মতই একটি গান।

মিলু শুধু চলচ্চিত্রেই প্লেব্যাক নয়, ১৯৮০ সালে প্রথম ‘ওগো প্রিয় বান্ধবী’ অ্যালবাম-সহ ১২ টি সলো অডিও ও বহু মিক্সড অ্যালবামে কাজ করেছেনভ তাঁর উল্লেখ্য যোগ্য একক আলবামের মধ্যে ‘প্রতিশোধ নিও’, ‘নীলা’, ‘শেষ ভালোবাসা’, ‘শেষ খেয়া’ অন্যতম।

খালিদ হাসান মিলু ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা পলাশ

শুধু গান নয়, তিনি ছিলেন বেশ সুদর্শন। অবলীলায় সিনেমায় নায়ক হতে পারতেন। তবে, সে পথে পা বাড়াননি।

তবে, ভিষণ স্টাইলিশ ছিলেন। কথা কম বলতেন, তবে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন – এক কথায় নিপাট ভদ্রলোক। প্রায়ই ইত্যাদি-তে তাঁকে দেখা যেত। চিত্রায়নেও বরাবরই তার নায়কোচিত দর্শন প্রশংসিত হত।

এক ফ্রেমে মিলুর সাথে সঙ্গীতাঙ্গণের অনেকগুলো মুখ

১৯৯১ সালে বিটিভিতে প্রচারিত ‘গ্রামকথা’ নাটকে নুরুজ্জামান শেখের লেখা ও বদরুল আলম বকুলের সুরে মিলুর গাওয়া সেই হৃদয়স্পর্শী গান ‘কতদিন দেখিনা মায়ের মুখ’ গানটি যেনো আমাদের গ্রাম বাংলার কথা মনে করিয়ে দেয়!

খালিদ হাসান মিলুর যোগ্য উত্তরসূরী দুই ছেলে প্রীতম হাসান ও প্রতীক হাসান। দু’জনই গায়ক ও মিউজিক কম্পোজার। দু’জনই সঙ্গীতাঙ্গনে বেশ প্রতিষ্ঠিত। দুই ভাই এক সাথে হলে কি করতে পারেন সেটা ‘বিয়াইন সাব’ কিংবা ‘গার্লফ্রেন্ডের বিয়া’ মিউজিক ভিডিওগুলোতেই দেখা গেছে। এই দু’জনের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গন, বেঁচে থাকবে খালেদ হাসান মিলুর ঐতিহ্য!

গুরু আজম খানের সাথে মিলু

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।