প্রেম হতে পারে বিয়ের পরও!

না, গল্পতে আহামরী কিছু নেই, কিন্তু এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে ছবিটা যে কারো কাছেই অসাধারণ মনে হত বাধ্য। যেকোনো ছবির ক্ষেত্রেই আসলে শুধু গল্প ভাল হলে চলবে না, গল্পটার উপস্থাপনাও হতে হবে দৃষ্টিনন্দন। বিয়ের পরেও যে প্রেম হতে পারে – সেই গল্পটা ‘কেত্তিওলানু এঁটে মালাকা’র মত সুন্দর করে যেন আর বলার উপায় নেই।

ছবির গল্পটা খুবই সাদামাটা কিন্তু সুন্দর।

স্লিভা পরিচয়ে কৃষক হলেও ৬৫ একর জমির পাশাপাশি দু’টি দালানের মালিক। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে স্লিভা একমাত্র ভাই। এমনকি বয়সেও সবার চেয়ে ছোট। চার বোনের বিয়ে হয়ে স্বামীর বাড়িতে চলে বিশাল বাড়িতে একা পড়ে যায় স্লিভা ও তার বৃদ্ধা মা। তাই প্রায়শ স্লিভার বোনরা তাঁকে খোঁচা দিয়ে বেড়ায় এখনো বিয়ে করে সংসারী হচ্ছে না বলে। কিন্তু স্লিভার জীবনে মেয়ে বলতে তার মা আর বোনেরাই সব ছিলো।

তাই সে সহসা কর্ণপাতই করতো না বিয়ে বিষয়ক কোনো আলাপে। স্লিভার বৃদ্ধা মায়েরও খুব শখ ছেলের বউ দেখার। সবার জোড়াজুড়িতেও স্লিভার বিয়ের ব্যাপারে কোন সম্মতি আনতে পারলো না। এমনকি আজ পর্যন্ত সম্মন্ধ নিয়ে আসা কোন মেয়েই দেখতে পর্যন্ত যায়নি।

আকস্মিকভাবে একদিন স্লিভার বৃদ্ধার মা বেহুঁশ হয়ে পড়ে যাওয়াতে সরলমনা স্বভাবের স্লিভার টনক নড়ে। বুঝতে এতবড় বাড়িতে সত্যি কাউকে সর্বক্ষণ তার মায়ের যত্ন নেওয়ার মতো থাকা উচিৎ। অনেকটা আগ বাড়িয়ে বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি জানায় স্লিভা। চার্চের ফাদারের পক্ষ থেকে আঙ্গামালির রিন্সির সাথে স্লিভার সমন্ধের ব্যাপারটা সামনে আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রিন্সি বর্তমানে তার শয্যাশায়ী মায়ের সেবা করছে। ব্যস, এইটুকুই স্লিভার মনে ছুঁয়ে যায়। রিন্সিকে দেখতে যাওয়ায় তার পরিবারকেও জানায়- সে বেশি কিছু চায় না। সে কেবল চায় তাঁর মাকে রিন্সি যেন নিজের মায়ের মতো যত্ন নেয়। এইটুকুই তাঁর জন্য যথেষ্ট।

স্লিভা-রিন্সির বিয়ের পরেও স্লিভা খুব একটা মিশতে পারছিলো না স্ত্রী রিন্সির সাথে। স্লিভা রিন্সির সাথে অভ্যস্ত হতে পারে, উল্টো অনভ্যস্ততাবশত তাঁকে এড়িয়ে চলতে থাকে। ব্যাপারটি লক্ষ্য করে রিন্সি তাঁর কারণ জানতে চায়। কিন্তু স্লিভা গ্রামের সদস্যদের স্ত্রীর উপর জোরপূর্বক কর্তৃত্ব বজায় রাখার ব্যাপারটি মাথায় রেখে কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করে বসে৷ রক্তাক্ত রিন্সি হাসপাতালে ভর্তি হওয়াতে গ্রামজুড়ে স্লিভার চরিত্রেও দাগ লাগে।

সিনেমার সিকোয়েন্স গুলো এত চমৎকার ভাবে পরিবেশন করা  হয়েছে যার মুগ্ধতা ছড়িয়েছে সমগ্র সিনেমা জুড়ে। স্লিভার রিন্সিকে দেখতে যাওয়ার পর্বে খুব সুন্দরভাবে যেভাবে স্লিভার চমৎকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের রূপায়ন করেছেন। অন্যদিকে রিন্সির উপেক্ষিত হওয়ার সিকোয়েন্সে সরল প্রকৃতির স্লিভার অজ্ঞতাার ব্যাপারগুলো বোঝা যায়। রিন্সি চরিত্রটিও রঙধনুর মতো বৈচিত্র‍্যময়। কখনো সে অবলীলায় মিশে গিয়েছে, আবার কখনো সোচ্চার হয়ে উঠেছে আত্মসম্মানবোধের জন্য। যদিও, শেষ অবধি তাঁদের সম্পর্কটা পূর্ণতা পায় অনেক জল ঘোলার পর।

পরিচালক নিসাম বাশিরের একেবারে নতুন কাজ হলেও পাকাপোক্ত কাজের মুগ্ধতার চাদরে মুড়িয়ে নিয়েছে। ফ্রেমিং ছিল দৃষ্টিনন্দন, চমৎকার কালার গ্রেডিং সহ শব্দগ্রহণের অভিনব সুনিপুণ ব্যবহার সিনেমাকে বেঁধেছে অভাবনীয় শিল্পরূপে।

মূল চরিত্রে আসিফ আলূ তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা একটি চরিত্র পেয়ে নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়েছেন অভিনব কায়দায়। স্লিভা চরিত্রের এমনভাবে মিশে গিয়েছেন ঘুনাক্ষরেও মনে হবে না চরিত্রটি বাস্তব নয় আদৌ কোন সিনেমার। স্লিভা চরিত্রটির ধরণ ও আবেগের সাথে এমন ভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন যে, কাজটা দর্শক আজীবন মনে রাখতে বাধ্য।

রিন্সি চরিত্রে বিনা নন্দকুমার যথেষ্ট মার্জিত সাবলীল কাজ করেছেন। আপনিও ভালোবাসায় পড়ে যাবেন চরিত্রের পেছনে থাকা মানুষটির অভিনয়ের। এছাড়াও প্রত্যেকটি সূক্ষ চরিত্রগুলো এমন যেন সেগুলো আমাদের চারপাশেরই মানুষগুলোতে পর্দায় দেখা গেছে।

ছবিটিতে সামাজিক-পারিবারিক এক অনবদ্য বার্তাও আছে। সেটা হল, আধুনিক ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও কাছের মানুষটিকে যথেষ্ট সময় দেয়া উচিৎ, তাকে বোঝা উচিৎ, নিজের চাওয়াটাও তার কাছে পরিস্কার করা উচিৎ। নিজেদের মধ্যে আস্থার জায়গাটা ততটাই শক্ত হওয়া উচিৎ, যতটা হলে কারো সামান্য কথাটা সেটা ভাঙবে না। তাহলেই সংসার হবে সুখের স্বর্গ!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।