কিটো ডায়েট: মিথ বনাম বাস্তবতা

কিটোজেনিক ডায়েটের বিপ্লব চলছে স্যোশাল মিডিয়ায়। সবার মুখে মুখে কিটো আর কিটো। যদিও, শুরু করার পরের সপ্তাহেই কিটো ফলো করা মানুষদের নানান সমস্যার কথাও শোনা গেল। লেখাটা তাদের জন্য যারা কিটো করছেন, করে ধরা খেয়েছেন বা করবেন বলে ভাবছেন তাদের জন্য।

শুরুতে চলে আসি কিটোজেনিক ডায়েট নামখানা এসেছে কোথা থেকে?

আমাদের শরীরের প্রধান খাদ্য/জ্বালানী হল গ্লুকোজ। কিন্তু যদি কোন কারনে গ্লুকোজ শেষ হয়ে যায় তবে দেহ একটি বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে। সেই বিকল্প জ্বালানি গুলাকে বলা হয় কিটোন বডি। কিটোন বডি থেকেই এসেছে কিটোজেনিক ডায়েট। কিটোন বডির মধ্যে রয়েছে- এসিটোন, এসিটো-এসিটিক এসিড এবং বিটা-হাইড্রক্সি-বিউটারেট।

নাম পড়ে দাত ভেঙে গেসে তাই না? আসেন এবার ভাঙা দাত জোড়া লাগাই। আমরা যখন কিটো ডায়েট করি তখন আমাদের প্রধান টার্গেট থাকে গ্লুকোজের বদলে কিটোন বডিগুলা জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা। এখন প্রশ্ন হল, কিটোন বডি জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করলে কিভাবে ওজন কমবে? এই কিটোন বডিগুলা তৈরি হয় আমাদের ফ্যাটি টিস্যু ভাঙনের ফলে। সুতরাং আপনি যখন কিটোসিসে চলে যান অন্যভাবে বললে শরীরে গ্লুকোজ সাপ্লাই বন্ধ করে দেন তখন শরীর তার বিকল্প জ্বালানী ব্যবহার করার জন্য ফ্যাটি টিস্যু ভাংগা শুরু করে দেয়। ব্যাস কেল্লাফতে! আপনিও খুশি হয়ে যান উন্নতি দেখে।

এখন কথা হল কিটো ডায়েট কিভাবে করে?

অনেক পুষ্টিবিদ অনেকভাবে এটাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। সবাই একটাই কথা বলেছেন, কার্বোহাইড্রেট কে বাদ দিয়ে ফ্যাট আর প্রোটিন খাও।সর্বজন স্বীকৃত একটা ফরমুলা আছে। সেটা হল- ৬০% ফ্যাট + ৩০% প্রোটিন + ১০% কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট।

এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, কিটোতে কার্বোহাইড্রেট দরকার পড়ল কেন? রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমার পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই। আমাদের পরাণ তো কার্বোহাইড্রেট (ভাত) চায়। পরাণকে খুশি করার জন্য তো কিছু করা দরকার। তাই কিটোতে কিছু পরিমান কার্ব যোগ করে আপনার পরাণকে খুশি করানো হয়েছে যেন আপনি কিটো শুরু করে ৩ দিনের মাথায় ছেড়ে না দেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারন আছে, কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট আমাদের পায়খানার পরিমাণ বৃদ্ধি করে কারণ ইহা ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ। এইটুকু কার্বোহাইড্রেট না খেলে আপনি ভয়াবহ কোষ্ঠকাঠিন্য’র শিকার হবেন।

এখন কথা হল কিটো শুরু করলে কি সুবিধা?

  • অল্প সময়ে প্রচুর ফ্যাট কমানো যায়।
  • ফ্যাট আর প্রোটিন খাবেন তাই পেট খালি থাকবে না। আর যাই হোক না খেয়ে ডায়েট করা থেকে অনেক আরামের।
  • শরীরে পেশীর পরিমাণ কমবে না কিন্তু মেদ কমে যাবে।

অনেক ভাল লাগছে। তাই না? সহজেই তো সমাধান পেয়ে গেলেন স্লিম হবার। ৩০০ টাকার এনার্জি বালব মাত্র ১০০ টাকায় পেলেই কি জিনিসটার মান ভাল হয়? খুব বেশি খুশি হবার আগে কিটোতে কি কি ক্ষতি হতে পারে সেটা জেনে নেই-

  • অতিমাত্রায় ফ্যাট খাবার কারনে গলব্লাডারে সমস্যা হবার সম্ভাবনা ২০০-৩০০ গুন বেড়ে যাবে, ব্লাডে কোলেস্টেরল এর পরিমান বেড়ে যাবে, কোলেস্টেরল বাড়লে হার্টের বারোটা বাজতে দেরী হবে না।
  • এই কিটোন বডিগুলা শরীর থেকে বের হয় কিডনির মাধ্যমে। অতিমাত্রায় কিটোন বডির জন্য কিডনিজনিত সমস্যা হবার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। আরেকটি খুব কমন রোগ হতে পারে যার নাম সোজা বাংলায়, এই রোগ হলে পায়ের বুড়া আংগুলে ইউরিক এসিড জমা হয়ে প্রচণ্ড ব্যথা হবে। স্বাভাবিক হাটা চলায় সমস্যা হবে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য তো নিশ্চিতভাবে হবে। যাদের আগে থেকেই এই সমস্যা আছে তাদের তো খবর ই আছে।
  • কিটো ডায়েট শুরু করার কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হয় কিটোন ফ্লু নামক উপসর্গ। কিটোন ফ্লুতে- জ্বর, মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘুরানো, বমি বমিভাব, দূর্বলতা ইত্যাদি দেখা দেয়। মনে রাখবেন, এই কিটোন ফ্লু সবার হয় না। বিস্তারিত জানার ইচ্ছা থাকলে গুগল মামাতে কিটোন ফ্লু লিখে সার্চ দিলেই সব পেয়ে যাবেন।

বাঙালি এবং কিটো ডায়েট কতটুকু প্রাসঙ্গিক?

ডায়েটিং এ সফলতা কিন্তু অনেকখানি জেনেটিক ব্যাপারের উপর নির্ভর করে। যেমন আপনারা দেখবেন, সেইম ডায়েট সিস্টেম ফলো করে কেউ মাসে ৫ কেজি কমায় আর কেউ ২ কেজি। আমাদের বাঙালিদের প্রধান খাবার ভাত যার কিনা ৯০% ই কার্বোহাইড্রেট। মানে আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাদ্যতে অভ্যস্ত।

তাহলে আমাদের পরিপাক এনজাইমের অধিকাংশই কার্বোহাইড্রেট ভাঙার এনজাইম। সেই হিসাবে প্রোটিন এবং ফ্যাট ভাংগার এনজাইম তুলনামূলক কম। তাই হঠাত করে কেউ যখন প্রচুর প্রোটিন এবং ফ্যাট খাওয়া শুরু করে তখন শরীরের এনজাইম এত বেশি ফ্যাট বা প্রোটিন ভাঙতে পারে না।

ফলে সৃষ্টি হয় নানান সমস্যা। এই কথা আমার নিজস্ব কথা না। এই কথা বলেছেন কানাডার ডাক্তার জ্যাসন ফেঙ (এই লোকের দুইটা এফসিপিএস ডিগ্রী আছে, একটা মেডিসিনে আরেকটা ইউরোলজিতে)। তাঁর মতে এশিয়ানদের কিটোতে রিস্কের পরিমান অনেক বেশি। তিনি এশিয়ানদের কিটোর পরিবর্তে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

কিটো করে আপনি সফলতা পাবেন সহজেই, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেখেছেন কি?

এবার কিটো করবেন, নাকি করবেন না সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার। এরপরও যারা কিটো করবেন তারা দিনে ৪-৫ লিটার পানি খেতে ভুলবেন না। পানি কিটোর ক্ষতির পরিমাণ অনেকখানি কমাবে। গ্রুপে দেখেছি কেউ কেউ কিটো ডায়েটের চার্ট বানিয়ে দিয়েছেন যেখানে কোন রেশিও মানা হয় নাই। কারো মনগড়া চার্ট/আলটিমেট সলিউশন ফলো করে বিপদে পড়বেন না। অনেকেই সেই চার্টগুলা ফলো করে বিপদে পড়েছেন। কিটো ডায়েট করতে চাইলে ভালো পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হোন।

এখানে দেয়া প্রত্যেকটা তথ্য বিভিন্ন বই, ব্লগ, লেকচার এবং গবেষণা পত্র থেকে সংগ্রহীত। সেই লেখাগুলি আমি সহজ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছি। কোন ভুল-ত্রুটি থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কোনো বিষয়ে বুঝতে সমস্যা হলে জানাতে পারেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।