একজন ব্যর্থ মানুষের আত্মহত্যার চেষ্টা ও কেএফসির উত্থান

পাঁচ বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। ১২ বছর বয়সে তাঁর মা নতুন করে বিয়ে করলে সৎ বাবার আশ্রয়ে খুব বেশিদিন কাটাতে পারেননি তিনি। ভয়ানক আর্থিক অনটনে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পড়াশুনোতেও ইতি টেনে নেমে পড়েন কাজের খোঁজে।

কাজ তো পাওয়া যায়, কিন্তু ঠিকঠাক বনিবনা হল না মালিক বা সহকর্মীদের সাথে। ফলে ১৭ বছরের মধ্যে মোট চার বার চাকরি হারান তিনি। এমতাবস্থায় ১৮ বছর বয়সেই বসে পড়েন বিয়ের পিঁড়িতে। দু’চোখ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে এই সময়ে তিনি আইন কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন কিন্তু অকৃতকার্য হন।

১৯ বছর বয়সে তিনি বাবা হলেন এক ফুটফুটে কন‍্যাসন্তানের। সময়ের নিয়মে সংসার বেড়েছে, বেড়েছে খরচের চাপও। সাধ আর সাধ‍্যের বিস্তর ফারাকের সাথে সাথে সংসারের অশান্তিও বাড়তেই থাকে ক্রমশ। অবশেষে, ২০ বছর বয়সে তার স্ত্রী তাঁকে ফেলে রেখে চলে যান। একমাত্র মেয়েটিকেও নিয়ে যান সাথে করে। কপালটা বরাবরই খারাপ ছিল তাঁর!

বিপর্যস্ত মানুষটি কাজের খোঁজে হন্যে হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে লাইনে দাঁড়ান এবং যথারীতি সেখানেও ব্যর্থ হন।  ইনস্যুরেন্স কোম্পানীতে যোগদান করেন এবং সেখানেও সফলতার দেখা পাননি। চাকরি নিয়েছিলেন রেল লাইনের কন্ট্রাকটর হিসেবে, সুবিধে করতে পারেননি সেখানেও, অল্পদিনের মধ‍্যেই সে চাকরিটাও চলে যায়। অবশেষে একটি ছোট ক্যাফেটেরিয়ায় থালা-বাসন ধোয়া এবং রাঁধুনির সহায়কের স্থায়ী কাজ পান।

কিছুটা আর্থিক সংস্থান হলে, এই সময়ে তিনি তাঁর স্ত্রীকে মানিয়ে, ঘরে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলেন, কিন্তু স্ত্রী রাজি হননি কিছুতেই। তবু, পিতৃস্নেহ যে কিছুতেই বাঁধ মানেনা। অনন‍্যোপায় হয়ে নিজের প্রাণাধিক প্রিয় কন‍্যাকে নিজেই অপহরণ করতে গিয়ে ধরা পড়ে ভীষণ রকম নাকাল হন। অগত‍্যা একলা, নিঃসঙ্গ জীবন, অবসন্ন দিনগুলো কেটে চলে দিনের নিয়মে।

৬৫ বছর বয়সে সেই ক্যাফেটেরিয়ার কাজ থেকেই অবসর নেন ব‍্যর্থ মানুষটা। অবসরে যাবার প্রথম দিন সরকারের কাছ থেকে ১০৫ ডলারের একটা চেক পেয়েছিলেন তিনি। সেটুকুই ঠিকঠাক নাড়িয়ে-চাড়িয়ে চলতে পারলে হয়তো কোনো মতে কেটে যাবে বাকি জীবন। তবু এই সময়ে ভয়ঙ্কর এক একাকিত্ব গ্রাস করে তাঁকে।

মনে হয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ভীষণই অযোগ্য, ব্যর্থ ও মূল্যহীন একজন মানুষ। হতাশ, অবসন্ন, স্ত্রী-কন‍্যার ভালোবাসা-বর্জিত, নিংসঙ্গ মানুষটি হঠাৎ-ই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন আত্মহত্যা করার। একগাছি দড়ি হাতে নিয়ে একটি গাছের নিচে গিয়ে বসলেন তিনি।

মাথার মধ‍্যে হাজারো ভাবনার জটলা; স্ত্রী, কন‍্যা, প্রত‍্যাখ‍্যান, ব‍্যর্থতা, হতাশা, জীবনের সাধ-আহ্লাদ, চাওয়া-পাওয়া না-পাওয়া, ১০৫ ডলারের পরিণতি, আরও কত কী! হঠাৎ তাঁর মনে হলো, জীবনে এখনো অনেক কিছুই করা বাকি আছে। অন্য সবার চাইতে একটি ব্যাপারে তিনি একটু বেশিই জানেন, আর তা হলো ‘রন্ধনশিল্প’। ক্যাফেটেরিয়ায় কাজ করার সময়ে তিনি সেটি বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন।

যেমন ভাবনা তেমনি কাজ, দড়ি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ফিরে এলেন নিজের ভাঙাঘরে। অবসরের দিনে পাওয়া ১০৫ ডলারের চেকের বিপরীতে ৮৭ ডলার ধার করে, সেই ডলার দিয়ে কিছু মুরগি কিনে এনে, নিজের তৈরি রেসিপি দিয়ে সেগুলো ফ্রাই করলেন। তারপর একটি সামনে কাঁচ লাগানো টিনের বাক্সে করে আমেরিকার কেন্টাকিতে প্রতিবেশিদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে শুরু করলেন। সেই থেকে ফ্রাইড চিকেন বিক্রি করার সূচনা।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ১৯৩০ সালের, ২০ মার্চ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি তৈরি করে ফেলেন সম্পূর্ণ নিজের একটি রেস্তোরাঁ কেন্টাকি ফ্রাইড চিকেন, অধুনা লোকেরা যাবে কেএফসি বলতে এক নামে চিনে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য দেশে আছে এই রেস্টুরেন্টের চেইন।

৬৫ বছর বয়সে যে ব‍্যর্থ মানুষটা আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন সেই তিনিই এই অভূতপূর্ব ঘটনাটা ঘটিয়েছেন। তিনি হলেন কর্নেণ হারল্যান্ড ডেভিস স্যান্ডার্স। কর্নেল স্যান্ডার্স নামেই তিনি বেশি পরিচিত। ৮৮ বছর বয়সে এসে বনে গেলেন কোটিপতি। ১৯৫০ সালে কেন্টাকির গভর্ণর তাকে ‘কর্নেল’ উপাধি দেন যা একটি পক্ষ থেকে তাঁর নাগরিককে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মাননা।

এরপর স্যান্ডার্স নিজের আইকনিক লুকের জন্য সাদা স্যুট এবং কেন্টাকি কর্নেল টাই পরিহিত হয়ে সবার সামনে ধরা দেন। আর এই পোশাকই তাকে আধুনিক যুব সমাজে অন্যতম আইকন হিসেবে জাহির করে।

হ‍্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন, আজকের পৃথিবীতে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন কেএফসি’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। বর্তমানে সারা পৃথিবীর প্রায় ১২৫ টা দেশ জুড়ে কেএফসি’র ২০হাজার-এরও বেশি শাখা আছে  আর সম্পদের পরিমাণ? কয়েক লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।