কৌশানি: হিমালয়ের ব্যালকোনি

কৌশানি পৌঁছে, গাড়ির জানালা দিয়ে ডান দিকে তাকিয়েই মনে হল যেন হিমালয়ের ব্যালকোনিতে চলে এসেছি আমরা! একদম সে রকমই অনুভূতি হয়েছিল সেই শেষ বিকেলের রক্তিম হয়ে ওঠা হিমালয়ের রেঞ্জ দেখে। একদম চোখের সামনে, হাত ছোঁয়া দুরত্বে যেন দাড়িয়ে আছে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমাদের বাসার জানালা দিয়ে আমরা যেমন বেলকোনির গাছ দেখি, ফুল দেখি, ঠিক তেমনই যেন হিমালয় তার বেলকোনি থেকে আমাদেরকে দেখছে। আমরা তার ব্যালকোনিতে দাড়িয়ে আছি, তার দিকে চেয়ে থেকে!

নৈনিতাল থেকে কৌশানির দুরত্ব ১০০ কিলোমিটারের একটু বেশি। ড্রাইভার বলেছিল মোটামুটি তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমরা কৌশানি পৌঁছে যেতে পারবো। আর পথের বিশ্রাম, এখানে সেখানে থামা, খাওয়াসহ ধরলে ৫ ঘণ্টা লাগবে। যেহেতু নিজেদের ফুল টাইম রিজার্ভ করা গাড়ি, তাই নৈনিতাল থেকে বেশ একটু হেলেদুলেই বেরিয়েছিলাম সেদিন সকালে।

ইচ্ছে করেই একটু দেরি করেছিলাম সবাই। কারণ, এই আভিজাত্যে ভরপুর পাহাড়ি লেকের পাড়ে আর তো ফেরা হবেনা এবারের মত। মাত্র দুই দিনেই নৈনিতাল আমাদেরকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে। তাই আর একটু যদি থেকে যাওয়া যায়।

শেষ পর্যন্ত সকাল নয়টার পরে রওনা হলাম কৌশানির দিকে। পথের মাঝের নাশতা, সবুজ নদীর তীরে অলস দুপুর, পাহাড়ি নদীর টানে সেখানে কিছুটা সময়, আলমোরাতে একঝলক, আলমোরা থেকে কৌশানির পথের অপূর্ব সবুজ পাহাড়ি ঢালে কিছু অলস সময় কাটিয়ে, নিজেদের ইচ্ছামত ধীরে ধীরে যখন কৌশানি পৌছালাম তখন শেষ বিকেল।

একদম শতভাগ নতুন একটা জায়গা কৌশানি। তেমন কোন পড়াশোনাও করা হয়নি এই জায়গা নিয়ে। এমনকি ড্রাইভারও নাকি আগে আসেনি এদিকে! (যদিও আমি বিশ্বাস করিনি সে কথা)। মূল শহরের বাস স্টপের সাথের তিনদিকে দিনটি রাস্তা চলে গেছে দেখতে পেলাম ট্র্যাফিক মোড় থেকেই। একটি উপরের দিকে আর দুটি পথ একটু ঘুরে দু’দিকে।

মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলাম উপরে নয়, একটু ঘুরে নিচের দিকে যে দুটি পথ গেছে সেদিকে যাবো। যেহেতু আমাদের কোন হোটেল ঠিক করা নেই, সেহেতু যে কোন দিকেই আমরা যেতে পারি। ড্রাইভার একটু নিমরাজি হয়েই আমার দেখানো পথে গাড়ি ঘোরালেন। সেই পথে ঢুকতেই একই সাথে দু’টি পথে আবারো।

একটি একটু নিচের দিকে গিয়েছে অরণ্যর মাঝে আর একটি বেশ উঁচু পাহাড়ি পথে। এবার ড্রাইভারকে উঁচু পাহাড়ি পথে যেতে বললাম। কেমন যেন একটা হিমালয় হিমালয় গন্ধ পাচ্ছিলাম অবচেতন মনেই। যদিও আমি এর আগে কোনদিন এদিকে আসিনি, তবুও মনে হল যেন হিমালয় খুব খুব কাছে! এক অবাক অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হলাম এই ভাবনা পেয়ে বসায়।

আর বিধাতার কি অসীম উপহার আমাদের জন্য, গাড়ি মাত্র ১০ বা ২০ সেকেন্ড উঠতেই হাতের ডানে পুরো আকাশ জুড়ে রঙ বেরঙের হিমালয়ের চূড়া গুলো আমাদেরকে স্বাগত জানাতে লাগলো তার অপরূপ রূপের মাধুরী দিয়ে। এই রকম সময়ে নিজেকে দুই একবার বাহবা না দিলে সেটা নিজের সাথে নিজেরই প্রতারণা করা হবে। এই জন্য আমি সবসময় আমার মনের কথা শুনি, মন যা চায় তাই করি, মন যা বলে সেই অনুযায়ী চলি! হ্যাঁ অবশ্যই মনের এই কথা শুনতে কেউ যেন কোন রকম ক্ষতির সম্মুখীন না হয় বা কারো কোন সমস্যা যেন না হয় সেটাও সবসময় মাথায় রাখি।

আমাদের গাড়ি গিয়ে থামল একদম পাহাড়ের শেষ বিন্দুতে। যে পাহাড়ের শেষ থেকেই উপরের দিকে উঠে গেছে পাথুরে সিঁড়ি বা পথ। যে পথের উপরেই একটি ধবধবে সাদা রঙের দু’তলা হোটেল দাড়িয়ে আছে আর একটি পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে। আহ কি অপূর্ব, প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেল মুহূর্তেই। সারাদিনের বেশ ক্লান্তিকর জার্নির অবসাদ দূর হয়ে গেল নিমিষেই।

যে হোটেলের সামনের বিশাল খোলা লন থেকে শুধু হিমালয় দেখা যায়, শুধুই হিমালয়, আর কিছু নয়। যখন যে রকম আর যে রঙের হিমালয় আপনার দেখতে মন চাইবে, তখন সেই রকম হিমালয়ের রূপ আপনি দেখতে পারবেন, সেই উন্মুক্ত লন থেকে, হোটেলের যে কোন রুমের ব্যালকোনি থেকে বা রুমের কাঁচের জানালার পর্দা সরালেই।

আমরা অনেকক্ষণ সেখানে বসে থাকলাম। হোটেল ম্যানেজারকে বলে রুমের খোঁজ নিতে লাগলাম। সব রুমই প্রায় বুকড। তবে দুটি রুমের বোর্ডার তখনো এসে পৌছায়নি বলে ম্যানেজার খোঁজ নিতে লাগলেন, তারা আদৌ আসবে কিনা? মনে মনে খুব করে চাইছিলাম, যেন যারা বুকড করেছে সেই রুম দুটি, তাঁরা যেন জানায়, যে আসতে পারছেনা।

কিন্তু না আমাদেরকে এবার আর অতটা ভাগ্য প্রসন্ন না করে উল্টো হতাশ করে জানালো নাহ রুম যারা নিয়েছিল তারা পথেই আছে, আসছে। মনটা একটু খারাপই হল, হিমালয়ের ব্যালকোনিতে থাকা হলনা দেখে। যদিও হোটেল ম্যানেজার অন্য হোটেলে কথা বলে তার সাথেই আমাদের অন্য হোটেলের শর্টকার্ট পথে পাহাড় চড়িয়ে নিয়ে গেলেণ। অন্য আর এক পাহাড়ের চুড়ার আভিজাত্যপূর্ণ সাগর হোটেলে।

ইশ! কি অপূর্ব ছিল সেই হোটেল, তার রুম, তার জানালা, তার বড় উন্মুক্ত চত্তর আর বিশাল ছাদ। যে ছাদ থেকে বসে বসে সারাদিন-রাত, সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা যখন আর যেভাবে খুশি দেখা যায় হিমালয়ের সকল রূপ, সবসময়। রাতের মেঘ মুক্ত আকাশে দেখামেলে লক্ষ-কোটি আলোকবর্তিকার অপার, অপূর্ব আর অপার্থিব কতশত মুহূর্তের। বলে বা লিখে শেষ করা যাবেনা কিছুতেই।

তবে দুঃখের কথা হল সেই হোটেলেও আমাদের থাকা হয়নি সেদিন, ভিন্ন কারণে। যদিও পরে হিমালয়ের ব্যালকোনিতেই থেকে ছিলাম শেষ পর্যন্ত। সেই গল্প পরে বলবো।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।