যে ছবি পাল্টে দিয়েছিল বলিউডের গ্যাঙস্টার ঘরানা

১৯৯৯ সাল। রাম গোপাল ভার্মার বৃহস্পতি তখন তুঙ্গে। বলিউডের সেরা পরিচালকের তালিকায় একদম প্রথম দিকেই উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম। আগের বছরই মুক্তি পেয়েছে তার বহুল আলোচিত ছবি সত্য। দুই কোটি বাজেটের সে ছবি আয় করেছে ১৫ কোটি রুপি। মনোজ বাজপেয়ী ও উর্মিলা মাতন্ডকার অভিনীত সেই ছবির কাহিনী রচনায় সৌরভ শুকলার সাথে ছিলেন তরুণ এক লেখক, নাম অনুরাগ কাশ্যপ। সেই সত্য শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই পায়নি, বদলে দিয়েছে বলিউডে গ্যাঙস্টার ঘরানার ছবির ইতিহাসও। আর পরিচালনায় মুনশিয়ানার স্বাক্ষর রেখে ভার্মা বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই ঘরানার ছবি নির্মাণে তার ধারেকাছেও কেউ নেই।

অবস্থাটা তখন এমন যে, ভার্মা যদি গ্যাঙস্টার ঘরানার জঘন্যতম ছবিটিও বানাতেন, দর্শকরা হলের বাইরে লাইন লাগাত টিকিট কেটে সেটি দেখার জন্য। কিন্তু ৯০ দশকের ভার্মা ছিলেন একদমই ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি সত্য ছবির অভাবনীয় সাফল্যের জোয়ারে ভেসে গেলেন না। পরিচালক হিসেবে নতুন কিছু করে দেখানোর খিদেটা তখন তাঁকে এতটাই উদ্বুদ্ধ করল যে, তিনি অসীম সাহসী এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন – এবার তিনি বানাবেন একটি নিরীক্ষাধর্মী ছবি। কেমন নিরীক্ষা? তিনি বানাবেন সাইকোলজিক্যাল-থ্রিলার ঘরানার একটি ছবি।

হ্যাঁ, আজকের দিনে হয়ত এই ঘরানার ছবি দর্শকদের কাছে ডালভাত হয়ে গেছে, কিন্তু সেই সময়ে এই ঘরানার ছবি বলিউডে কল্পনাও করা যেত না। অথচ সত্য ছবির প্রধান দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী, তথা মনোজ ও উর্মিলাকে নিয়ে, তেমন একটি ছবিই বানাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন তিনি। এবং এবার তিনি পূর্ণ বিশ্বাস রাখলেন অনুরাগ নামের সেই তরুণ লেখকের উপর। অনুরাগ একাই এবার পুরো ছবির কাহিনী রচনা করলেন। নাম দিলেন, কউন।

বেশ অনেকগুলো দিক থেকেই ছবিটি হবে তৎকালীন বাণিজ্যিক বলিউডের থেকে আলাদা। প্রথমত, পুরো ছবিটিরই শ্যুটিং হবে কেবল একটি লোকেশনে: একটি বাড়ির ভিতরে। দ্বিতীয়ত, ছবিটিতে কোনো গানই থাকবে না। হ্যাঁ, নায়ক-নায়িকা বৃষ্টিতে ভিজে গানের সাথে তাল দিয়ে নাচা তো দূরে থাকুক, হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা কোথাও ঠায় বসে থেকেও কোনো গানের সাথে ঠোঁট নাড়াবে না! আর তৃতীয়ত, ছবির শুরুর অংশটা হবে খুবই ধীরগতির। মূল কাহিনীতে ঢোকার আগে প্রেক্ষাপটটা খুবই বিস্তারিতভাবে দেখানো হবে।

সবমিলিয়ে ছবিটির জন্য এমন একটা খসড়া দাঁড়া করানো হলো যে, ছবিটির ভাগ্যাকাশে কেবল একটি কথাই জ্বলজ্বল করছে: বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়বে ছবিটি। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ছবিটির শ্যুটিং শুরুর আগেই সবার জানা, ফ্লপ হবে ছবিটি। তা হোক, তবু ছবিটি তৈরী হবেই।

ছবির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করা উর্মিলা এর আগে শুধু সত্যই নয়, অভিনয় করেছেন জুড়াই ও রঙ্গিলার মত পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক ছবিতেও। সেসব ছবিতে তিনি চটকদার সাজ দিয়েছেন, প্রয়োজনের তুলনায় জাঁকালো অভিনয় করেছেন, এমনকি গানের সাথে কোমরও দুলিয়েছেন। তার জন্য গ্ল্যামারহীন একটি ‘আতঙ্কিত’ চরিত্রে অভিনয় করা সহজ বিষয় ছিল না। কিন্তু তিনি সেই কাজটিই করে দেখালেন অবলীলায়। ছবির শুরুতেই যে স্বপ্নের দৃশ্য আছে, সেখানে তিনি এতটাই নিখুঁত অভিনয় করলেন যে, ১৯ বছর বাদেও সেটি বলিউড ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন দৃশ্যগুলোর একটি।

দারুণ অভিনয় করলেন মনোজও। কিছু কিছু জায়গায় হয়ত একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললেন, কিন্তু মোটের উপর তিনি অসাধারণ। আর সুশান্ত সিংও নিজের যেটুকু দায়িত্ব ছিল, তা ঠিকঠাক পালন করলেন। অর্থাৎ ছবির বাজেটে যেটুকু ঘাটতি ছিল, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের অভিনয় দিয়েই যেন তা পুষিয়ে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন।

আর অনুরাগ নামের তরুণ সেই লেখক এমনই একটি গল্প ফেঁদেছেন যে, শুরুর আধাঘন্টা একটু বিরক্ত লাগলেও, এরপর থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত দম ফেলারও অবকাশ পাবে না দর্শক। থ্রিলার ঘরানার কাহিনী কীভাবে লিখতে হয়, তা যেন সমসাময়িক অন্য লিখিয়েদের হাতে-কলমে শেখানোর মহান দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

আর ছবির পরিচালনা? সেটি নিয়ে স্রেফ কোনো কথা হবে না। সেরা সময়ের মেসির পা থেকে যেমন জাদুকরী গোল হয়, কিংবা কোহলির ব্যাট থেকে কপি-বুক শট আসে, ভার্মার নির্দেশনায় যেন সেরকম কিছুরই দৃষ্টান্ত দেখা গেল। এমন এমন সব অ্যাঙ্গেলে দৃশ্যধারণের চিন্তা বেরোল তার মাথা থেকে, যা তখনকার বলিউডে ছিল অভূতপূর্ব।

সবমিলিয়ে সত্যিকারের মাস্টারপিস যাকে বলে, কউন ছবিটি যেন তাতেই পরিণত হলো। এটি এমন একটি সাইকো-থ্রিলার, যার প্রতিটা দৃশ্যেই দর্শক আক্ষরিক অর্থেই নিজের মনে প্রশ্ন খুঁজতে থাকবে, কউন! কউন! দর্শকের মনেই হবে না সে কোনো হিন্দি ছবি দেখছে। মনে হবে এ যেন কোনো আগাথা ক্রিস্টি ক্লাসিকের পর্দায় সফল উপস্থাপন।

কিছু কিছু ছবি আছে না যা দেখতে বসলে দর্শক সময়জ্ঞান ভুলে যায়, আশেপাশের পৃথিবীতে কী হচ্ছে না হচ্ছে কোনো খেয়াল থাকে না, বরং তার দৃষ্টি থাকে পর্দায় নিবদ্ধ, আর মন কাহিনীর ভেতর, কউন যেন ঠিক এমনই একটি ছবি।

আর অবিশ্বাস্য ব্যাপার কী জানেন, যে ছবিটির ফ্লপ হওয়া একদম নিশ্চিত ছিল, সেটি বক্স অফিসে খুব একটা খারাপ কিন্তু করেনি। তিন কোটি বাজেটের ছবিটি ভারতের বাজার থেকে আয় করেছিল চার কোটি, আর ভারতের বাইরে থেকে আরও তিন কোটি। অর্থাৎ ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে গড়পড়তা মানের হলেও, ছবির কলাকুশলীদের কাছে এ ছিল এক আশাতীত সাফল্য।

ছবিটি মুক্তির পর হয়ত খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, তবে সময়ের সাথে সাথে এটি পেয়ে গেছে কাল্ট হিটের তকমা। সর্বসাধারণ এ ছবির ব্যাপারে না জানলেও, সাইকো-থ্রিলার ঘরানার দর্শকরা ঠিকই জানে এবং ভালোবাসে এই ছবিটিকে।

সাধারণত বলিউড অন্য ইন্ডাস্ট্রি থেকে কাহিনী চুরি করে, বা অনুপ্রেরণা নেয়। কিন্তু ‘কউন’ একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এই ছবিটির কাহিনী অবলম্বনে প্রথমে তেলেগু ভাষায় একটি অফিসিয়াল রিমেক নির্মিত হয়েছিল, আর সর্বশেষ ২০১৪ সালে অনলাইনে মুক্তি পেয়েছে এই ছবির একটি ইংরেজি সংস্করণও, যার নাম ‘হু’জ দেয়ার’।

স্কুপহুপ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।