‘অভিনয় না জানা’ পরিশ্রমী এক গ্ল্যামারগার্ল

ক্যাটরিনা কাইফ নামটি শুনলে বা কোথাও দেখলেই এক ঐশ্বরিক সৌন্দর্য্যর অধিকারী অভিনেত্রীর কথা মনে পড়ে যিনি নাচ, অভিনয়, ফিটনেস, ফ্যাশন, ব্যক্তিগত জীবন সমস্ত কিছুই নিয়েই লাইমলাইটে অবস্থান করছেন প্রায় দুই দশক ধরেই। অভিনয় না জানা, শুদ্ধ ভাবে হিন্দি বলতে না পারা – ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হলেও তাঁর অধ্যবসায় নিয়ে কখনোই কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

১৯৮৩ সালের আজকের দিনে হংকংয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ক্যাটরিনা কাইফ। তাঁর বাবা ‘মোহাম্মদ কাইফ’ একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী যিনি কাশ্মীরি ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং তাঁর মা সুজান একজন ইংরেজ আইনজীবী। তবে মজার ব্যাপার হলো অন্যভাবে ক্যাটরিনা ইতালিয়ান নাগরিক। কারণ, তার মা ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাবার আগে ইতালির বাসিন্দা ছিলেন।

ক্যাটরিনার সাতজন ভাইবোন রয়েছে, তিনটি বড় বোন (স্টেফানি, ক্রিস্টিন এবং নাতাশা), তিনটি ছোট বোন মেলিসা, সোনিয়া এবং ইসাবেল এবং একটি বড় ভাই মাইকেল। তাদের ছোটবেলাতেই বাবা-মায়ের মধ্য বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তাই তিনি বাবার সান্নিধ্য পাননি বলেই চলে। তাদের মা একাই তাদের বড় করেছেন। খুব কম ভক্তই জানেন যে, ক্যাটরিনা কাইফ তাঁর আসল নাম নয়। তাঁর আসল নাম হল কেট টারকুট। এই গ্ল্যামার কন্যা কিন্ত কাগজে-কলমে পুরোদস্তর ইউরোপিয়ান। কার্যত তিনি হলেন অর্ধেকটা ভারতীয়, অর্ধেকটা ব্রিটিশ। তিনি বাবার সূত্রে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। ভারতে সিনেমায় কাজ করেন ওয়ার্ক পারমিটের ভিসা নিয়ে।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ক্যাটরিনা কাইফ একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতা জিতেছিলেন সেটার মাধ্যমে প্রথম মডেলিংয়ের অফার পান। মডেলিংয়ে সাড়া পাবার পরে তিনি লন্ডনে মডেলিং এজেন্সিগুলতে কাজ করতে থাকেন নিয়মিতভাবে। লন্ডন ফ্যাশন উইকে তার অংশগ্রহণ তাকে সেই সময় বেশ আলোচনায় নিয়ে আসে। একটি ফ্যাশন শোতে লন্ডন ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা কাইজাদ গুস্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তিনি।

সেখানেই বলিউডের সিনেমায় অভিনয়ের জন্য প্রস্তাব পান। প্রস্তাব পাবার পরে মডেলিং থেকে রুপালি পর্দায় নাম লিখিয়েছিলেন ক্যাট। তবে অভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন তেলেগু সিনেমা ‘মালিশ্বরি’ দিয়ে। সেখানে এক রাজকন্যার চরিত্র করেছিলেন ক্যাটরিনা। ক্যাটরিনার বিপরীতে ছিলেন তেলেগু ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার ভেঙ্কটেশ।

‘বুম’ দিয়ে তাঁর বলিউডে অভিষেক হয়। বুম সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০০৩ সালে। ‘মালিশ্বরি’ ২০০৪-এ মুক্তি পেলেও, বুমের আগেই তিনি এই সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। তবে বলিউডে ‘বুম’ সিনেমার মধ্য দিয়েই তার অভিষেক হয়। ‘বুম’ সিনেমার প্রযোজক সিনেমা মুক্তির আগেই তার নামের একটা অংশ পালটে দিয়েছিলেন। আর সেই পাল্টে দেয়া নামটাই এখন সিনেমাপ্রমী সবার মুখে মুখে।

‘বুম’ সিনেমায় আরো ছিলেন বলিউডের শাহেনশাহ অমিতাভ বচ্চন ও ব্যাডম্যান খ্যাত গুলশান গ্রোভার। ক্যারিয়ারের শুরুটা ক্যাটরিনার আজকের মতো এতো সুন্দর ছিল না। বি গ্রেড সিনেমা ‘বুম’ বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে। তারপরে ২০০৩ সালেই অনুরাগ বসুর পরিচালনায় ‘সায়া’ সিনেমাতে ক্যাটকে নিতে চেয়েছিলেন প্রযোজক মহেশ ভাট।

কিন্ত, ওই সময় ক্যাটরিনা একদমই হিন্দি জানতেন না। তাই, মহেশ ভাট নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। তবে, এখন সব পরিচালকরাই এখন চান ক্যাটরিনাকে। ক্যাটরিনা নিজেই তাঁর মানটাকে ওই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

আরো পড়ুন

২০০৫ সালে অভিষেক বচ্চনের সাথে ‘সরকার’ সিনেমায় সাফল্য পান ক্যাটরিনা। ঐ বছরেই সালমান খানের সাথে ‘ম্যায়নে পেয়ার কিউ কিয়া’ তাঁকে আলোচনায় নিয়ে আসে। ২০০৭ সালে ক্যাটরিনা কাইফ প্রথমবার সাফল্যর স্বাদ ব্যবসা সফল ‘নামাস্তে লন্ডন’ সিনেমার মধ্য দিয়ে।

একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় মেয়ের চরিত্রে অক্ষয় কুমারের সঙ্গে তার জুটিও জনপ্রিয়তা পায়। তারপর একই বছর হিট ‘আপনে’, সুপারহিট ‘পার্টনার’ এবং ব্লকবাস্টার ‘ওয়েলকাম’ তাঁকে বলিউডের শক্ত মাটিতে জায়গা করে দেয়। সিনেমাগুলোতে তার অভিনয় তেমন আলোচনায় না এলেও তার নাচ, গ্ল্যামার এবং সৌন্দর্য্য তাকে প্রথম সারির অভিনেত্রীর খেতাব এনে দেয়।

২০০৮ সালে আব্বাস-মুস্তানের ব্যবসাসফল ‘রেস’ সিনেমায় প্রথমবারের মতো নেগেটিভ শেডে দেখা যায় ক্যাটরিনাকে। এই সিনেমা নতুন করে তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। এই বছরেই অক্ষয় কুমারের সাথে ‘সিং ইজ কিং’ তাঁকে শীর্ষ নায়িকার দৌড়ে এগিয়ে নিয়ে অনেকখানি পথ। সালমান খানের সাথে ‘যুবরাজ’ বক্স অফিসে ব্যার্থ হলেও তাদের জুটি প্রশংসা পায়।

২০০৯ সালে জন আব্রাহাম এবং নীল নিতেন মুকেশের সাথে ‘নিউইয়র্ক’ সিনেমায় প্রথমবার তার অভিনয় আলোচনায় আসে। সমালোচক থেকে সাধারণ দর্শক সবার কাছেই তার অভিনয় প্রশংসা লাভ করে। বছরের শেষ দিকে রণবীর কাপুরের সাথে ‘আজাব প্রেম কি গজব কাহানি’ এবং অক্ষয় কুমারের সাথে ‘দে ধানা ধান’ দুটি সিনেমাই বক্স অফিসে ব্যাপক সফলতা পায়।

২০১০ সালে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিনয় সমৃদ্ধ সিনেমা ‘রাজনীতি’ নিয়ে হাজির হন। প্রকাশ ঝা পরিচালিত এই সিনেমায় তার চরিত্র কিছুটা ভারতের আলোচিত রাজনীতিবিদ কংগ্রেস প্রধান ‘সোনিয়া গান্ধী’র আদল দেখা যায়। একটি বিত্তশালী পরিবারের সহজ সাধারন মেয়ে হঠাৎ করে বিয়ের পর আকস্মিকভাবে তার রাজনৈতিক নেতা স্বামীকে হারানোর পর রাজনীতির মঞ্চে আসেন। এমন একটি কঠিন চরিত্রে সফলতার সাথে উতরে যান ক্যাটরিনা।

এই বছরের অন্যতম ডিজাস্টার সিনেমা ‘তিস মার খান’ সিনেমায় তার আইটেম সং ‘শিলা কি জাওয়ানি’র অসাধারণ সাফল্য এবং জনপ্রিয়তাতাকে এই যুগের ড্রিমগার্লের খেতাব এনে দেয়। গানে তার লুক, গ্ল্যামার এবং নৃত্য পারদর্শীতা তাকে বলিউডের অন্যতম সেরা নৃত্যশিল্পীর তকমা এনে দেয়।

২০১১ সালে ভিন্নধর্মী ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’ এবং ‘মেরে ব্রাদার কি দুলহান’ তাঁকে সফলতার মুকুটে দুটি উজ্জ্বল পালক এনে দেয়। তবে ২০১২ সালে ‘এক থা টাইগার’ তাঁকে অ্যাকশন সিনেমার নারী অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সালমানের সাথে জুটি হিসেবেও তিনি সফলতা পান এই সিনেমার মধ্য দিয়ে। একই বছর শাহরুখ খানের সাথে যশ চোপড়ার শেষ সিনেমা ‘জাব তাক হ্যায় জান’ সিনেমায় প্রধান নায়িকা হিসেবে জুটি বেধে সফল হন তিনি।

শাহরুখের সাথে তার জুটি এবং অভিনয় দক্ষতা আলোচনায় আসে। ২০১৩ সালে বলিউডের জনপ্রিয় ধুম ফ্যাঞ্চাইজের তৃতীয় কিস্তিতে তার চরিত্রে ব্যাপ্তি কম হলেও এক ‘কামলি’ গান দিয়েই মাত করেন তিনি। সাথে মিষ্টার পারফেকশনিস্ট আমির খানের সাথে স্ক্রিন শেয়ারের সুযোগ। ক্যাটরিনা প্রমান করেন পর্দায় তার স্বল্প সময়ের উপস্থিতিও লাইমলাইটের আলো তার দিকে নিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট।

২০১৪ সালে হৃতিকের সাথে দ্বিতীয়বার জুটি বেধে অ্যাকশন এবং রোমান্টিক ঘরানার ‘ব্যাং ব্যাং’ সিনেমা বক্স অফিসে সুপারহিট ব্যবসা করে। ২০১৫ সালে সাইফ আলী খানের সাথে ‘ফ্যান্টম’ সিনেমায় তার অভিনয় আলোচিত হয়। মাঝে কিছুটা খারাপ সময় কাটালেও ২০১৭ সালে সালমান খানের সাথে ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ ব্লকবাস্টার হিসেবে গন্য হলে আবারো আলোচনায় আসেন ক্যাটরিনা।

২০১৮ সালে শাহরুখ খানের সাথে ‘জিরো’ সিনেমা বক্স অফিসে ফ্লপ হলেও অভিনেত্রী হিসেবে ক্যাটরিনা চমকে দেন সবাইকে। একজন মাদকাসক্ত অভিনেত্রীর ভূমিকায় তার অভিনয় মুগ্ধ করেছে সবাইকে। ২০১৯ সালে সালমান খানের সাথে বিগ বাজেটের ‘ভারত’ প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা না করলেও আলোচনায় ছিলেন ক্যাটরিনা। সামনে মুক্তি পাবে অক্ষয় কুমারের বিপরীতে ‘সূর্যবংশী’। এছাড়াও বলিউডের প্রথম নারী সুপারহিরো সিনেমার নায়িকাও হতে যাচ্ছেন ক্যাটরিনা বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে কিছুদিন ধরেই।

তেরি ওর, শিলা কি জাওয়ানি, চিকনি চামেলি, মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ, আফগান জালেবি, কামলি, মালাং, দো ধারি তলোয়ার, সাস মে তেরী, বানজারা, জাস্ট চিল, ধুনকি, গলে লাগ যা, তু জানে না, হুছনো পারছাম, কালা চশমা, ধুম ৩ (টাইটেল) সোয়াগ সে কারেঙ্গে সাবকা সোয়াগাত-সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানে ঝড় তোলা এই অভিনেত্রী বলিউডের এই সময়ের সেরা নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন অনায়াসেই। বলিউডে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ক্যাটরিনা থাকা মানেই গানে আলাদা একটা মাত্রা এবং গান হিট।

বলিউডে স্কুল ড্রপআউট অভিনেত্রীদের মধ্যে ক্যাটরিনার নামটাও আছে। কারণ, তিনি আদৌ কখনো স্কুলেই যাননি। যা শিক্ষা অর্জন করেছেন ঘরে বসে, মায়ের কাছ থেকে। কারণ, তার বাবা-মা ক্রমাগত ভ্রমনের মধ্যে থাকতেন। আর মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ক্যাটরিনা মডেলিংয়ের দুনিয়ায় পা রাখেন। তাই লেখাপড়া স্কুলে যেয়ে অফিসিয়ালি শেখা হয়নি তাঁর। বলিউডে এসেও অনেক আলোচনা আর সমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

তবে, কঠোর অনুশীলন দিয়ে আস্তে আস্তে তিনি সবার আস্থা অর্জন করেন। জনপ্রিয়তা এবং খ্যাতির কারণে বলিউডের প্রথম তারকা তিনি যার আদলে বিখাত বার্বি ডল প্রতিষ্ঠান কিছু স্পেশাল ডল তাঁর আদলে বানিয়েছে। সেই অভিনয়ে আনাড়ি মেয়েটির মোমের মূর্তি আজ বিখ্যাত মাদাম ত্যুসো জাদুঘরে স্থাপিত হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১৩ টানা পাঁচবার তিনি এফএইচএম ইন্ডিয়ার বিবেচনায় সেরা আবেদনময়ী নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

মানুন আর নাই মানুন – আজকের বলিউড ক্যাটরিনা কাইফের গ্ল্যামার ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। শুধু গ্ল্যামারই নয়, নিজের অভিনয়েও যথেষ্ট উন্নতি এনেছেন ক্যাটরিনা। এর বড় একটা কারণ তিনি প্রচণ্ড পরিশ্রমী। আজকাল ব্যাপারটা এমন যে, ছবির কোনো গানে ক্যাটরিনা কাইফ থাকা মানেই সেই গান হিট। সেই জায়গাটা ক্যাটরিনা নিজেই গড়ে তুলেছেন।

ক্যাটরিনার সবচেয়ে ভাল ব্যাপার হল, তিনি নিজের শক্তিটা বোঝেন, জানেন কোথায় তাঁর সীমাবদ্ধতা। তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাটা কাটিয়ে তোলার জন্য পরিশ্রম করেন, শক্তিমত্তাটা আরো বাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করেন। তাই তো তাঁর শিডিউল পাওয়ার জন্য এখন নির্মাতা-প্রযোজকদের লাইন লেগে যায়।

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।