কাশ্মীর কার, কাশ্মীরিরা কাদের!

লিখতে আমি কতটা ভালোবাসি, আমার লেখা সে যেমনি হোক যারা নিয়মিত পড়ে তারা জানে। আর তারা এটাও জানে যে, বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আমি সাধারণত লিখিনা আর লিখতে চাইওনা। তবে কাশ্মীর আর কাশ্মীরিরা আমার মনের এমন একটা জায়গা দখল করে আছে যে ওদের নিয়ে কিছু না লিখে কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছিল আমার ভেতরে।

তবে ওদের নিয়ে বলার আগে এটা বলা দরকার বলে মনে করি যে, কেন আমি শুধু কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের নিয়ে লিখছি আর কেন সারা পৃথিবীর হাজারো ভাই-বোন বা শিশুদের নিয়ে কিছু লিখিনি বা লিখছিনা। সে কথার উত্তরটা আগে দিয়ে নেই।

কারন, কয়েকদিন থেকে দেখছি অনেকেই একথা বলছেন যে কেন শুধু কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের কথাই আমাদের এতো এতো আকুল করে তুলেছে, এতো দুশ্চিন্তা আমাদের ঘিরে ধরেছে? কিন্তু কেন আমরা কেউ সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়েমেন, তুরস্ক নিয়ে আর সেখানকার মানুষদদের নিয়ে লিখছেনা?

তারা কেন লিখছেনা সেটা জানিনা, তবে আমি কেন ওদের কথা কখনো কিছু না লিখে কেন আজকে হুট করে কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের প্রতি এতো দরদ দেখাচ্ছি? কেন অন্যদের জন্য নয়, শুধু কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের প্রতি আমার এতো এতো দয়া উথলে উঠছে?

আসলে যেটা হয়েছে আর যেটা একদম বাস্তব সত্য কথা সেটা হল, আমি সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, তুরস্ক বা ফিলিস্তিন আমি যাইনি। আমি ওইসব দেশের দুরবস্থা শুধু পেপার, টিভির খবরসহ নানা রকম মাধ্যমে জানতে বা দেখতে পেরেছি। বাস্তবে ওদের করুণ অবস্থা দেখার অভিজ্ঞতা আমার নেই।

যেটা আমি বাস্তবে দেখেছি কাশ্মীরে, অনুভব করেছি, নিজের চোখে আর খুব কাছ থেকে দেখেছি। আর তাই এটা তো খুব সহজ হিসেব আর সাধারণভাবে বোঝা যায় যে বাস্তবে একটা কিছু দেখার অভিজ্ঞতা আর অনুভব, পেপার, পত্রিকা, টিভিসহ নানা রকম মাধ্যমে দেখা ও খবর পাওয়ার অনুভুতি কখনো এক হয়না, হতে পারেনা।

যে কারনে কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের প্রতি আমার যে অনুভব আর অনুভুতি সেই একই অনুভব আর অনুভুতি আমার কিছুতেই হবেনা, হতে পারেনা। কারন ওদের আমি কাছ থেকে, নিজের চোখে, বাস্তবে দেখিনি, তেমন করে আমি ওদের অনুভব করিনি, সেটা আমার আসবেনা। এটাই স্বাভাবিক, এটাই বাস্তবতা। এটা আবেগ দিয়ে হয়না, এটা অনুভব করতে হয়। যেটা কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের প্রতি আমার আছে, ছিল আর থাকবেও।

কারন ওদের আমি দেখেছি, ওদের কাছে আর সাথে থেকেছি, ওদের সাথে কথা বলেছি, হেটেছি, খেয়েছি, জীবন-যাপন দেখেছি, জীবনের কথা শুনেছি, ওদের বছরে সাত থেকে আট মাস অসহায় অবস্থার কথা অনুভব করতে পেরেছি। তাই আমি ওদের নিয়ে আমার মত করে লিখছি।

আমার একটা প্রশ্ন মনে মনে বেশ আগে থেকেই। আর সেটা হল কাশ্মীর কি আসলেই ভারতের কোন ভুখণ্ড? ভারত কি আসলেই কাশ্মীরকে কাশ্মীরিদেরকে নিজেদের মনে করে? কাশ্মীর কি আসলেই ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মত?

আর আমার এই মনে মনে থাকা প্রশ্ন আরো বেশি করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সেদিন কলকাতার এক বাঙালি সাংবাদিকের কাশ্মীর নিয়ে সংবাদ বিশ্লেষণ দেখে।

তার বিশ্লেষণ আর আমার মনের প্রশ্ন মিলে আমি যা উত্তর পেয়েছি সেটা এরকম – সাংবিধানিক যে বিধি বিধান ছিল সেসব বাদ দিয়ে যদি শুধু একদন সাধারণভাবে আর সাদা চোখে যদি দেখতে চাই, তাহলে কি দেখতে পাই?

কাশ্মীরকে যদি ভারত নিজেদের আপন আর অন্যান্য প্রদেশের মত মনে করে থাকে, তাহলে কেন কাশ্মীর আর কাশ্মীরিরা নিজেদেরকে ভারত সরকারের আনুগত্য মেনে নেয়না?

তার মানে ভারত সরকার কাশ্মীরিদের মনের মধ্যে সেই আস্থা তৈরি করতে পারেনি। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মত চাকরি বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা কেন পায়না বা পাচ্ছেনা?

তার মানে ভারত সরকার তাদেরকে সেভাবে ভাবছেনা। ভারতের অন্যান্য প্রদেশেরর মত উন্নয়নকাজ কেন কাশ্মীরে হয়না?

তার মানে ভারত সরকার এটাকে নিজের অন্যান্য প্রদেশের মত মনে করেনা বা নিজের ভুখণ্ড সেভাবে মনে করেনা।

আচ্ছা বুঝলাম ভারত সরকার নানা রকম নিরাপত্তার অজুহাতে কাশ্মীরের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে সেনা মোতায়ন করে রেখেছে। সে নাহয় রাখলো কিন্তু সাধারণ মানুষ তো সেটা মেনে নিতে পারেনি, পারছেনা।

আর যদি তারা এসব মেনে নিতে পারতো, তাহলে কোন কাশ্মীরির মুখে হাসি নেই কেন? কারো চোখে-মুখে কোন উচ্ছাস নেই কেন? ওদের চলাফেরায় কোন সাভাবিকতা নেই কেন? ওরা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে কেন? ওরা গান গায়না কেন, ওরা দল বেধে চিৎকার চেঁচামেচি করেনা কেন? ওরা হৈ হুল্লোড় করে ডাল লেকের চারপাশে নানা রকম আডডায় মেতে থাকেনা কেন? ওদের সবাইকে ভারত সরকার সেনা দিয়ে সবসময় এতো চোখে চোখে রাখে কেন?

এমন শত নয়, হাজারো কেন চলে আসবে আনতে চাইলে। যেসব কেনর কোন উত্তর কেউ দিতে পারবেনা। যেসব কেনর কোন উত্তর নেই। যেসব কেনর কোন উত্তর হয়না।

কেন হয়না জানেন? কারণ, কাশ্মীরকে ভারত আসলে নিজের ভুখণ্ড মনেই করেনা। কারণ, একটাই ওটা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, ওখানে নিজের মত করে চাইলেই যে কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারবেনা।

তার প্রমাণ ভারতে নানা প্রদেশে ঘুরে ঘুরে আমি খুব খুব মনোযোগ দিয়ে লখ্য করেছি যে ভারতের কোন প্রদেশের মুসলিম প্রধান কোন অঞ্চল তার একদম সাথে লাগোয়া অন্য ধর্মের চেয়ে শত বছরের চেয়েও অনেক বেশি পিছিয়ে।

সেটা ভারেতের রাজধানী দিল্লী থেকে শুরু করে দার্জিলিং, শিমলা-মানালি, কলকাতা, কেরালা, দেরাদুন, ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাই, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ডসহ সব সব সব যায়গায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা গুলোর একই অবস্থা। দুস্থ, দুখি, অবহেলা, অপমান আর নানা রকম লাঞ্চনা, গঞ্জনায় পরিপুরন।

কারন কি? কারণ আর কি ওদের নিজের ধর্ম আর সেই ধর্মের মানুষ ছাড়া বাকিদেরকে বিশেষ করে মুসলমানদেরকে ওরা মানুষ বলে মনেই করেনা।

আর সেক্ষেত্রে কাশ্মীর? যেখানে প্রায় সবাই মুসলমান, সকল কিছু তাদের অধিকারে, সব কিছুতেই ওদের মতামত প্রধান সেটা কিভাবে মেনে নেবে? তাই ওরা কাশ্মীর আর কাশ্মীরি কাউকেই নিজের দেশের কেউ বা কিছু মনে করেনা, করেনি কখনোই।

এখন প্রশ্ন এসে যায়, তাহলে কেন ভারত কাশ্মীরকে নিজেদের অধিকারভুক্ত করে রেখেছে?

কারন আর তেমন কিছুইনা, পাকিস্তানের সাথে দন্দ, ওদের সাথে রেসারেসি, ওদেরকে দেখিয়ে দেয়া মনোভাব। ওদেরকে সাথে একদম ইচ্ছে করেই একটা ঝামেলা বাধিয়ে রাখা।

সবকিছু মিলে কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের বাস্তব অবস্থা এখন ঠিক পরাধীন সময়ের মত। আমাদের সম্পদ, অধিকার, সম্মান সবকিছু যেমন পাকিস্থান নিজেদের অধিকারে রেখেছিল, সবসময় হাজারো রকমের লাঞ্চনা, গঞ্জনা, অপমান, অবহেলা আর একটা অস্থির অবস্থা করে রেখেছিল। কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের অবস্থাও এখন ঠিক তেমন করে রাখা হয়েছে। যদিওবা আমি সেই সময়টা নিজের চোখে দেখিনি। আমাদের সেই সময়ের গল্প শুনে, বই পড়ে, ইতিহাস জেনে যে ছবি ভেসে ওঠে, কাশ্মীর যেন ঠিক সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে।

অতি অহংকার, অহমিকা, প্রভাব, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, দেখিয়ে দেয়া, কোন কিছুই ভালো নয়। বেশিদিন এসব করে ভালো থাকা বা টিকে থাকা যায়না। আর এটা তো সবাই জানি, জোর করে ভালোবাসা, অধিকার, মায়া, মহব্বত, আদর, সোহাগ, মমতা, শ্রদ্ধা, অধীনতা আদায় করা যায়না।

আমার মনে হয়না ভারত কোনো দিন, কোনো ভাবেই, কোন কিছুর বিনিময়েও কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদের কাছ থেকে এসব আদায় করা কখনোই যাবেনা। ওরা ভারতকে নিজেদের দেশ কোনদিন মনে করেনি আর ভারতও কাশ্মীর আর কাশ্মীরিদেরকে সেই অনুভুতির অনুভব দেয়াতে পারেনি।

আর তাই যেখানে দুপক্ষই কেউ কাউকে মন থেকে চায়না, ভালোবাসেনা, একে অন্যের হতে চায়না, তাই জোর করে অধিকার, জমি, বাড়ি, সম্পদ, হাসি, আনন্দ এসব মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে কি নিজেদের যা খুশি তাই করা সম্ভব?

কখনোই নয় আর কোনদিনই নয়।

জানি আমার এই লেখায় কারোই কিছু যায় আসেনা। কারো লাভ বা ক্ষতি হবেনা। শুধু নিজের সাথে নিজের কথা বলা, নিজের অবরুদ্ধ অনুভুতিকে নিজের মত করে প্রকাশ করার জন্যই এই নিজের মত করে লেখা।

পরিশেষে, শুভ বুদ্ধির উদয় হোক ভারতের, সকল মানুষকে মানুষ হিসেবে মনে করে ভালো বাসতে শিখুক ভারত আর নিজেদের অধিকার নিজেদের মত করে ফিরে পেয়ে ভালো থাকুক কাশ্মীর আর কাশ্মীরেরর সকল মানুষ। ভালোবাসি কাশ্মীর, ভালোবাসি কাশ্মীরিদের, ভালোবাসা ওদের জন্য।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।